গ্রেটা থানবার্গ :ষোলোতেই শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে মনোনীত

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০১৯, ২০:০৩

ডিজিটাল মিডিয়ার কল্যাণে গান গেয়ে, ছবি এঁকে অথবা ভিডিও আপলোড করে ভাইরাল কিংবা জনপ্রিয় হয়েছেন অনেকেই। বিভিন্ন সময়ে অনেকেই এসেছেন আলোচনার কেন্দ্রে। তবে ডিজিটাল মিডিয়ার কল্যাণে মাত্র ১৬ বছর বয়সে কেউ শান্তিতে নোবেলের জন্য মনোনীত হবেন, এমনটা এর আগে কখনো হয়নি।

পরিবেশ রক্ষায় গত বছরের আগস্ট মাস থেকে ‘ইয়ুথ স্ট্রাইক’ আন্দোলন শুরু করেন সুইডিশ কিশোরী গ্রেটা থানবার্গ। শুরুটা সেখান থেকেই। জলবায়ু সংকটের বিরুদ্ধে কেন যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না—এমন প্রতিবাদ নিয়ে সে সময় স্কুুল বাদ দিয়ে টানা তিন সপ্তাহ সুইডিশ পার্লামেন্টের সামনে বসে থাকেন গ্রেটা। জলবায়ু সংকট বিলায় নিজের আন্দোলনের কথা পোস্ট করেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রাম ও টুইটারে। তার শুরু করা এই আন্দোলনে ধীরে ধীরে যোগ দিতে থাকে অসংখ্য মানুষ। সবার একটাই দাবি, জলবায়ু সংকট নিরসনে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হোক।

আগস্টের এই আন্দোলনের পথ ধরেই যতদিন পর্যন্ত দেশটির সরকার তাপমাত্রাবৃদ্ধির পরিমাণ দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার ব্যাপার যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়, ততোদিন পর্যন্ত প্রতি শুক্রবার সুইডিশ পার্লামেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার ঘোষণা দেন গ্রেটা। সেই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের শুরুতে, অর্থাত্ জানুয়ারি মাসে সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হওয়া ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামে পরিবেশ রক্ষা বিষয়ে বক্তৃতা দেন এই সুইডিশ কিশোরী। আর সেই বক্তৃতাই তাকে নিয়ে যায় আলোচনার শিখরে।

ফোরামে উপস্থিত শীর্ষ নেতাদের সামনে দাঁড়িয়ে ১৬ বছরের এই কিশোরী অকপটে বলেন, ‘কিছু মানুষ বলে, জলবায়ু সংকট তৈরির জন্য নাকি আমরা সবাই দায়ী। এ কথা আসলে সত্য নয়। এই সংকট তৈরিতে যদি কোনো একজন দায়ী হয়, তবে তার জন্য সবাইকে দায়ী করা উচিত নয়। যারা অপরাধী, শুধু তাদেরই দায়ী করতে হবে। আর আমি বিশ্বাস করি, জলবায়ু সংকটের পিছনে দায়ী হলো কিছু মানুষ, কিছু প্রতিষ্ঠান এবং গুটিকয়েক নীতি-নির্ধারক, যারা খুব ভালো করেই জানেন শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য তারা পৃথিবীর কী ভীষণ ক্ষতি করে চলেছেন এবং আমার বিশ্বাস, তাদের মধ্যে অনেকেই আজ এখানে উপস্থিত আছেন।’

ওই ফোরামে গ্রেটা আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, আমাদের নেতারা জলবায়ু সমস্যা সমাধানে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো পরিপক্ব না।’ বিশ্বের প্রভাবশালী নেতা ও নীতিনির্ধারকদের সামনে দাঁড়িয়ে তার এমন বক্তৃতাই তাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে বিশ্বব্যাপী লাখো পরিবেশ সচেতন মানুষের কাছে। তার শুরু করা ‘ইয়ুথ স্ট্রাইক’ আন্দোলন আজ ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের ১০৫ দেশের ১,৬৫৯টি শহরের জনগণ ও কয়েক লক্ষ কিশোর-কিশোরীর মাঝে। সুইডেন থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে যোগ দিয়ে পরিবেশ রক্ষায় মানুষের সচেতনতা গড়ে তোলার কাজ করছেন তাদের সকলেই। মাত্র ১৬ বছর বয়সী এই কিশোরীর এমন একটি অসাধারণ ও অসামান্য উদ্যোগকে সম্মান জানিয়েই ২০২০ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য তাকে মনোনীত করেছে নোবেল কমিটি।

২০২০ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়ে এক টুইট বার্তায় গ্রেটা জানান, ‘শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হওয়ায় আমি সম্মানিত ও কৃতজ্ঞ।’

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে নরওয়ের সমাজকর্মী ফ্রেডি আন্দ্রে বলেন, ‘আমরা গ্রেটার নাম প্রস্তাব করেছি, কারণ এখনো যদি পরিবেশ বাঁচাতে আমরা সচেষ্ট না হই তাহলে তা যুদ্ধ, বিবাদসহ আরও শরণার্থীদের জন্ম দেবে। গ্রেটা একটি গণ-আন্দোলনের শুরু করেছে, যা আমার মনে হয় শান্তির পথে একটা বিশাল অবদান।’

গ্রেটা নিজেকে টুইটারে ১৬ বছর বয়সী অ্যাসপার্গার সিনড্রোমে আক্রান্ত একজন জলবায়ু কর্মী হিসেবে পরিচয় দিলেও টাইম ম্যাগাজিনের ২০১৮ সালের বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী কিশোর-কিশোরীদের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হওয়া ছাড়াও এটি নিঃসন্দেহে কম কিছু নয়।

এর আগে ২০১৪ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাই। এখন পর্যন্ত তিনিই নোবেল পুরস্কার পাওয়া সর্বকনিষ্ঠ। তবে সুইডেনের গ্রেটা থানবার্গ এই পুরস্কার পেলে সেই হবে সর্বকনিষ্ঠ শান্তিতে নোবেল বিজয়ী।