‘উন্নয়নের বিস্ময়’ বাংলাদেশ নিয়ে ৮৩ বছরেও নতুন স্বপ্ন দেখিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি বাড়িয়ে সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ার নতুন উদ্যম যেন তার। সেই রকম ফিরিস্তি দিয়েই আগামী বছরের কর্মপরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে দেওয়া বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী অপর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সমস্যা মোকাবেলায় উচ্চতর হারে প্রবৃদ্ধি অর্জনকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করেন। এজন্যে ব্যাপক বিনিয়োগ দরকার। কিন্তু এই বিনিয়োগের জন্য অর্থ সংস্থান হবে কোথা থেকে? অর্থমন্ত্রী নিজেই এর সমাধান দিয়েছেন। বাজেটারি পদক্ষেপগুলোতে বিভিন্ন খাতে কর বাড়িয়ে বেশি রাজস্ব আদায়ের প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। নানামুখী ব্যয়ের চাপ সামলাতে করদাতাদের ওপর খড়গহস্ত হয়েছেন তিনি। বেশি করে কর আদায় করেই তিনি বাজেট বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করবেন, তা তার বাজেট বক্তৃতায় স্পষ্ট। এজন্যে ব্যাপক হারে ভ্যাটের আওতা বৃদ্ধি, প্যাকেজ ভ্যাট দ্বিগুণ করা, মোবাইল ফোনে কথা বলার ওপর গত বারের চেয়ে কর আরো বাড়িয়েছেন।
কর বাড়ানোর উদ্দেশ্য আয়ের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করা। সেটি কিন্তু হচ্ছে না। নানা খাতে করহার বাড়ানোর প্রক্ষেপণ করলেও অনুন্নয়ন ব্যয় মেটাতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উত্স থেকে ঋণ নিতেই হবে। ঘাটতির ৯৭ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা পূরণ করতে হবে ঋণ ও অনুদান খাত থেকে। যা করতে গিয়ে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর চাপ পড়বে। ফল হবে বেসরকারি খাতে পুঁজির প্রবাহ হ্রাস পাওয়া। তাহলে ২৭ শতাংশ বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার যে কথা অর্থমন্ত্রী বলেছেন, তা শুধু কথার কথাই রয়ে যাবে। বরং ২২ শতাংশের মত বিনিয়োগের যে প্রক্ষেপণ তিনি করেছেন, সেটিও বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। আর বিনিয়োগে পিছিয়ে থাকলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির দিকে যে গুরুত্ব তিনি বক্তৃতার প্রারম্ভেই দিয়েছেন, তাও অর্থবহ হবে না।
অন্যদিকে, বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য যেসব অপরিহার্য শর্তাদি দরকার, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে অর্থমন্ত্রীর। তিনি বলেছেন, অগ্রযাত্রার প্রধান প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে অনিশ্চিত স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা। এক্ষেত্রে গুণগত সংস্কার ও সরকারের দায়িত্ব-ক্ষমতার স্পষ্টিকরণ জরুরি। রয়েছে জ্বালানি সমস্যা। যদিও জ্বালানি সমস্যা রোধে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলেছেন, তা বিনিয়োগ সামর্থ্য না থাকলে বাস্তবায়ন হবে না।
মেগাপ্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের জোর রয়েছে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায়। ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ সবচেয়ে বেশি দিয়েছেন। চলতি বছরের বাজেটেও অগ্রাধিকার প্রকল্পের কথা ছিল। বছর শেষে পদ্মা সেতু বাদে বাকিগুলোর দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বললেই চলে। এসব প্রকল্প অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য প্রয়োজনীয়, অর্থের যোগান না হলে বাস্তব রূপ নিতে সময়তো লাগবেই।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী যে স্বপ্নের কথা শুনিয়েছেন, তা কতটা বাস্তবায়নযোগ্য সে প্রশ্ন থাকছেই। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। অনুন্নয়ন ব্যয় মিটিয়ে উন্নয়ন ব্যয় করতে গেলে যে হারে রাজস্ব আদায় করার কথা তিনি ভেবেছেন, তা আদতে সম্ভব হবে কি না—সংশয় রয়েছে। গত তিন অর্থবছরেই রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারেনি। এবারে যদিও করহার বেড়েছে, ভ্যাট আইন এক বছর পেছালেও প্যাকেজ ভ্যাট দ্বিগুণ করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে ভ্যাটের আওতা। নতুন নতুন পণ্য ও সেবা খাত ভ্যাটের আওতাভুক্ত হয়েছে। কর হারে পরিবর্তনের মাধ্যমে সামগ্রিক রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নেয়া হয়েছে ২ লাখ ৪২ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা। এ অর্থ আদায় না হলে পরিকল্পনামতে বাজেটের বাস্তবায়ন হবে না। বেশি আয় ও বেশি ব্যয়ের লক্ষ্য এবং বাস্তবায়নের এই চ্যালেঞ্জ নিয়ে উচ্চাভিলাষী অর্থমন্ত্রী সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখিয়েছেন। চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যেসব পদক্ষেপ তিনি নেবেন, বিনিয়োগ না হলে, অর্থনীতির গতি না বাড়লে সেসব পদক্ষেপের যথাযথ বাস্তবায়নও হবে না– এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
তবে কিছু ভাল পদক্ষেপও নিয়েছেন তিনি। একই ব্যক্তিমালিকানাধীন ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য আগে ভিন্ন ভ্যাট খাতে ভিন্ন নিবন্ধনের প্রয়োজন হত। এবারে সেটি রহিত করেছেন। যা ব্যবসায়ীদের হয়রানি দূর করবে। একই ভাবে কোনো কোনো শিল্পখাতের কাঁচামাল আমদানি শুল্ক কমিয়েছেন। সম্পূর্ণ তৈরি কিছু পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়েছেন, যা দেশীয় শিল্পের জন্য ইতিবাচক হবে।
বাজেটে আয়ের প্রাক্কলন :আগামী অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে ২ লাখ ৪২ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নিয়ন্ত্রিত কর বাবদ আদায়ের লক্ষ্য ২ লাখ ৩ হাজার ১৫২ কোটি টাকা। রাজস্ব আদায় বাড়াতে উেস কর হার বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
উন্নয়ন বরাদ্দ :আগামী ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের ১৩তম বাজেট। আগের মেয়াদসহ টানা অষ্টম বাজেট এটি। এর আগে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ মেয়াদে পাঁচবার তার সরকারের বাজেট দেয়া হয়। নতুন বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে মানব সম্পদ খাতে ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ থাকছে। এরপর সার্বিক কৃষি খাতে ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ, বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাতে সাড়ে ১৩ শতাংশ, যোগাযোগ খাতে ২৫ দশমিক ৮ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
সংশোধিত বাজেট :চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মূল বাজেটে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছিলো ২ লাখ ৮ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা হ্রাস করে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে দেড় লাখ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে।
সংশোধিত ব্যয় :চলতি অর্থবছরের বাজেটে সর্বমোট সরকারি ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছিলো ২ লাখ ৯৫ হাজার ১শ কোটি টাকা। বিশেষ করে সংশোধিত বাজেটে এ ব্যয় কমিয়ে ২ লাখ ৬৪ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার কিছুটা হ্রাস করে ৯১ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও কর্পোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পের বরাদ্দসহ সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার দাঁড়িয়েছে ৯৩ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকা (যা জিডিপির ৫ দশমিক ৪ শতাংশ)।
সংশোধিত বাজেট ঘাটতি :চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘাটতির প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৮৬ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা যা জিডিপির ৫ শতাংশের মধ্যেই রয়েছে। সংশোধিত বাজেটে বৈদেশিক উত্স হতে অর্থায়ন কিছুটা কমিয়ে ২৪ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা (জিডিপির ১.৪ শতাংশ) এবং অভ্যন্তরীণ উেসর মধ্যে ব্যাংক বহির্ভূত উত্স, বিশেষ করে সঞ্চয়পত্র বিক্রি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধির সম্ভাবনায় ব্যাংক ব্যবস্থা হতে ঋণ গ্রহণ কিছুটা হ্রাস পাবে। প্রকৃতপক্ষে চলতি অর্থবছরে ১৫ হাজার কোট টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এপ্রিল পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ২৬ হাজার ৪৯২ কোটি টাকার কিছু বেশি।
