কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। লালমাই পাহাড়ের পাদদেশে ২০০৬ সালের ২৮ মে কুমিল্লা শহর থেকে ১১ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের ২৬তম এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়টি। মধ্য-পূর্বাঞ্চলের সর্বোচ্চ এ বিদ্যাপীঠে বর্তমানে ১৯টি বিভাগে প্রায় ছয় হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ বছর পূর্তিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আনন্দ, গৌরবের পাশাপাশি ছিল অপূর্ণতা, অপ্রাপ্তির বেদনাও। বিগত ১০ বছর ধরেই নানা সমস্যায় হাবুডুবু খাচ্ছে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়টি।
পর্যাপ্ত ভূমি না থাকা, আবাসন সমস্যা, অবকাঠামোগত সমস্যা, শ্রেণিকক্ষের অভাব, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতিসহ নানা কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
নতুন করে ভূমি অধিগ্রহণে ব্যর্থ প্রশাসন: বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা প্রকল্পে ৫০ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। পাহাড়ি এ ভূমির মধ্যে ব্যবহারযোগ্য প্রায় ২০ একর। ২০১৩’র ফেব্রুয়ারিতে উন্নয়ন প্রকল্প-১ম পর্যায়ে ৭০ একর ভূমির জন্য আবেদন করা হলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় হয়ে পরিকল্পনা কমিশনে গিয়ে আবেদনটি বাতিল হয়ে যায়। তবে বর্তমানে পুনরায় ভূমি অধিগ্রহণের জন্য আবেদন করা হচ্ছে বলে জানা যায়।
অপর্যাপ্ত আবাসন ব্যবস্থা: প্রায় ছয় হাজার শিক্ষার্থীর জন্য চারটি আবাসিক হল। অফিস সূত্রে জানা যায়, এ চার হলের স্বাভাবিক ধারণ ক্ষমতা আট থেকে নয় শত শিক্ষার্থীর। হলগুলোতে নেই গ্রন্থাগার, ক্যান্টিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদেরও আবাসন সুবিধা সীমিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল কার্যালয় থেকে নতুন হল ও ডরমেটরি নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানা গেলেও কবে নাগাদ সেগুলো বাস্তবায়ন হবে তার উত্তর পাওয়া যায়নি।
অপর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ ও পরিবহন ব্যবস্থা: পুরো ক্যাম্পাসে ১৯টি বিভাগের জন্য রয়েছে মাত্র ৪২টি শ্রেণিকক্ষ। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের জন্য নেই নিজস্ব অফিস ও শ্রেণিকক্ষ। সংকট কাটাতে প্রশাসনিক ভবনের দুইটি ঘরে শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রম চালানো হয়। এতে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, সেশনজটের আশঙ্কায় আছেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবহন ব্যবস্থাও অপর্যাপ্ত। যে ৫টি বাস ও ৩টি মাইক্রোবাস আছে, সেগুলোর প্রায় সবই ত্রুটিযুক্ত। বাধ্য হয়ে বিআরটিসি থেকে ভাড়া করে চালানো হয় নয়টি বাস। কিন্তু অদক্ষ চালকের কারণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। এছাড়া বিআরটিসি বাসগুলোরও যান্ত্রিক ত্রুটি রয়েছে।
মাত্র ৬০ আসনের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার: প্রশাসনিক ভবনের পাঁচ তলায় দুটি কক্ষে প্রায় ৬০ আসনের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যার অনুপাতে এ কয়টি আসন যেন এক পরিহাস। গ্রন্থাগারে নেই পর্যাপ্ত বইও। বিভাগগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় রেফারেন্স বই পাওয়া যায় না বলে জানান শিক্ষার্থীরা। পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন জরুরি: বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, নিকটবর্তী সামাজিক বন বিভাগ, শালবন বিহার, ময়নামতি জাদুঘর, কোটবাড়িসহ আশপাশের এলাকাগুলো এখন সন্ত্রাসী ও ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্য। প্রায় প্রতিদিনই ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষকগণ। ছাত্রীরা ইভটিজিং এর শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। ক্যাম্পাসে পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বে অবহেলা ও অসদাচরণের অভিযোগ: বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় প্রভাব, ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের প্রভাবে শক্তিশালী তারা। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না প্রশাসন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী লাঞ্ছনার ঘটনাও ঘটেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ আলী আশরাফ বলেন, “আমাদের অনেক কিছু নেই তবে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে আমাদের প্রতিনিয়ত যোগাযোগ হচ্ছে। সকলের সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে গেলে একটা পর্যায়ে পৌঁছানো যাবে।”
