চট্টগ্রামে পুলিশ সুপারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যার মিশনে অংশ নেয়া খুনি ও তাদের সহযোগিরা কমপক্ষে তিনটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে মিতুর বাসার গেটের সামনে ও আশেপাশের এলাকায় অবস্থান নিয়েছিল। এক গ্রুপের কাজ ছিল মিতুর গতিবিধি লক্ষ্য রাখা। তারা মিতু বাসা থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খবর পাঠায় মূল কিলারদের কাছে। এরপর মূল কিলাররা মোটরসাইকেলে জিইসি মোড় থেকে মিতুর বাসার দিকে অগ্রসর হতে থাকে। তৃতীয় গ্রুপটি ছিল ব্যাকআপ ফোর্স হিসেবে। অর্থাত্ মূল কিলাররা বিপদে পড়লে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে তাদেরকে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করাই ছিল তৃতীয় গ্রুপটির কাজ। সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) দেবদাস ভট্টাচার্য এমনটাই বলছেন। সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, কিলিং মিশনে একটি কালো রঙের মাইক্রোবাসও অংশ নিয়ে থাকতে পারে। মাইক্রোবাসটি কিছু দূর পর্যন্ত মোটরসাইকেলকে অনুসরণ করেছিল। কিন্তু এরপর তারা আলাদা হয়ে যায়। তিনি আরো বলেন, উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠী প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, এমনটা ধরে নিয়েই পুলিশের তদন্ত চলছে। তবে স্বর্ণ চোরাচালান চক্র এবং ইয়াবা ব্যবসায়ীদেরও সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে।
এদিকে মিতু হত্যায় জড়িত সন্দেহে আবু নসর গুন্নু (৪৩) নামে এক সাবেক শিবির কর্মীকে গ্রেফতার করেছে চট্টগ্রাম মহানগর ডিবি পুলিশ। গতকাল বুধবার চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার পশ্চিম ফরহাদাবাদ মুসাবিয়া দরবার শরীফ এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তাকে ইতিমধ্যে এই মামলার আসামি করা হয়েছে। গুন্নুকে আজ বৃহস্পতিবার আদালতে সোপর্দ করে রিমান্ডের জন্য আবেদন করা হবে।
বহুল আলোচিত এই মামলার আসামি গ্রেফতারের বিষয়ে অবহিত করতে গতকাল সিএমপি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সিএমপি’র অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, গুন্নু এক সময় শিবিরের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিল। বিদেশেও ছিল বেশ কিছুদিন। কয়েক দফা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থান শেষে ৫-৬ বছর আগে আবার দেশে ফিরে আসে। দেশে ফিরে পুনরায় অপরাধ জগতে জড়িয়ে যায়। তবে দেশে আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে সে হাটহাজারী এলাকায় একটি মাজারের সাথে জড়িয়ে পড়ে। তবে তার আসল পরিচয় সে একজন সন্ত্রাসী। তিনি বলেন, তার সম্পর্কে কিছু তথ্য পেয়েছি। সেই তথ্যের ভিত্তিতে তাকে গ্রেফতার করেছি।
পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘উদ্ধারকৃত মোটরসাইকেলের সর্বশেষ মালিক শহীদুল্লাহকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সে জানিয়েছে, গত মাসের ৮ তারিখে সেই মোটরসাইকেলটি তার বাড়ি থেকে চুরি হয়ে গিয়েছে। কে বা কারা চুরি করেছে সে সম্পর্কে জানার জন্য তাকে ভালো করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মোটরসাইকেল চুরির বিষয়ে সে থানায় অভিযোগ করেছিল বলে আমাদের জানিয়েছে।’
মিতুর মোবাইলে স্কুল থেকে কোনো এসএমএস পাঠানো হয়নি দাবি করে দেবদাস ভট্টাচার্য বলেন, আমরা সংশ্লিষ্ট মোবাইল কোম্পানির কাছ থেকে মিতুর মোবাইলের কললিস্ট ও মেসেজের তালিকা নিয়েছি। সেখানে এ ধরনের কোনো মেসেজ ছিল না।
উল্লেখ্য, গত রবিবার ছেলেকে স্কুলের বাসে তুলে দিতে গিয়ে নগরীর জিইসি মোড় এলাকায় দুর্বৃত্তদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হন পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু।
গুন্নুর সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার জামায়াত-শিবিরের
এদিকে গ্রেফতারকৃত আবু নসর গুন্নুর সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেছে সংগঠন দু’টি। গতকাল বুধবার এক বিজ্ঞপ্তিতে মহানগর জামায়াতের আমির মাওলানা মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম এবং কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরার সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগরী সেক্রেটারি মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, কথিত আবু নসর গুন্নু একটি মাজারের খাদেম। তার সাথে জামায়াত-শিবিরের কোনো সম্পর্ক অতীতেও ছিল না এখনও নেই।
অপর এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম মহানগরী উত্তর সভাপতি সালাউদ্দিন মাহমুদ ও সেক্রেটারি নাজিব আহসান বলেন, আবু নসরের সাথে ছাত্রশিবিরের দূরতম সম্পর্ক অতীতেও ছিল না, বর্তমানেও নেই। তাছাড়া ছাত্রশিবিরের কোনো নেতা কর্মী মাজার কিংবা পীর পূজায় বিশ্বাস করে না বরং এক আল্লাহর প্রতি অটল বিশ্বাসী। নেতৃবৃন্দ বলেন, একজন সাহসী পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রীর হত্যাকাণ্ড নিয়ে রাজনীতি দুঃখজনক। এ থেকে প্রমাণিত হয়, কোনো ঘটনা ঘটলেই তার দায় জামায়াত-শিবিরের উপর চাপানোর যে প্রবণতা, তা থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এখনো বের হতে পারেনি।
