পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ অলস বসে নেই। এ সমস্যা মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে নিজস্ব অর্থায়নে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা একটি বৈশ্বিক বিষয়। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু দেশের বাইরে থেকে অর্থ আসবে—এমন ধারণা নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। এ মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এক পরামর্শ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। পরিবেশ ও বন রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ‘দেশীয় বিনিয়োগ পরিকল্পনা’ বিষয়ে এই দ্বিতীয় জাতীয় পরামর্শ সভার আয়োজন করে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়। এতে সহযোগিতা করে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। প্রসঙ্গত, প্যারিসে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের শীর্ষ জলবায়ু সম্মেলনে সদস্য দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় যে একশ’ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অঙ্গীকার করেছিলো তা খরচে দেশগুলোর বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে এখন আলোচনা হচ্ছে।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, বড় ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশকে শুধু বিদেশি সাহায্যের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। আন্তর্জাতিক সংস্থা বা বন্ধু দেশের সাহায্য এক্ষেত্রে আমাদের সহযোগিতা করতে পারে। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রতিবছর বৈশ্বিকভাবে আমাদের একশ’ বিলিয়ন ডলার দরকার। কিন্তু সব দেশের অর্থনীতির সূচক নিচের দিকে যাচ্ছে। এটি উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু এটিও সত্যি যে, এসব অর্থ খরচের জন্য আমাদেরকে অবকাঠামোর উন্নয়ন করতে হবে। কিন্তু পরিকল্পনা ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে অনেক উন্নয়নশীল দেশের মত আমাদেরও পর্যাপ্ত প্রতিষ্ঠান নেই। প্রাতিষ্ঠানিক ও টেকসই উন্নয়নের জন্য যে অর্থ দরকার তার সংস্থান সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও করতে পারে।
পরিবেশ ও বন মন্ত্রী বলেন, সর্বশেষ জলবায়ু সম্মেলনে ২০২৫ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় কতগুলো লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রাপ্ত টাকার উপযুক্ত ব্যবহার করাটাও গুরুত্বপূর্ণ। কেননা অনেক ক্ষেত্রে খরচের অপচয়ও হয়। অপচয় প্রকল্পের ব্যয় ও বাস্তবায়নের সময়সীমা বাড়ায়। এটি রোধ করা জরুরি। তিনি বলেন, বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, বাংলাদেশ পানির ১০ ফুট নিচে তলিয়ে যাবে। আবার আমাদের জমির স্বল্পতা রয়েছে। প্রতি বছর দুই শতাংশ জমি নদীভাঙনে চলে যাচ্ছে। সবমিলিয়ে ৫ শতাংশ জমি আমরা হারাচ্ছি। এ অবস্থায় পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আমাদের সচেতন ও সংবেদনশীল হয়ে কাজ না করে উপায় নেই।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু আরো বলেন, আমাদের বনের পরিমাণ ১৪ শতাংশ থেকে ১৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বনায়ন, পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি মোকাবিলায় বিদেশ থেকে অর্থের সংস্থান হোক বা না হোক আমাদেরকে লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে যেতে হবে। সনাতনী মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে পরিবেশ ও বন সচিব ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের উপকূলীয় ১৯টি জেলার ৯০ লাখ মানুষ প্রচণ্ড ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততাসহ নানা কারণে তারা বিপদগ্রস্ত। উপকূলসহ সারাদেশে পরিবেশ ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। টেকসই উন্নয়নে নজর দিতে হবে।
ইউএসএইড বাংলাদেশ’র মিশন পরিচালক জেনিনা জারুজেলস্কি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশ এখন এক নম্বরে রয়েছে। ২০২৫ সালে এ জন্য সবচেয়ে বেশি ভুগবে বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশের এক মুহূর্ত সময়ও অপচয় করা উচিত হবে না। সিআইপি প্রণয়ন খুবই কার্যকরী উদ্যোগ। এটি দ্রুত চূড়ান্ত ও বাস্তবায়ন করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বকেও নেতৃত্ব দিতে পারে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আব্দুল্লাহ আল মোহসিন চৌধুরী, প্রধান বন সংরক্ষক মো. ইউনুস আলী, এফএও বাংলাদেশ’র প্রতিনিধি মাইক রবসন, প্রধান কারিগরি উপদেষ্টা ড. মার্কো বস্কলো, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের জাতীয় পরামর্শক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব ও মো. শাহেদুজ্জামান।
উল্লেখ্য, ইউএসএইড’র সহযোগিতায় ‘পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এবং এর সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি’ প্রকল্পের আওতায় আগামী পাঁচ বছরের জন্য দেশীয় বিনিয়োগ পরিকল্পনা (সিআইপি) প্রণয়ন করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে এ সভার আয়োজন করা হয়।
