ঋণের টাকা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে বিশ্বব্যাংকের শর্ত আরোপ ওপেন সিক্রেট। আর এ শর্ত পূরণের মাধ্যমে বিশ্বব্যাংককে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে এবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সেকেন্ডারি এডুকেশন কোয়ালিটি এ্যান্ড এ্যাকসেস এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্টের (সেকায়েপ) ৪৪ কোটি টাকা অপচয় হতে চলছে। প্রকল্পের পরিচালকসহ কয়েক কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে সরকারি ক্রয়নীতি লঙ্ঘন এবং আনুষ্ঠানিকতা শেষ না করে টেন্ডার ছাড়াই শিক্ষক প্রশিক্ষণসহ কমিউনিটি মবিলাইজেশনের কাজ দেয়া হচ্ছে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের মতো সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অদক্ষ প্রতিষ্ঠানকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে জানান, প্রকল্পটি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে তোলার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে প্রকল্প পরিচালক ড. মাহমুদুল হক বলেন, টেন্ডার না হলেও সরকারি কোনো নিয়ম লঙ্ঘন হয়নি। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে। আর বিশ্বব্যাংকই চেয়েছে এই কাজটা বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র করুক। তারা করলে কাজ ভালো হবে বলে বিশ্বব্যাংক চিঠি দিয়ে জানিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। প্রকল্পের এ সংক্রান্ত বিষয়টি একনেক’র সভায়ও অনুমোদন দেয়া হয়েছে। অথচ কোনো প্রকল্প একনেক সভায় উপস্থাপনের আগে প্রি-একনেক বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হয়। এ ছাড়া দরপত্র ছাড়া বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রকে শিক্ষক প্রশিক্ষণের দায়িত্ব দেয়া যায় কি না সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য বিষয়টি সরকারের ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মন্ত্রণালয়। এসব পদক্ষেপ উপেক্ষা করেই ১০ মে প্রকল্পটি একনেক সভায় উপস্থাপন করা হলে তা অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্প কর্মকর্তা, মাউশি ও পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দরপত্র ছাড়া বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রকে কাজ দেয়ার বিরোধিতা করেছিলেন।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে বইপড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রায় ৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বর্তমানে একটি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে, গণিত, ইংরেজি এবং বিজ্ঞান বিষয়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষা কার্যক্রমে নিয়োগের জন্য প্রকল্প কর্তৃপক্ষের আহ্বান করা আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচিত করা হয়। এর মধ্যে ইংরেজির জন্য বৃটিশ কাউন্সিল, গণিতের জন্য ফিলিপিন্সের মেডিকোর ক্যারিয়ার সিস্টেমস ইনকর্পোরেট (এমসিএস) এবং বিজ্ঞানের জন্য বাংলাদেশের এনভায়রনমেন্ট, এগ্রিকালচার এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেসকে (ইএডিএস) বাছাই করা হয়। আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে প্রতিটি গ্রুপে ছয়টি করে প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে এই তিনটিকে নির্বাচন করে তালিকা বিশ্বব্যাংকের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। নতুন প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব নিয়েই প্রকল্পের কার্যক্রম তদারকির জন্য ওলিউল ইসলাম নামে একজনকে কোয়ালিটি এস্যুরেন্স কনসালট্যান্ট পদে উচ্চ বেতনে নিয়োগ এবং বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের পরামর্শক পদে লিয়েনে কর্মরত উপসচিব শরীফ মাসুদের পরামর্শে এ তিন প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রকে কার্যক্রমের দায়িত্ব দেওয়ার কাজ শুরু করেন। ওই দুই কর্মকর্তার পরামর্শে এবং প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের অদক্ষতার সুযোগ নিয়ে প্রকল্প পরিচালক স্টিয়ারিং কমিটিকে ভুল বুঝিয়ে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রকে একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে অতিরিক্ত শ্রেণি শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও মনিটরিং কার্যক্রমে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করিয়ে নেন। তবে দরপত্র ছাড়া এ প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকার বেশি অঙ্কের কার্যাদেশ দেওয়ার সুযোগ না থাকায় সিদ্ধান্তটি সংশোধন করার উদ্যোগ নেয় প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।
শিক্ষা সচিব মো. সোহরাব হোসেইন বলেন, এখানে কোনো নিয়ম লঙ্ঘন হয়নি। বৈঠকে প্রকল্পের পক্ষ থেকেই বলা হয় যে, কাজটা যাতে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রকে দেওয়া হয় সে কথা বিশ্বব্যাংক তাদের বলেছে। তারপরও বিশ্বব্যাংকের মৌখিক কথায় আমরা রাজি হইনি। আমরা বলেছি, বিশ্বব্যাংকে লিখিত দিতে হবে। প্রকল্পটি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উঠবে। তবে সঠিক নিয়মে হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
