উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতে বাড়তি ব্যয়ের লক্ষ্য নিয়ে আসছে নতুন বছরের বাজেট। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের তিন মেয়াদের ত্রয়োদশ বাজেটে উচ্চ প্রবৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা, মধ্য আয়ে পৌঁছানো এবং দারিদ্র্যমুক্ত স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে থাকবে নানামুখী পদক্ষেপ। আগামী ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জন্য নতুন বাজেট প্রস্তাব আগামী ২ জুন জাতীয় সংসদে উত্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তবে বরাবরের মতো এবারেও সম্পদ আহরণের ঝুঁকি মোকাবেলা করতে হচ্ছে। নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন, অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য অবকাঠামো খাতে বড় ধরনের ব্যয় তথা অগ্রাধিকার প্রকল্পের জন্য অর্থের সংস্থান করতে গিয়ে বেশ কিছু খাতে করের হারও বাড়ানো হচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে জোর দিয়ে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট আদায়ে নতুন আইন কার্যকর করা হচ্ছে। বাড়ানো হচ্ছে ভ্যাটের পরিধি। নতুন কিছু খাতকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে ভ্যাটের আওতায়। ফলে মূল্যবৃদ্ধির একটা চাপ সাধারণের ওপর আসতে পারে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
অর্থনীতিবিদরাও বলছেন, নতুন ভ্যাট আইনে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিভিন্ন খাতে বাড়তি ব্যয় বরাদ্দের প্রক্ষেপণ করায় বাজেটের আকার দাঁড়াচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন লাখ কোটি। সাড়ে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হারের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। গত কয়েক বছর ধরেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকা, পাশাপাশি প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পাওয়ায় আস্থার ভিত শক্ত হয়েছে। ফলে, আগামী বছরেও নিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতির আশাবাদ রেখে প্রবৃদ্ধির পথে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কৌশল নেয়া হচ্ছে। এই বিনিয়োগ বৃদ্ধির সরলরৈখিক হিসাব মাথায় রেখে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে দুই লাখ ৪২ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নিয়ন্ত্রিত রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা দুই লাখ তিন হাজার ১৫২ কোটি টাকা। তাতে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৯৭ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা।
এই বিপুল পরিমাণ ঘাটতি অর্থায়ন নিয়ে সরকারের দুশ্চিন্তা নেই। কারণ আকার বাড়লেও ঘাটতির হার বরাবরের মতই জিডিপির ৫ শতাংশের কম থাকছে। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উত্স থেকে ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে ঘাটতি অর্থায়নের পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করা হয়েছে। তদুপরি, বছর শেষে শতভাগ বাস্তবায়ন না হওয়ার বিষয়টিতো আছেই।
এডিপি
মোট বাজেটের মধ্যে প্রস্তাবিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১০ হাজার ৭শ’ কোটি টাকা। তবে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন বরাদ্দসহ হিসাব করলে এডিপির আকার দাঁড়াবে এক লাখ ২৩ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা। স্বপ্ন বাস্তবায়ন ও উন্নয়নের পথে হাঁটার তাগিদ থেকে এমন পরিকল্পনা নেয়া হলেও বছর শেষে এডিপির শতভাগ বাস্তবায়ন কোনো বছরই হচ্ছে না। চলতি বছরে এডিপির আকার ছিল এক লাখ ৯৯৭ হাজার কোটি টাকা। বছর শেষে এসে সংশোধন করার পর এডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৯৩ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকায়। এডিপির ক্ষেত্রে একই ট্রাডিশন স্বাধীনতার পর থেকেই চলছে। অন্যদিকে এডিপি বরাদ্দের হারও অনুন্নয়ন খাতে বরাদ্দের তুলনায় বরাবরই কম থাকছে। বেতনভাতাসহ অন্যান্য অনুন্নয়ন খাতে ব্যয় বরাদ্দ প্রতিবারেই বাড়ে এবং এটিই থাকে বাজেটের বড় অঙ্ক।
মেগা প্রকল্পে অর্থের চাহিদা বাড়ছে
দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বিদ্যুত্ চাহিদা পূরণে সরকার বাস্তবায়ন করছে ‘মেগা’ প্রকল্প। জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সরকারের অগ্রাধিকার বিবেচনায় এসব প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। আসছে বাজেটে এই মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য একটি পৃথক বাজেট দেওয়ার ঘোষণা ইতোমধ্যে অর্থমন্ত্রী দিয়েছেন। বর্তমানে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, সোনাদিয়া ও পায়রা সমুদ্রবন্দর, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র, মাতারবাড়ী ও রামপাল বিদ্যুেকন্দ্রের মতো বড় প্রকল্প ফাস্ট ট্র্যাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পদ্মা সেতু ছাড়া বাকি প্রকল্পগুলোর দৃশ্যমান অগ্রগতি খুবই কম। তবে পদ্মা সেতুর জন্যও যে পরিমাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তার পুরোটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। চলতি অর্থবছরের এডিপিতে পদ্মা সেতু প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৭ হাজার ৪শ কোটি টাকা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। ফলে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপি) বরাদ্দ কমিয়ে ৫ হাজার ৯ কোটি টাকা করা হয়েছে।
আগামী অর্থবছরে পদ্মা সেতু প্রকল্পের দৃশ্যমান অগ্রগতি চায় সরকার। এ কারণে সেতু বিভাগের চাহিদা অনুযায়ী পদ্মা সেতুর জন্য বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ৬ হাজার ২৬ কোটি টাকা। এডিপিতে চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত কতটুকু অর্থ ব্যয় করা সম্ভব সেটাও প্রশ্ন সাপেক্ষ। নতুন বাজেটে সব মিলিয়ে ১৫টি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন, এর অর্থায়নের উত্স এবং এর জন্য আগামী কয়েক বছরের ব্যয়ের একটি চিত্র তুলে ধরা হবে।
অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, বড় ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকার যেন আর্থিক সংকটে না পড়ে সে ব্যবস্থাপত্রও থাকছে বাজেটে। কোন প্রকল্পে কত টাকা লাগবে তার একটি পথনকশা থাকবে। সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয়ের লক্ষ্য থাকতে পারে।
কমছে ভর্তুকি ও প্রণোদনা
চলতি অর্থবছরে ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ২৫ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে তা ২৩ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে। এর মধ্যে প্রণোদনা খাতে ১২ হাজার ৫শ কোটি, নগদ ঋণ ৭ হাজার কোটি ও ভর্তুকি ৩ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। প্রণোদনার মধ্যে রয়েছে কৃষিতে ৯ হাজার, রফতানিতে ৩ হাজার এবং পাটজাত দ্রব্যে ৫শ কোটি টাকা। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জন্য আগামী বাজেটে কোনো অর্থ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে না বলে জানা গেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কম থাকায় বিপিসির লোকসান কাটানো সম্ভব হয়েছে। ফলে বাজেটে বড় ধরনের ব্যয় বরাদ্দের চাপও কমেছে। নইলে প্রতিবছরই বিপিসির দায়দেনা মেটাতে পৃথক বরাদ্দ রাখতে হয়। তা করতে গিয়ে ঘাটতির অঙ্কও বেড়ে যেত। চলতি অর্থবছরে বিপিসির জন্য ভর্তুকি বাবদ রাখা হয়েছে ৮শ কোটি টাকা। তবে কোনো টাকা খরচ না হওয়ায় পুরো অর্থই সংশোধিত বাজেটে ফেরত গেছে।
তবে জ্বালানি খাতের ভর্তুকি ৬ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে। যা চলতি বছরের মূল বাজেটে ছিল ৮ হাজার কোটি টাকা। পাঁচ বছর আগেও জাতীয় বাজেটে ভর্তুকির মোট বরাদ্দের অর্ধেক জ্বালানি খাতের জন্য রাখতে হতো।
এদিকে বাড়ানো হচ্ছে রফতানি খাতে উেস কর হার। বর্তমানে শূন্য দশমিক ৬ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব থাকছে। অন্যান্য খাতেও কর হার হ্রাসবৃদ্ধির মাধ্যমে গড়ে বাড়ানোর চিন্তা করা হচ্ছে।
ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণ
বাজেটে ঘাটতি অর্থায়ন মেটাতে ব্যাংকিং খাত থেকে ৪৩ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা থাকছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ২৮ হাজার কোটি ও স্বল্পমেয়াদি ঋণ ১৫ হাজার কোটি টাকার মতো। চলতি অর্থবছর ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৩৮ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদে ২৪ হাজার ১৮২ কোটি ও স্বল্পমেয়াদে ১৪ হাজার ৩৪১ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
নতুন ভ্যাট আইন : ব্যবসায়ীদের হতাশা
নতুন ভ্যাট আইন নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। আগামী পহেলা জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে অনলাইন ভিত্তিক নতুন ভ্যাট আইন। এই আইনের সংশোধনী দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন হলে দ্রব্যমূল্য অনাকাঙ্ক্ষিত হারে বাড়বে। সংগঠনটি মনে করছে, এর ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তাদের ক্ষতির শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করবে। আইনটি কার্যকর হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের অসন্তোষ ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াকে পুঁজি করে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অপচেষ্টাও হতে পারে।
ব্যবসায়ীদের এমন আশঙ্কা আর এনবিআরের পর্যালোচনায়ও স্পষ্ট যে, ভ্যাট আইন নিয়ে নতুন জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। নতুন ভ্যাট আইন নিয়ে এনবিআরের পর্যালোচনায় বলা হয়, ভ্যাট নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভ্রান্ত আশঙ্কার সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা ভোক্তার কাছ থেকে বাড়তি মূল্য দাবি করতে পারে। এছাড়া বিদ্যমান কিছু সুযোগ বিলুপ্তির কারণে কিছু পণ্য ও সেবার মূল্য বাড়তে পারে।
