:পশ্চাদ্দেশে বাতাস দিচ্ছে কে? কোন হালার পুত?
লজ্জাস্থানে পাওয়া ঠাণ্ডা হাওয়ায় গা শিরশির করে বোরহান মিয়ার। একইসাথে বিব্রত এবং বিরক্তও লাগে। মনে মনে বলে—
:আইজ তরে খাইছি।
বেঘোরে ঘুমাচ্ছিল বোরহান মিয়া। এমন কাণ্ড ঘটলে কি আর ঘুমিয়ে থাকা যায়! তবুও সে তাকায় না। আধো ঘুমে, আধো জাগরণে থেকে লুঙ্গির ভেতর প্রবাহিত বাতাসের উত্সসন্ধানে ওত পেতে থাকে। চোখ খুলতেও ইচ্ছা হয় না। অবচেতনে হাত দিয়ে লুঙ্গির অবস্থান দেখে নেয়। না, যথারীতিই আছে সব। যেভাবে গিঁঠ দেওয়া ছিল সেভাবেই আছে।
ওই তো আবারও... আবারও বেলাজ বাতাস ঢুকে পড়ল লুঙ্গির ভেতর। মনে হলো কে যেন ফুঁ দিচ্ছে। ফুঁ দিচ্ছে সোজা পশ্চাদ্দেশ বরাবর। মাথায় বাতাস লাগলে আরামে ঘুম হয়। পশ্চাদ্দেশে লাগলে ঘুম ভেঙে যায়। তবুও বোরহান মিয়া চেষ্টা করে ঘুম থেকে না জাগার। কিন্তু হঠাত্ পাওয়া একটা হাসির শব্দে ঘুম ভেঙে না তাকিয়ে পারে না সে। তাকিয়ে দেখে মন্টু টোকাই হাসছে বোরহান মিয়ার পশ্চাদ্দশের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে।
:ছিঁড়া... ছিঁড়া... ওই দেহা যায় খিরা!
বোরহান মিয়া মনে মনে বলে—
:কত্ত বড় বেয়াদব!
মেজাজ তার সপ্তমে ওঠে। ইচ্ছে হয় দৌড়ে গিয়ে বদমাশটার গালে কষে একটা থাপ্পড় লাগাতে। কিন্তু সে পারে না, পারে না কারণ বোরহান মিয়া হাঁটবার কিংবা দৌড়াবার অধিকার হারিয়েছে বহুদিন আগেই। এক সড়ক দুর্ঘটনা তার দুটো পা-ই কেড়ে নিয়েছে। অগত্যা বোরহান মিয়া মেজাজ ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করে। মন্টু টোকাইয়ের হাসি তবুও থামে না। বোরহান মিয়া তার পশ্চাদ্দেশে হাত দিয়ে টের পায় লুঙ্গিটার অনেকটা অংশ ফেঁসে গেছে। কখন ফেঁসেছে সে জানেই না। বুঝতে পারে পশ্চাদ্দেশে বাতাস প্রবেশের কারণ তবে এটাই। বিনয়ের সাথে বোরহান মিয়া ডাকে মন্টু টোকাইকে—
:বাবা মন্টু, আয় এদিকে।
:উঁহু আইতাম না, পরে মারবাইন।
:কী কস্? মারতাম ক্যা? তুই তো আমার উপকারই করছস। মাইনসে দেখার আগে আমারে সাবধান কইরা দিছস।
:আগে কইন ডাহুইন ক্যা?
:দোহান থাইক্কা সুই-সুতা আইনা দে। লুঙ্গিডা সেলাই করি।
:পারতাম না।
:সুই-সুতা কিইন্যা কয়ডা টেহা বাঁচবো। ওই টেহা কয়ডা তরে দিয়া দিমুনে। ওইগুলা দিয়া তুই কিছু কিইন্যা খায়া লইস।
এবার আর লোভ সামলাতে পারে না মন্টু টোকাই। সকাল থেকে তেমন কিছু খাওয়া হয়নি। পেটে ক্ষিধেও আছে। সুই-সুতা কিনে যে কয় টাকা বেঁচে যাবে সে কয় টাকায় সে তার জন্যে খাবার কিনতে পারবে। এটা ভেবেই তার নাকে খাবারের ঘ্রাণ পায় মন্টু টোকাই। সে ঘ্রাণ পায় গরম পুরি, সিঙ্গারা আর পিঁয়াজুর। ঘ্রাণে পেট মোচড় দেয়। যদিও জানে একইসঙ্গে তিনটা জিনিস খাওয়ার জন্যে টাকা দেবে না বোরহান মিয়া। তাতে কী, বাস্তবে না হোক, মনে মনে খাবারের কথা ভাবতে সমস্যা কী?
খাবারের কথা ভাবতে ভাবতে বোরহান মিয়ার কাছে আসে মন্টু টোকাই। হাতের কাছে আসতেই মন্টুর গালে এক মণ ওজনের একটা থাপ্পড় লাগায় বোরহান মিয়া।
:আমার লগে মশকারা করস! আমি কি তোর দুলাভাই?
হতভম্ভ হয়ে যায় মন্টু। চোখে কিছুক্ষণ শর্ষে ফুল দেখে। তারপর গালে হাত দিয়ে বসে পড়ে প্লাটফরমে। চোখ দিয়ে টপাটপ জল পড়ে। বোরহান বুঝতে পারে চড়টা একটু বেশি জোরেই লেগে গেছে। যারা পথেই থাকে, পথেই বেড়ে ওঠে তারা অল্প ব্যথায় কেঁদে ফেলে না। বোঝাই যাচ্ছে, ব্যথা একটু বেশিই লেগেছে, তাই কাঁদছে মন্টু টোকাই। খারাপ লাগে বোরহান মিয়ার, ইচ্ছা হয় জড়িয়ে ধরে ছেলেটাকে চুমু খেয়ে ‘সরি’ বলে। কিন্তু করে না, নিজেকে নিবৃত্ত করে বোরহান মিয়া। এই সমস্ত ছেলেকে আদর করলে ওরা প্রশ্রয় পেয়ে ঘাড়ে চড়ে বসে। পরে আর শাসন করা যায় না কোনোদিনই। পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকার নোট বের করে বলে—
:যা সুই-সুতা কিইনা নিয়া আয়। আর বাকি টাকায় নিজে নাস্তা কইরা নিস।
:সুই-সুতা কিনতে এত টেহা লাগবো না। খুচরা টেহা দেইন।
:আমার কাছে এর চাইতে ছোট নোট নাই।
মন্টু টোকাই চলে যায়। কথাটা মিথ্যা বলেছে বোরহান মিয়া। তার কাছে এর চাইতে ছোট নোটও ছিল, কিন্তু মন্টু টোকাইকে ইচ্ছা করেই ছোট নোট দেয়নি সে। কারণ, বোরহান মিয়া নিশ্চিতভাবেই জানে মন্টু টোকাই টাকাটা তাকে আর ফেরত দেবে না। সুই-সুতোও কিনে এনে দেবে না। পুরো টাকাটাই মেরে দেবে। মেরে দেবে ধারণা করা সত্ত্বেও বোরহান মিয়া মন্টুকে টাকাটা দিয়েছে মূলতই থাপ্পড়ের ভর্তুকি হিসেবে। পঞ্চাশ টাকায় এক থাপ্পড়। এটা খুব ব্যয়বহুল মনে হতে পারে অনেকের কাছে। কিন্তু বোরহান মিয়ার কাছে এটা মোটেও বেশি টাকা নয়। কারণ তার ইনকাম ভালো। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আছে বলে হাত পাতলে লোকজন দু-চার টাকা দেয় তাকে। এখন প্রশ্ন হতে পারে, ইনকাম বেশি হওয়া সত্ত্বেও এত পুরাতন লুঙ্গি কেন পরে বোরহান মিয়া? পরে কারণ—সে যে সামর্থ্যবান, এটা তার কাস্টমারদের সামনে উপস্থাপন করা যাবে না। তাতে তার ব্যবসা কমে যাবে। এ সমস্ত পুরাতন ছেঁড়া লুঙ্গি কিংবা জামাকাপড় বোরহান মিয়ার ব্যবসায়িক কস্টিউম। ভিক্ষা পেশায় এক্সপ্রেশনের পাশাপাশি কস্টিউমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। তাই সে কখনো-সখনো তার নতুন পোশাকের বিনিময়ে পুরাতন পোশাকও সংগ্রহ করে। অথচ মানুষ জানেই না, বোরহান মিয়া চাইলে যখন তখন একশোটা গেঞ্জি কেনার সামর্থ্য রাখে।
বোরহান মিয়ার ধারণাকে মিথ্যা প্রতীয়মান করে মন্টু টোকাই ফিরে আসে অল্প সময়ের ভেতর। সাত টাকা খরচ করে কিনেছে সুতা আর সুই।
:এই যে পাঁচ টেহার সুতা আর সুই নিছে দুই টেহা। বাকি আছে তেতাল্লিশ টেহা।
:এই টেহা তো আমি তরে দিছি নাস্তা করার লাইগা।
:লাগতো না টেহা। নেইন।
গুনে গুনে বাকি তেতাল্লিশ টাকা ফেরত দিয়ে দৌড়ে চলে যায় মন্টু।
:মন্টু... মন্টু...
বোরহান মিয়ার কোনো ডাকেই আর কর্ণপাত করে না মন্টু টোকাই। সে পালিয়ে যায় বোরহান মিয়ার কাছ থেকে। গেল তো গেল, আর এল না সে।
ততক্ষণে বোরহান মিয়া ব্যস্ত হয়ে পড়েছে নিজের ব্যবসায়—
:আমার আল্লা নবীজির নাম।
পঙ্গুর হাতে দুইটা টাকা কইরা যাইবেন দান,
আখেরাতে সোয়াব পাইবেন পর্বত-অ সমান।
আমার আল্লা নবীজির নাম।
ভিড় বাড়ছে প্লাটফরমে। মহানগর প্রভাতী ট্রেনটি ছেড়ে যাওয়ার টাইম হয়েছে বলে যাত্রীরা এখন ব্যস্ততার মধ্যে আছে। বোরহান মিয়া তার বিয়ারিং নির্মিত ঠেলাগাড়িটিকে হাত দিয়ে ঠেলতে ঠেলতে সামনের দিকে এগোয়। ক্যারক্যারক্যার শব্দ হয় চাকায়। বোরহান মিয়া হাত পাতে। বেশিরভাগ যাত্রীই—মাফ করো... মাফ করো... ধ্বনি তোলে। তবে দু-একজন দেয়। দু’ টাকা, পাঁচ টাকা, কেউ কেউ আবার দশ টাকাও দেয়। বোরহান মিয়া লক্ষ করেছে—কিছু কিছু মানুষ এখনো কালেভদ্রে এক টাকার কয়েনও দেয়। দিতে তাদের হাত কাঁপে, মনে হয় কলিজার টুকরাটা যেন দান করে ফেলছে। বোরহান মিয়ার ইচ্ছা হয় সেই সমস্ত যাত্রীর এক টাকার কয়েনটা তাদের মুখের ওপর ছুড়ে মারতে। বলতে ইচ্ছা হয়—আরে শালা, এক টাকার কয়েনে কী হয় আজকাল! কিন্তু সে বলতে পারে না, কারণ সে বিক্রেতা। সে জানে প্রচলিত সেই প্রবাদটি—খদ্দের লক্ষ্মী ভগবান প্যাঁচা। এক অর্থে ভিক্ষুককে যারা টাকা দেয় তারা তো খদ্দেরই, তা-ই না? তারা টাকা দিয়ে দোয়া কেনে। দোয়া কেনে শারীরিক সুস্থতার, নির্বিঘ্ন যাত্রাপথের জন্যে, দোয়া কেনে মৃত আত্মীয়স্বজনের কবরের আজাব দূরীকরণের, সংসারে আয়-উন্নতি ইত্যাদির। আচ্ছা, এক টাকার কয়েন দাতাদের কাছে কি দোয়া বিক্রি করা যায়? উমমম...কিসের দোয়া বিনিময়, তাদের দেয়া উচিত শাস্তি। যেমন এক টাকার বিনিময়ে তাদেরকে তাত্ক্ষণিকভাবে দশ টাকা ফেরত দিয়ে দেয়ার মতো শাস্তি। তাতে তারা বিব্রত হবে। ভাববে একজন ভিক্ষুক আমারে দশ টাকা দেয়ার ক্ষমতা রাখে, আর আমি কিনা মাত্র এক টাকা! অবশ্য উল্টো ঘটনাও ঘটতে পারে। যেমন ঘটেছিল একবার বছর দুয়েক আগে।
শীতের রাত। প্রচণ্ড কুয়াশা পড়েছিল সে-বার। একটা বয়স্ক স্যুট-টাই পরা ভদ্রলোক ট্রেনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল প্লাটফরমে। মুখ দিয়ে শীতের ধোঁয়া বেরুচ্ছে। বোরহান মিয়া হাত পাততেই লোকটা পর্যবেক্ষণ করে বোরহান মিয়াকে। তারপর এক টাকা দেবে বলে দুই টাকার একটা নোট বের করে দেয় বোরহান মিয়াকে—
:এক টাকা রেখে এক টাকা ফেরত দাও।
বোরহান মিয়া মজা দেখার ছলে অন্ধের অভিনয় করে এক টাকার বদলে একশ টাকার একটা নোট দেয় লোকটাকে।
:এই যে আপনার এক টেহা। চোখে বিশেষ দেহি না ভাই, একটু দেইখ্যা নিয়েন।
:না না, ঠিক আছে।
লোকটা টাকার দিকে একবার তাকিয়ে না দেখার ভান করে টাকাটা পকেটে পুরে হনহন হেঁটে চলে যায়। বোরহান মিয়া লোকটার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। দেখে লোকটার হাঁটার গতি বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষটা একবারের জন্যেও পেছন ফিরে তাকায়নি। বোরহান মিয়া এতদিনে মানব চরিত্র সম্পর্কে বিশাল এক অভিজ্ঞতা অর্জন করে ফেলেছে বলে লোকটার আচরণে অবাক হয় না মোটেও। কেবল সে মুচকি হাসে। প্রকাশ্যে বলে—
:যা, দিলাম তোরে একশো টেকা ভিক্ষা।
হাত দিয়ে গাড়ি ঠেলতে ঠেলতে আজ হাতে একটু ব্যথা লাগছে বোরহান মিয়ার। চড়টা বেশ জোরেই দেয়া হয়েছিল মন্টু টোকাইকে। এ ব্যথা কি সে কারণেই? হতে পারে। বোরহান ভাবে, আহারে, আমারই ব্যথা লাগতাছে চড় দিয়া, চড় খায়া না জানি পোলাডার কী অবস্থা! হঠাত্ সে খেয়াল করে প্লাাটফরমের কোনায় জটলা করেছে একদল টোকাই। নিশ্চয় মন্টুও আছে ওইখানে। বোরহান ভাবে, পোলাডারে ডাক দিয়া ‘সরি’ কয়া একটু পুরি সিঙ্গারা খাওয়ায়া ঠাণ্ডা করতে হইবো। নাইলে যতক্ষণ অভিশাপ থাকবো ততক্ষণ হাতের ব্যথাডা কমবো না। সে গাড়ি ঠেলতে থাকে জটলার দিকে। গিয়ে শোনে ওরা খুব শঙ্কিত কণ্ঠস্বরে কথা বলছে পরস্পরের সাথে—
:কস কী! মন্টু টোকাই একসিডেন্ট করছে?
:হ বেডা। রাস্তার পাশে খাড়ায়াছিল একটা প্রাইভেট কার আইসা ফুটপাতের উপর উডায়া দিছে।
:তরে কেডা কইছে?
:কইছে কেডা মানে! আমি নিজের চোখে দেখছি। তারপর ধরাধরি কইরা নিয়া গেছি হাসপাতালে। সারা শরীল রক্তে ভাইসা গেছে। অহন বড় ডাক্তারে দেখতাছে। অবস্থা খারাপ।
:তাইলে চইলা আইলি ক্যান?
:অহন তো ওইহানে আমার কাম নাই। সব ডাক্তারের কাম। আর এইহানে আমার।
:কী রহম?
:ডাক্তার নিশ্চয় নানান রহম টেস্ট দিবো, অসুধপাতি কিনতে কইবো, বহুত টেহার দরকার। আমি আইছি টেহা জোগাড় করতে। সবার এহন খাড়াইতে অইবো মন্টুর পাশে। কী কস?
:হ হ। যার যা আছে তাই দিয়া সাহায্য করুম মন্টুরে।
আড়ি পেতে টোকাইদের সব কথা শোনে বোরহান মিয়া। অনুশোচনা তৈরি হয় তার ভেতর। খারাপ লাগে মন্টুর জন্যে। সকালবেলায় দেয়া চড়ের অপরাধে আত্মদহন হতে থাকে মনের ভেতরে। সে বলে—
:কোন হাসপাতালে ভর্তি করানো হইছে মন্টুরে?
:ঢাকা হাসপাতালের ভাঙাচোরা ওয়ার্ডে।
বোরহান মিয়া উত্তর শুনে দাঁড়ায় না আর। ঠেলতে থাকে তার বিয়ারিংয়ের গাড়ি। এগোতে থাকে কমলাপুর রেলস্টেশনের মূলগেটের দিকে।
গেটের সামনে গিয়েই একটা সিএনজি পেয়ে যায় সে।
:ঢাকা মেডিক্যাল যাইবা নাকি মিয়া?
:ওডেন।
:ভাড়া কত দিতে অইবো?
:মিটারে যা ওডে দিয়েন। আপনের লগে আবার ফুড়ানি লাগবো নাহি।
সিএনজি অলার আচরণে মুগ্ধ হয় বোরহান মিয়া। ঢাকা শহরে ইদানীং এ ধরনের মানুষের বড় অভাব। যাত্রীসেবার ব্রত নিয়ে কাজ করা রিক্সাঅলারা তাকে ওঠায় না, ওঠানো নামানোর ঝামেলা বলে। বাসে ওঠায় না বিয়ারিংয়ের গাড়ি-সহ জায়গা একটু বেশি দখল করবে বলে। আর সিএনজিঅলারা যাত্রী হিসেবে এসব ভিক্ষুক শ্রেণিকে পছন্দ করে না।
সত্যি সত্যিই এই সিএনজিঅলা একটু অন্যরকম। সে কোলে তুলে বোরহান মিয়াকে উঠিয়ে দেয় সিএনজির সিটে। হার্ডব্রেকও কষে না, পাছে আবার না পড়ে যায় বোরহান মিয়া। একি! শেষপর্যন্ত নামার সময় ভাড়াও নিতে চায় না লোকটা। বলে—
:ভাড়া লাগবো না চাচা, আপনে যান।
:এইডা কী কন! আপনের গ্যাস খরচ হইছে না?
:আপনে আমার বাবার বয়সী। আমার বাবাও একটা পা হারায়া বাড়িতে বইসা থাকে সারাক্ষণ। তারেও চলতে হয় অন্যের সাহায্য নিয়া। আমি ঢাকায় থাকি বইলা আব্বারে সাহায্য করতে পারি না। আইজ আপনেরে সাহায্য কইরা না হয় বাবারে একটু স্মরণ করলাম।
ছেলেটির চোখ ছলছল করে। এমন ইমোশনাল আবেদনের পর কিছুই বলার থাকে না বোরহান মিয়ার। কেবল বলে—
:আল্লা আপনের মঙ্গল করুক।
ঢাকা মেডিকেলের ভাঙাচোরা ওয়ার্ডের দিকে এগাতে থাকে ভাঙাচোরা বোরহান মিয়া। মন্টুর আশু রোগমুক্তির দোয়া সারাক্ষণই জপ করতে থাকে মনে মনে। যে হাত দিয়ে বিয়ারিং গাড়িটিকে ঠেলছে সেটিতে জমাট ব্যথা সকাল থেকে। বোরহানের ঠেলতে কষ্ট হয় খুব।
একি! কে দাঁড়িয়ে আছে ওয়ার্ডের সামনে? আম্বিয়া খাতুন না? পরনে বোরখা, মাথায় নেকাব, মুখটা খোলা বলে তাকে চিনতে একটুও কষ্ট হয় না বোরহান মিয়ার। সেই নাক, সেই চোখ, সেই মুখ। আম্বিয়ার বয়স হয়েছে ঠিক, কিন্তু সেটা তার চেহারায় ফুটে ওঠেনি। আচ্ছা, কেন দাঁড়িয়ে আছে সে? তার তো এখানে দাঁড়িয়ে থাকার কথা নয়!
আম্বিয়ার সংসার নেই, বাবা-মা ভাইবোনের সাথেও সম্পর্কচ্ছিন্ন। তবে কার জন্যে এসেছে সে? আম্বিয়ার সাথে বহুদিন দেখা নেই বোরহান মিয়ার। ও কি চিনতে পারবে বোরহান মিয়াকে?
বোরহান মিয়া আম্বিয়ার কাছে গিয়ে টের পায় আম্বিয়া কাঁদছে।
: কী ব্যাপার আম্বিয়া, তুমি এইখানে?
:আমার পোলা মন্টু টোকাই একসিডেন্ট করছে। মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়তাছে।
:মন্টু তোমার ছেলে!
:হ। আমার পোলা।
:কও কী! তা ওয়ার্ডের ভিতরে যাওনা ক্যান?
:ওয়ার্ডেই ছিলাম। একটু আগে বাইর কইরা দিছে নার্সরা। এখন ডাক্তারের ভিজিটের টাইম।
:তা ওর বাপ কই?
:ওর বাপ কে আমি জানি না। অবশ্য তুমিও হইবার পারো।
কথাটা হূদয়ে কাঁটার মতো বিঁধে বোরহান মিয়ার। আসলেই তো তা-ই! একজন যৌনকর্মীর সন্তানের পিতা কে, সেটা সেই যৌনকর্মী কীভাবে জানবে? যে কোনো খদ্দেরই হতে পারে তার পিতা। সে হিসেবে বোরহান মিয়াও হতে পারে।
বোরহান মিয়া টের পায় তার শরীর কাঁপছে। সংসারকর্ম করেনি বোরহান। স্ত্রী-সন্তান নেই। তবে কি হঠাত্ তার পিতৃত্ব জেগে উঠল আম্বিয়ার কথায়?
বোরহান মিয়ার পা ভেঙেছে সেই ভরা যৌবনে। তখন সে রিকশা চালাত। পা ভাঙার কারণে চলতি প্রেম ভেঙে গিয়েছিল জোলেখার সাথে। একটা পঙ্গু লোকের সাথে কেনই বা সম্পর্ক রাখবে একজন সুস্থ-সবল মানুষ? তারও তো ভবিষ্যত্ আছে। অতপর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে জোলেখা ভেগে গিয়েছিল বাবুর্চি সালাম মিয়ার সাথে। বিয়েও করেছিল তারা। বিয়ের আগে জোলেখা অবশ্য একবার দেখাও করতে এসেছিল বোরহান মিয়ার সাথে। তখনও বোরহান হাসপাতালে ভর্তি। জোলেখা এসেছিল রঙিন পোশাকে, চোখে মুখে কড়া মেকআপ ছিল তার, মুখ জুড়ে ছিল আনন্দের ঝিলিক। বোরহান মিয়ার কাছে জোলেখার সেদিনের আগমনটি অনেকটা কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো লেগেছিল। যাবার আগে জোলেখা বলেছিল—
:মনে কোনো কষ্ট নিও না তুমি। দোকান থাইকা জিনিস কিনলেও তো আমরা জাইনা শুইনা ভাঙা জিনিস কিনি না, তা-ই না?
বোরহান মিয়ার ইচ্ছা হয়েছিল কষে একটা চড় লাগায় জোলেখার গালে। কিন্তু সে নিবৃত্ত হয়। সে যাত্রায় ক্ষমা করে দেয় জোলেখাকে। কিন্তু আসলেই কি ক্ষমা করতে পারে! তার পা হারানোর জন্যে দায়ী ট্রাক ড্রাইভার যেমন আজন্ম ঘৃণার পাত্র বোরহানের কাছে, মন ভাঙার অপরাধে কি একই রকম ঘৃণার পাত্রী নয় জোলেখা? মনে মনে বোরহান অভিশাপ দেয় জোলেখাকে। সে অভিশাপেই কি অন্তঃসত্তা জোলেখার ছয় মাসেই গর্ভপাত ঘটে? আবার একই অভিশাপেই কি ওর সংসারটাও ভেঙে যায় দেড় বছরের মাথায়!
সে যাত্রায় ক্রমে ক্রমে অসহায় বোরহান সুস্থ হয়ে ওঠে পা ছাড়া। শুরু করে ভিক্ষাবৃত্তি। ইনকাম বাড়ে দিন দিন। কিন্তু টাকায় পেটের চাহিদা মিটলেও অপূর্ণ থেকে যায় অন্যসব চাহিদা। কেউই তো প্রেম করে না পঙ্গু বোরহানের সাথে। দু-একজন যাও আসে তাও কেবল লোভ করে বোরহানের অর্থসম্পত্তিতে। ওদের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে ওদের তাড়িয়ে দেয় বোরহান। মজার ব্যাপার হলো সংসার ভাঙা জোলেখাও আসে একদিন। তার হাভভাব পছন্দ হয় না বোরহানের। সবকিছুতেই আদিখ্যেতা। একসময় বোরহান বলে—
:লাগবো না আমার ভালোবাসা। তুমি চইলা যাও জোলেখা। তোমারে আমার সহ্য হয় না।
জোলেখা চলে যায় একপর্যায়ে। বোরহান তখন যাওয়া-আসা শুরু করে নিষিদ্ধপল্লিতে। পরিচয় হয় আম্বিয়ার সাথে। অন্য কেউ নয়, আম্বিয়ার প্রেমই টানতে পারতো বোরহান মিয়ার মনকে।
:মন্টুরে তুমি কেমনে চেন?
:ইস্টিশনে থাকে, আমার ফুটফরমায়েশ খাটে মাঝে মধ্যে। ছেলেটা খুব ভালো। যদিও আইজ সকালে আমি অযথাই খারাপ আচরণ করছি ওর সাথে। মনটা সেজন্যে বেজায় খারাপ।
আম্বিয়ার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু। আঁচলে চোখ মোছে সে। ডাক্তারের ভিজিট রাউন্ড শেষ হয়নি বলে ছেলের কাছে যেতে পারছে না আম্বিয়া, যেতে পারছে না বোরহানও।
ওয়ার্ডের দরোজায় কাচের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে বোরহান দেখে অনেক রোগী শুয়ে আছে ভেতরে। কাতরাচ্ছে ব্যথায়। হঠাত্ তার চোখ পড়ে মন্টুর দিকে। মাথাটা ফেটে গেছে। হাতটা ভাঙা। ও কী পা’টা কি কাটা গেছে ওর? তা-ই তো! হায় হায়! বোরহান মিয়া ভাবে, এ কোন নিয়তির বেড়াজালে বন্দি হলো মন্টুর মতো শিশুর জীবন?
বোরহান মিয়া বারান্দায় গিয়ে আকাশের দিকে তাকায়। তাকিয়েই থাকে অনেকক্ষণ। ভাবে, না থাক পা, তবুও বেঁচে উঠুক ছেলেটা। এত অল্প বয়সে একটা শিশুর মৃত্যু মেনে নেয়া কষ্টকর। লোকে বলে—পৃথিবীর সবচে ভারী জিনিস হলো পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ। মন্টু টোকাই বোরহানের সন্তান কি-না নিশ্চিত নয়, তবুও বোরহান মিয়ার পিতৃস্নেহ জেগে ওঠে। মনে মনে কল্পনা করে, মন্টু টোকাই সুস্থ হলে একদিন তাকে বাবা ডাকতে বলবে সে। একদিন ঘুরতে নিয়ে যাবে চিড়িয়াখানায়, না হয় একদিন শিশুপার্কের রাইডগুলোতে চড়ে বেড়াবে। মন্দ হবে কি যদি একদিন আবারও সিনেমা দেখতে যায় আম্বিয়ার সাথে, না হয় সেদিন তাদের দুজনের সিটের মাঝের সিটটি বরাদ্দ থাকবে মন্টু টোকাইয়ের জন্যে।
