ভাঙা বাঁধে আতঙ্ক বাড়ছে, মানুষ আশ্রয়হীন

আপডেট : ২৫ মে ২০১৬, ০০:১২
ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর আঘাতে উপকূলের ১২টি জেলার বিভিন্ন এলাকায় চরম দুর্ভোগে রয়েছে কয়েক লাখ মানুষ। ঘূর্ণিঝড়ের পর তিন দিন কেটে গেলেও বিধ্বস্ত ঘরবাড়িতে ফেরা অধিকাংশ মানুষ খোলা আকাশের নিচে দিন যাপন করছে। বৃষ্টির কারণে আরো বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। খেতের ফসল, পুকুর ও ঘেরের মাছ এবং বাগানের ফল হারিয়ে আর্থিকভাবেও তারা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। অনেক এলাকায় বেড়ীবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় নতুন করে জোয়ারের পানিতে জীবন ও সম্পদের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আবার বেড়ীবাঁধ উপচে লোকালয়ে তৈরি জলাবদ্ধতাও দুর্ভোগ বাড়িয়েছে।
 
এদিকে রোয়ানুর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কাজ শুরু করেছে সরকার। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, রোয়ানুর আঘাতে ১২ জেলার ২৪২টি ইউনিয়নের প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্পূর্ণভাবে ভেঙে, উড়ে কিংবা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে প্রায় ২৪ হাজার ঘরবাড়ি। আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৩৮ হাজার বাড়ি। মৃতের সংখ্যা অন্তত ২৬।
 
বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও ইত্তেফাকের প্রতিনিধি-সংবাদদাতাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী— চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে জনগণ সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে। এখানে ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ খোলা আকাশের নিচে বাস করছে। ক্ষতিগ্রস্ত অনেক এলাকায় এখনো ত্রাণ পৌঁছায়নি। বিশুদ্ধ পানির অভাব। বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন রয়েছে বিভিন্ন জনপদ। ঘরবাড়ির পাশাপাশি অনেকের ফসলের খেত, মাছের ঘের ও পুকুর পানিতে তলিয়ে গেছে কিংবা দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভেঙেছে অথবা নিশ্চিহ্ন হয়েছে। গৃহপালিত পশুপাখিও মারা   গেছে কিংবা হারিয়ে গেছে। ফলে তারা মারাত্মকভাবে আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন।
 
চট্টগ্রাম: বেড়ীবাঁধ না থাকায় জেলার বাঁশখালী ও সন্দ্বীপ উপজেলায় জোয়ারের পানির উচ্চতা কমছে না। এখনো পর্যন্ত ঘরবাড়ি ঠিক করতে না পারায় খোলা আকাশের নিচে বসবাস করতে হচ্ছে দুর্গতদের। এছাড়াও ঠিক সময়ে ত্রাণ না পৌঁছানো এবং বিশুদ্ধ পানির সংকট এখনো পর্যন্ত কাটছে না। মূল ভূমি থেকে লবণপানি নামছে না। সাইক্লোন শেল্টারগুলোতে দিন কাটাতে হচ্ছে দুর্গতদের। আবার সেখানেও পর্যাপ্ত ত্রাণ, বিশুদ্ধ পানি না থাকায় দুর্ভোগ পিছু ছাড়ছে না। বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বেড়ীবাঁধ না থাকায় গত শনিবার রোয়ানু তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে সন্দ্বীপের গ্রামের পর গ্রাম। আর রোয়ানু চলে যাওয়ার পরও গত তিনদিন ধরে জোয়ারের পানিতে বেশ কটি ইউনিয়ন প্রতিদিন দুইবার করে পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। এতে করে কোনোভাবেই দুর্গতরা ঘরবাড়ি গুছিয়ে উঠতে পারছেন না। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বেড়ীবাঁধ নির্মাণের দাবি করা হলেও হচ্ছে-হবে বলে যুগের পর যুগ পার হয়ে যাচ্ছে; কিন্তু বেড়ীবাঁধ নির্মাণ হচ্ছে না।
 
স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকাবাসী জানায়, শুধু বাঁশখালী উপকূলীয় এলাকায় অন্তত ৩০ কিলোমিটার এলাকা অরক্ষিত রয়েছে। সন্দ্বীপে প্রায় ২০ কিলোমিটারসহ আনোয়ারা এলাকায়ও বেড়ীবাঁধহীন অনেক এলাকা রয়েছে। তাই রোয়ানুর আঘাতে বাঁশখালীর প্রেমাশিয়া, ছনুয়া, গন্ডামারা, শেখেরখিল, বাহারছড়া এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
 
কক্সবাজার: জেলার কুতুবদিয়ায় বিধ্বস্ত বেড়ীবাঁধ দিয়ে অনায়াসে ঢুকছে সমুদ্রের পানি। বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। গাছপালাগুলো উপড়ে গেছে। পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে বসতবাড়ি। নেই খাবার সামগ্রী, নেই পানীয়ও। সব মিলিয়ে উপজেলার উত্তর ধুরুং ইউনিয়নের ১০ হাজার বাসিন্দার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। উপজেলার উত্তর ধুরুংয়ের কাইছার বাপের পাড়ার শ্রমিক মোহাম্মদ মোজাফফর বলেন, আমরা ত্রাণ চাই না। বেড়ীবাঁধ চাই। বেড়ীবাঁধ সংস্কার করা হলে আমরাই চাল উত্পাদন করতে পারব।
 
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এটিএম নূরুল বশর চৌধুরী বলেন, দ্বীপের চারপাশে ৪১ কিলোমিটার বেড়ীবাঁধ। এরমধ্যে রোয়ানুতে ১৫ কিলোমিটার বিলীন হয়ে সাগরের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। প্রতিদিনই জোয়ারের পানি ঢুকছে আর বের হচ্ছে। মানুষের বাঁচার আর কোনো উপায় নেই। জরুরি ভিত্তিতে বেড়ীবাঁধ সংস্কার করা না হলে বর্ষায় দুর্ভোগ বাড়বে সীমাহীন। 
 
ভোলা: জেলায় রোয়ানুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় কয়েক হাজার মানুষ এখনো তাদের ঘরে ফিরতে পারেনি। অনেক পরিবার তাঁবু টাঙ্গিয়ে, ভাঙা চালের নীচে মানবেতর জীবনযাপন করছে। তজুমদ্দিনে প্রায় ৩শ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসত-বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরে এখনো পুনর্বাসনের কাজ শুরু হয়নি। এলাকায় বিশুদ্ধ পানির অভাব দেখা দিয়েছে। এরমধ্যে শুরু হয়েছে ব্যাপক নদী ভাঙন। 
 
ঝালকাঠি: বর্ষার শুরুতেই ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বিষখালী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদী ভাঙন আতঙ্কে আছে কাঠালিয়ার নদী তীরঘেঁষা ১৩ গ্রামের কয়েক হাজার পরিবার। অবিরাম বৃষ্টিপাত ও স্বাভাবিকের চেয়ে ৩/৪ ফুট পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন স্থানের বাঁধ ভেঙে নিম্নাঞ্চলের কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় ভাঙন প্রবণতা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।
 
লক্ষ্মীপুর: জেলার প্রায় ২ কোটি টাকার ফসল ও গাছ-গাছালির ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। এর মধ্যে ৩০০ হেক্টর আউশ ধান ও ২০০ হেক্টর সবজি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। দুই-একদিনের মধ্যে ফসলের মাঠে জমে থাকা পানি না নামলে আউশ ধানে পচন ধরবে।
 
এদিকে নোয়াখালী, ফেনী, পটুয়াখালী, খুলনার ঘূর্ণিঝড় ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি এলাকায় এখনো ত্রাণ পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।