ইয়েরেভান শহরের ‘হায়াত প্লেস’ হোটেলের পেছন দিকে সরু একখানা গলি আছে। একেবারেই শ্রীহীন গলি। ওপর থেকে চুইয়ে পড়ছে পাশের ভবনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের জল। আর সড়কের প্রলেপ উঠে বেরিয়ে এসেছে ইটের খোয়া আর মাটির চাকলা। এই শর্টকাটের গলিটি বেছে নিয়েছি কাছের এক মানি চেঞ্জের অফিসে যাবার জন্যে। একমাত্র ওখানেই নাকি দিবারাত্রি ২৪ ঘণ্টা ডলার বদলে আর্মেনিয়ান মুদ্রা ড্রাম নেয়া যায়। আমার পকেটে বেশকিছু ডলার। গা ছমছমে এই গলিতে কেউ পথ আগলে যদি ডলারগুলো চায়, তবে বিনা বাক্যব্যয়ে সেগুলো দিয়ে দেয়া ছাড়া

উপায় থাকবে না। এইসব ভাবতে ভাবতে গলিটি পেরিয়ে যেই না তিগ্রান মেতিস রোডে পা দিয়েছি, অমনি পথ রোধ করে দাঁড়াল বিশাল ভুঁড়িওয়ালা দশাসই চেহারার এক লোক। পরনে লাল টি শার্ট, আর রঙচটা জিনসটা আটকে আছে স্ফীত কোমর। চাঁদিতে কদমফুলের মতো কাচা-পাকা চুল।
নিচের পাটির ক’টি দাঁত তামা দিয়ে বাঁধানো। গলায় ঝুলছে সিলভারের মোটা মালা। খদ্দেরের অপেক্ষায় হয়তো এদিক- ওদিক ঘুরছে। আমার কাছে এসে কোনো ভূমিকা না করেই সে বলল, ‘মহাশয় কি ইংরেজি জানেন?’ কী বলব আমি? যদি ‘না’ বলি, তবে তো প্রমাণ হয়ে গেল আগের ইংরেজি কথাটি না বুঝেই এখন উত্তরে ‘না’ বলছি। তবে আমাকে সেই ভ্রান্তির জালে না আটকে সে হড়বরিয়ে বলে যায়, জাতিতে আর্মেনীয় হলেও তাঁর বাড়ি আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আয়ারস শহরে। তা এই এতকাল পরে তাঁর মনে হয়েছে, পিতৃপুরুষের দেশে এসে জীবনের বাকিটুকু সময় কাটাবে। সে-মোতাবেক তল্পিতল্পা গুটিয়ে অনেকটা হঠাত্ করেই চলে আসে আর্মেনিয়ায়। উত্তর আর দক্ষিণ আমেরিকার দিকে এককালে পাততাড়ি গোটানো আর্মেনীয়রা আজকাল মাঝেসাঝে পিতৃপুরুষের দেশ দর্শনে আসে, সে জানি। তো তাদের মাঝে কেউ কেউ কি লোটাকম্বল নিয়েই প্রপিতামহের দেশে ফিরে আসছে নাকি? নাকি এই ব্যাটা এখানে এসেছে ভিন্ন কোনো মতলবে? যে কারণেই হোক, আমার পথ আগলে এসব কেচ্ছা-কাহিনি বলবার মানেটা কী? আমার এই প্রশ্নবোধক অভিব্যক্তি ধরতে পেরে এবারে সে
আসল কথাতে আসে, ‘তা, জনাবের কাছে কি কিছু ডলার হবে? এখানে থাকবার কোনো ব্যবস্থা এখনো করে উঠতে পারিনি। কিছু ডলার হলে ভালো হতো। এই অধম সে ক্ষেত্রে চিরঋণী হয়ে থাকবে।’ এখন সকাল আটটে। পথে-ঘাটে লোকজন বেশ কম। এই খুনি চেহারার লোকটিকে কয়েকটি ডলার দিতে গিয়ে শেষে যদি সবটুকু নিয়েই চম্পট দেয়? তাকে তাই বলি, ‘মি. জাম্বুবান, আমিও তোমার মতোই ঘরছাড়া, তাই পকেটে পয়সাকড়ির অবস্থা বেশ একটা সুবিধের নয়।’ আমার কথা শুনে সে মুখ ভেঙচে আর্মেনিয়ানে কিছু একটা বলে, সেটা হয়তো আমাদের বাংলায় ‘ধুর শালা’ ধরনের কিছু একটা হবে। আমি তাতে গা করি না। লোকটি বিড়বিড় করতে করতে রাস্তা পেরিয়ে ওপারে চলে যায়।
ইয়েরেভান শহরটির কেন্দ্রস্থল যেন এক বৃত্ত। আর সেই বৃত্তের মাঝ বরাবর আছে লাইম স্টোনের প্রকাণ্ড সৌধ। অনেকটা যেন পিরামিডের মতো। সিঁড়ি বেয়ে একেবারে ওপরে উঠলে সেখান থেকে পুরো শহরটিকে দেখা যায়। সৌধের সামনের চত্বরে গোলাপ আর টিউলিপের বাগান। বাগানের মাঝে টিনের কিছু ধাতব ভাস্কর্য। আর কোণের দিকে কিছু দোকানপাট। ওখানে এক ট্যুরিস্ট কোম্পানির সন্ধান পেয়েছি গতকাল। সকাল দশটার দিকে এদের মিনিবাস নানা দিকে ছেড়ে যায়। ভাবছিলাম, লেক সেভানের ওদিকটায় যদি এদের কোনো বাস যায়, তবে আমিও তাতে ঝুলে পড়ব। হাতঘড়ি অনুযায়ী দশটা বাজতে প্রায় মিনিট পঞ্চাশেক বাকি। অর্থাত্, হেঁটে গেলে দশটার আগেই ওখানে পৌঁছানো সম্ভব। আর ট্যাক্সিতে গেলে হয়তো মেরে-কেটে দশ মিনিট। আমি হাঁটব বলেই মনস্থির করি। ট্যুর অফিসে পৌঁছে জানতে পারি, লেক সেভানে ওরা আজ যাচ্ছে না। তবে আমি চাইলে নোরাভাঙ্ক এলাকাগামী যে বাসটি যাচ্ছে, তাতে সওয়ার হতে পারি।
নোরাভাঙ্ক অঞ্চলের আরেনি নামক স্থানে এসে বাস দাঁড়ায়। পাশেই প্রকাণ্ড কালচে পাথুরে পর্বত। একপাশে টিনের বোর্ডে লেখা ‘মার্কিন সরকারের অর্থানুকূল্যে এই গুহাটির সংস্কার আর প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ সম্পন্ন হয়েছে।’ বেশ সংকীর্ণ পায়েচলা পথ বেয়ে পর্বতের উদরে অবস্থিত গুহায় পৌঁছাতে হয়। তবে তার জন্যে শারীরিক সামর্থ্য থাকা চাই। দু-একজন সে কথা ভেবে পিছিয়ে গেলেন। আমি ট্র্যাকিং শুয়ের ফিতে ভালো করে বেঁধে পর্বত আরোহণে লেগে পড়ি। পাথরের গাত্রে বেঁধে রাখা লোহার রশি ধরে বেশ সাবধানে ভেতরে ঢুকতে হয়। চলাচলের সুবিধের জন্যে বোধ করি অধুনা বসানো হয়েছে কাঠের পাটাতন। হেঁটে যাবার সময়ে সেগুলো ঝড়ে কাঁপতে থাকা সেতুর মতোই দুলতে থাকে। ভেতরটা বেশ অন্ধকার আর শীতল। টিমটিমে হলদেটে আলোর সাহায্যে চোখে পড়ে আদিম মানুষের আঁকা কিছু দেয়ালচিত্র। তবে এখানকার এই গুহাগুলো ভিন্ন কারণে সুবিখ্যাত। সেই কারণটি বলার আগে এক গল্প বলা যাক বরং।
সে বহুকাল আগের কথা। পারস্য অঞ্চলে ছিলেন জামশিদ নামক রাজা। রাজার রাজ্যে আঙুরের ফলন হতো প্রচুর। রাজ হেঁসেলে মজুদ রাখা হতো উদ্বৃত্ত আঙুর। একদিন মাটির হাঁড়িতে রাখা আঙুর গেল পচে। সবাই ভাবল ও পচে হয়তো বিষে রূপান্তরিত হয়েছে। রাজা বিষের হাঁড়িগুলো মাটিচাপা দিতে নির্দেশ দিলেন। এদিকে পরিচারিকা মহলের এক নারী সে-সময়ে প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আত্মহননের পথ খুঁজছে। হঠাত্ সে ভাবল, আচ্ছা মাটি খুঁড়ে সেই হাঁড়ির বিষ খেলেই তো জ্বালা মিটে যায়! সে মোতাবেক সে বিষ খেল; ভাবল, এই বুঝি তার জীবনের সংহার। কোথায় কী! কয়েক ঘণ্টা পর ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখে, দিব্যি বেঁচে আছে! ধীরে ধীরে এ-কথা পৌঁছে গেল রাজার কানে। রাজ-ঝি বিষ খেয়েও বেঁচে আছে। মহিলা ডাইনি নাকি? রাজা কয়েক ভৃত্যকে নির্দেশ দিলেন, সেই বিষ খেয়ে পরীক্ষা করতে। তারা খেল। কিন্তু এরাও মরল না, বরং উল্টো জানালো—এই বিষ খেলে চিত্তে কেমন যেন এক উত্ফুল্ল ভাব হয়। মস্তক হয় ভারমুক্ত। এই করেই এক নতুন পানীয় আবিষ্কৃত হলো, যাকে আজ আমরা ওয়াইন বলি। ওয়াইন নামটি শুনে এটিকে পাশ্চাত্যের পানীয় বলে মনে হলেও, এর আবির্ভাব কিন্তু ঘটেছিল এই পারস্য-ককেশাস অঞ্চলে, তাও সে বেশ কয়েক হাজার বছর আগে। এই গুহা হলো সে-সবের সাক্ষী। এখানে মাটি খুঁড়ে পাওয়া গেছে সে-কালে ওয়াইন জারণ করবার মাটির হাঁড়ি। একটি-দুটি নয়, অসংখ্য। পাশ থেকে এক ফচকে ছোকরা বলছিল, ‘চলো আমরাও মাটি খুঁড়তে লেগে যাই। বলা তো যায় না, হয়তো পেয়েও যেতে পারি সেই হাজার বছর আগের ওয়াইন। দারুণ এক ব্যাপার হবে কিন্তু, কী বলো?’
নোরাভাঙ্ক-এর মঠ দর্শন শেষ হলে আমরা গেলাম কাছের এক ওয়াইন ফ্যাক্টরিতে। একপাশে সারি সারি পিপেতে নানা সালের ওয়াইন রাখা। সবচেয়ে পুরনোটি ১৯৯২ সালের। কারখানার সামনের দিককার দোকানে আছে ওয়াইন টেস্টের ব্যবস্থা। যে ওয়াইন যত পুরনো সেটির স্বাদ তত কড়া। শুধু নানা বয়সের ওয়াইন-ই নয়, সেই সাথে আছে হরেক পদের ওয়াইন। এযাবত্ আমি কেবল আঙুর থেকে উত্পন্ন রেড আর হোয়াইট ওয়াইনই কেবল চেখে দেখেছি; কিন্তু এখানে দেখছি কুল, ডালিম, এপ্রিকট, রেস্পবেরি—এমন নানা ফল থেকেও ওয়াইন উত্পন্ন হয়। ফলভেদে ওয়াইনের স্বাদও আবার ভিন্ন। ওয়াইনারিটির একপাশে রেস্তোরাঁ। এটি ছাড়া এ-তল্লাটে খাবার-দাবারের আর কোনো ভালো ব্যবস্থা নেই। তাই দুপুরের খাবার খেতে হলে, এখানে খেয়ে নেয়াই উত্তম।
রেস্তোরাঁটি পাহাড়ের কোল ঘেঁষে। ঝরনার জলকে টেনে এনে এখানে বানানো হয়েছে কৃত্রিম প্রপাত। অবিরাম জলস্রোতের কলরবে কানে তালা লাগবার জোগাড়। রেস্তোরাঁটি যেন সেই প্রপাতের জলে ভাসছে। একধারে ওক কাঠের রেলিং। সেখানে দাঁড়ালে স্বচ্ছজলে নিজের প্রতিবিম্ব দেখা যায়।
সেটাই হয়তো দেখছিল মোটাসোটা মেয়েটি। ও-কে সেই ইয়েরেভান থেকে অবজারভ করছি। নীলচে জিন্সের সাথে পরেছে কালচে টপস। পিঠ ঢেকে আছে সিংহের কেশরের মতো লালচে চুলে। ঠোঁটে মেরুন লাল রঙের গাঢ় লিপস্টিক। নিজের কোমরে ঝোলানো ছোট ব্যাগ থেকে এবারে সে বের করে সেলফোন। তবে ছবি তোলার মুহূর্তে এক কাণ্ড করে বসে। জাদুকর যেমন করে নিজের ঝোলা থেকে বার করে সিল্কের রুমাল, তেমনি করে সেও সেই ব্যাগ থেকে বের করে সিল্কের দোপাট্টা। তারপর কেশরাজিকে আলতো করে আচ্ছাদন করে পটাপট তুলে নেয় কয়েকটি ছবি। তাজ্জব ব্যাপার হলো, ওই একই স্থানে আবার দোপাট্টা খুলে একই ভঙ্গিমায় তোলে আরও কিছু ছবি। এবারে বুঝে যাই, মেয়েটি নির্ঘাত ইরানি। দোপাট্টাসহ ছবিগুলো হয়তো বাইরের জগতে দেখাবার জন্যে, আর বাকিগুলো নিজের কিংবা পরিবারের লোকেদের দেখবার জন্যে। ইরানি মেয়েরা আশপাশের এসব দেশে ঘুরতে এলে হিজাব খুলে ফেলে। নিজের দেশের সুকঠিন অনুশাসন থেকে একপ্রকার মুক্তির আনন্দে গা ভাসায়। লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতিতে ওখানে ঘুরতে যাওয়া নিরাপদ কি-না, সেই নিয়ে আলাপ করছিলাম বাশারের সাথে। বাশার বৈরুত বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমিস্ট্রি পড়ায়। ওর একগাল দাড়ি। আর মাথায় বর্ষায় জেগে থাকা এক চিলতে ভূখণ্ডের মতোই চকচকে টাক। চেহারা সুরতে খাঁটি আরব হলেও, মুখনিঃসৃত ইংরিজিতে জড়তা নেই বললেই চলে। বাল্যকাল থেকেই নাকি পড়েছে বৈরুতের ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে, সেই জন্যেই ইংরেজিতে এই স্বাচ্ছন্দ্য। আমাদের দিকে সেই মেয়েটি এবারে হাসি-হাসি মুখে এগিয়ে আসে। তবে তার মূল লক্ষ আমি নই, বাশার। সবার চিনপরিচয় নেবার পর এবারে সে বাশারের সাথে সখ্য গড়ার জন্যে বলে, ‘আমিও কিন্তু তোমার মতোই গবেষক। তেহরানে জেনেটিক্স নিয়ে কাজ করছি। এইতো, এখানে এসেছি একটা কনফারেন্সে পেপার পড়ার জন্যে।’ সেটি শুনে বাশারের চিত্তে কতটা হাওয়া দোল খায় জানি না, তবে আমার কিন্তু ব্যাপক হাই পায়। আমি তাই বাশারকে বলি, ‘লেটস গো ইনসাইড। দেরি করলে হয়তো দুপুরের খাবার খেতে হবে সন্ধ্যায়।’ মেয়েটি আমাদের পিছু নেয়। লম্বা মতন একটি টেবিলে বসি আমরা। আর মেয়েটি বসে আমাদের উল্টোদিকে। মাঝে থাকে উল্টো করে রাখা কয়েকটি থালা আর সেগুলোকে কেন্দ্র করে ধান্দা নিয়ে উড়ে বেড়ানো কয়েকটি ডুমো মাছি। সেই মাছিদের ঘূর্ণনের মাঝেই দেখি, মেয়েটির থোবড়া গালে চড়া মেকআপ পাউডারের উপস্থিতি। বেয়ারা সেই মুহূর্তে টেবিলে এনে রেখে যায় কিছু শুকনো রুটি। আমি একটি রুটি তুলে মুখে চালান করার মুহূর্তে শুনতে পাই, মেয়েটি বাশারকে বলছে তার আরও কিছু বৃত্তান্ত। ইরানের মাশাদ শহরে নিবাস হলেও এখন সে থাকছে তেহরানে। মাস্টার্স করছে। ওখানে তার প্রফেসর পিতা মেয়ের থাকবার সুবিধের কথা চিন্তা করে একখানা ফ্ল্যাট খরিদ করে রেখেছেন। সেখানেই শাহনাজ, অর্থাত্ এই মেয়েটি একা থাকে। তবে দেশে আর বেশিদিন থাকবার ইচ্ছে তার নেই। পাশ্চাত্যের কোনো দেশে পিএইচডি’র বৃত্তি খুঁজছে। সুযোগ পেলেই পালাবে। আর্মেনিয়াতেও বৃত্তির একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু তার আশা আরও উচ্চ। এইসকল কিছুর সাথে সে এখনো যে বিয়ে থা করেনি, কিংবা ভিন্নভাবে বললে বলা চলে সে একজন সুযোগ্যা পাত্রী, সেটিও কায়দা করে বাশারের কাছে পেশ করে। আড়চোখে তাকিয়ে দেখি, বাশার মেয়েটির এই সমর্পণসুলভ কথোপকথন বেশ উপভোগ করছে। তবে এরই মাঝে একটা ক্লাইম্যাক্স তৈরি হয়, যখন মেয়েটি দুম করে জিজ্ঞাসা করে বসে, ‘আর ইউ আলান?’ প্রশ্নটি বুঝতে কয়েক মুহূর্ত বেগ পেতে হলেও পরে বুঝে যাই ও আসলে বাশারকে বলতে চাইছে, বৈরুতে কি তোমার কোনো সহেলি আছে? বাশার লাজুক মুখে মেয়েটির থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে দূরের পাহাড়ের দিকে তাকায়, তারপর কয়েক সেকেন্ডের বিরতি নিয়ে বলে, ‘আর দু মাস পর আমার বিয়ে। কনে ঠিক হয়ে আছে।’ সত্যি বলতে কি, এই স্বল্প সময়ের আলাপ যে এভাবে দ্রুতগতিতে বিয়ের ময়দান পর্যন্ত গড়াবে, সেটি ঠিক আন্দাজ করে উঠতে পারিনি। সে অবশ্য আমার মার্কিন মুলুকের অভিজ্ঞতার কারণেও হতে পারে। আমার এক আফ্রিকান-আমেরিকান বন্ধু প্রায় পাঁচ বছর ধরে প্রেম করছে, ওকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘বিয়ে করছ কবে?’ যেন বোকার মতো অপ্রাসঙ্গিক এক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে ফেলেছি—এমন ভঙ্গিতে সে বলেছিল, ‘আরে ধুর, এখনই কীসের বিয়ে? উই জাস্ট হ্যাভ স্টার্টেড এঞ্জয়িং দ্যা টাইম। দেখা যাক!’ মার্কিন ছেলে-মেয়েরা পরিচয়ের প্রারম্ভেই সম্পর্কের গভীরতার ভবিষ্যত্ নিয়ে ভাবতে পারে না, আর বিয়ে তো বহু দূরের কথা।
নৌকা বাইচের মাঝি কিছুদূর জোরসে চালাবার পর হঠাত্ বৈঠা ফেলে দিলে যে দশা হয়, শাহনাজের অবস্থাও যেন তেমনই। বেচারি চুপসে যায়। আমি সেই মুহূর্তে স্ট্র দিয়ে চুক চুক করে খাচ্ছি ‘তান’, যেটি আদতে হলো তরল চুকো দৈ। অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলছে না দেখে আমি নতুন এক প্রসঙ্গের অবতারণা করি, ‘শাহনাজ, তোমাদের ওখানে গত ক’দিন ধরে দেখছি বেশকিছু সরকার-বিরোধী আন্দোলন হচ্ছে, ব্যাপারটা কী বলতো!’ আমার প্রশ্নে ও তেমন কোনো উত্সাহ পায় না, সংক্ষেপে শুধু বলে, ‘উই হ্যাভ অ্যা ভেরি ব্যাড গভমেন্ট।’ ওই ওটুকুই। এর বেশি কিছু নয়।
দই খাওয়া শেষ হলে আমি রেস্তোরাঁর বাইরে এসে দাঁড়াই। রোদের তেজ এখনো কমেনি। এমন রোদে বাইরে দাঁড়াবার চেয়ে হয়তো গাড়ির ভেতরে বসা বেশি উত্তম। আমাদের গাড়ির ড্রাইভার রোদের দিকে পিঠ রেখে তখন আরামসে সিগারেট ফুঁকছেন। আমি গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলে তিনি চাবি দিয়ে পেছনের দরজা খুলতে খুলতে বলেন, ‘তুমি নিশ্চয়ই ভারতীয়? আমি তোমাদের রাজ কাপুরের অন্ধ ভক্ত। আমার ছোটবেলায় ওর কত সিনেমা-ই যে দেখানো হতো আর্মেনিয়ায়! মায়ের সাথে থিয়েটারে গিয়ে দেখতাম সেসব।’ সোভিয়েত সময়ে এ-অঞ্চলে যে হরহামেশাই ভারতীয় সিনেমা সরকারের তরফ থেকে প্রদর্শন করা হতো, সে আমি জানতাম। তাই ভদ্রলোকের কথায় খুব একটা চমকাই না। এ-নিয়ে তার সাথে আরও কথা বাড়াবার আগে বাসের খোলা দরজায় উঁকি দেয় শাহনাজের হাঁড়িমুখ। বাসে সেই মুহূর্তে অসংখ্য খালি আসন থাকা সত্ত্বেও সেই মুখটিকে পরমুহূর্তে আবিষ্কার করি ঠিক আমার পাশে। গলায় লতার মতো ঝোলানো দোপাট্টা দিয়ে নিজেকে কিছুটা বাতাস করে আচমকাই সে আমার কাছে জানতে চায়, ‘তা, আজ রাতে কী করছ তুমি? ক্যান উই হ্যাভ অ্যা বিয়ার টুগেদার?’ বাশারের কাছ থেকে কামানের গোলা খাবার পর মেয়েটিকে আবারও গুলিবিদ্ধ করা উচিত হবে কি-না, সেই নিয়ে আমি বিশাল এক ভাবনার মাঝে পড়ে যাই।
