‘বাংলা’ নয়, পশ্চিমবঙ্গ

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০১৮, ২১:০৫

বছরখানেক আগে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সর্বসম্মতিক্রমে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। সেই প্রস্তাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় পশ্চিমবঙ্গের নাম বদলের। পশ্চিমবঙ্গের নাম হবে ‘বাংলা’। ভারতের সংবিধান অনুযায়ী কোনো রাজ্যের নাম বদল করতে হলে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে পাস করাতে হয়। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়ে রাষ্ট্রপতির অনুমতি নিতে হয়। মমতা এই নিয়ে একাধিকবার দিল্লিতে গিয়েছেন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে এক চিঠি দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে জানানো হয়েছে যে, পশ্চিমবঙ্গের প্রস্তাব গ্রহণ করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের নামের সঙ্গে মিল থাকায় পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ হিসেবে পরিবর্তন করার সিদ্ধান্তে রাজি হয়নি কেন্দ্র। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য তাঁর দল, মন্ত্রিসভার সদস্য সকলকে বলে দিয়েছেন যে সবক্ষেত্রেই বলতে হবে বাংলা। ইতোমধ্যে তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী তাঁর দলের সকলেই পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ বলেই উচ্চারণ করে আসছেন।

তিনি কলকাতার দমদম বিমানবন্দর থেকে বাইপাসের দিকে যে বৃহত্তর রাস্তাটি গিয়েছে তার নাম বদল করে রেখেছেন—বিশ্ববাংলা সরণি। এ ব্যাপারে কলকাতার একাধিক সাহিত্যিকের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তাদের অনেকেই এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে চাননি। মমতা ক্ষমতায় আসার পর কোলকাতার বহু রাস্তার নাম বদল করেছে। যেমন পার্কস্ট্রিটের নামকরণ করেছেন ‘মাদার টেরেসা সরণি’। যেমন জ্যোতিবাবুর সময় কলকাতার রেড রোডের নামকরণ করা হয়েছিল ‘ইন্দিরা গান্ধী সরণি’। পুরনো নাম বদল করে তা জনপ্রিয় করে তোলা সহজ কাজ নয়। বরকত গনি খান চৌধুরী যখন রেলমন্ত্রী ছিলেন তখন কলকাতার পাতালরেলের এলাকার নাম অনুযায়ী স্টেশনের নামকরণ ছিল, কিন্তু মমতা মুখ্যমন্ত্রী হয়ে সব স্টেশনের নাম বদলে দেন। টালিগঞ্জের নাম হয় মহানায়ক উত্তম কুমার স্টেশন। আর একটি স্টেশনের নাম করা হয়—কবি সুভাষ। এ ব্যাপারে রেল কর্তৃপক্ষ মমতা যেসব নাম বদল করেছেন আমরা সেইসব নামের সঙ্গে পুরনো নামগুলোও রেখে দিয়েছে, যাতে যাত্রীদের ওঠানামায় অসুবিধা না হয়।

সম্প্রতি রণবীর চক্রবর্তী নামে একজন গবেষক আনন্দবাজার পত্রিকায় এক প্রবন্ধে লিখেছেন বাঙালির ইতিহাস। তিনি প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গানটি উল্লেখ করেন—‘আমি বাংলার গান গাই...।’ বাংলা শব্দটির সঙ্গে একবার সপ্তমী বিভক্তি আর একবার ষষ্ঠী বিভক্তির হেরফের ঘটিয়ে বাংলা শব্দটি একবার একটি ভাষা আর একবার একটি ভূখণ্ডের অর্থবহ হয়ে যায়। এই শব্দটির মধ্য দিয়ে বাঙালি তার পরিচিতি খুঁজে পায়। যদিও মনে হয় বাংলা শব্দটি একটি সরল শব্দ, কিন্তু এই শব্দের প্রতিটি পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে ইতিহাস।

গবেষক আরও বলেছেন যে বাংলার প্রাচীনত্ব খ্রিষ্টিয় দশম-একাদশ শতকের মধ্যে। যদিও এই সময় বাংলা বলে কোনো এলাকা ছিল না। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের আগে এখনকার পশ্চিমবঙ্গ এবং সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র মিলিয়ে একটিই অঞ্চল ছিল। এই সমগ্র ভূখণ্ডটির আয়তন ছিল এখনকার ফ্রান্সের থেকে একটু বড়। মুঘলকালীন বাংলা সুবা থেকে বাংলা নামক প্রদেশটির উদ্ভব হয়। যদিও বাংলা শব্দটির উদ্ভব হয় ‘বঙ্গাল’ থেকে। ভাটির দেশ এই বঙ্গাল। প্রচুর বৃষ্টির কারণে বছরে অনেক সময় এই অঞ্চল জলমগ্ন থাকত, জল আটকাতে আলের ব্যবহার করা হয়। তাই বঙ্গ নামক জনপদের ‘আল’ নামক শব্দটি জুড়ে বঙ্গাল হয়।

সবশেষে বলা যায়, পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলা’ হচ্ছে না। মমতাকে আপাতত পশ্চিমবঙ্গ নামটি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।

n লেখক : ভারতীয় প্রবীণ সাংবাদিক