‘স্কুলে গেছি ক্লাস টু পর্যন্ত, গেলেও টু আর পাস করা হয়নি আমার। এহন আব্বর লগে নৌকায় থাকি। দিনে-রাইতে জোয়ারে-বাটায় কাটে মেঘনা নদীতে জাল বেয়ে। লেহা-পড়ার ইচ্ছা থাকলেও আব্বয় খালি মাছ ধরার কথাই কয়।’ স্কুলে যাওয়ার ইচ্ছার কথা এভাবেই প্রকাশ করে রায়পুর উপজেলার চরকাছিয়া গ্রামের পানিরঘাট এলাকার শিশু জেলে আরিফ হোসেন (৮)।
উপজেলার চরাঞ্চলের ছোট শিশুরা হাতে বই, খাতা, কলম না ধরে বাবা-চাচার সাথে ধরছে জালের রশি, না হয় নৌকার বৈঠা। মেঘনার উত্তাল ঢেউয়ের বুকে হারিয়ে যাচ্ছে উপকূলীয় শিশুদের অনাবিল ভবিষ্যত্। সরকার শিশু শিক্ষায় নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও তার ছোঁয়া লাগেনি রায়পুর উপজেলার জেলে পল্লীতে। এতে উপকূলীয় মেঘনা নদী এলাকায় ক্রমান্বয়ে বাড়ছে শিশু জেলে।
গত শনিবার রায়পুর উপজেলার চরকাছিয়া ও চরজালিয়া নদীর পাড়ে গিয়ে শিশু জেলেদের সাথে কথা বললে জানা গেছে—লেখাপড়া করার ইচ্ছা থাকলেও অর্থের অভাবের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। তাই শুধু তারা জেলে পরিবারের ছেলে-মেয়েরা স্কুলে না গিয়ে কোনো না কোনো কাজে লেগে যায়।
জেলার মেঘনা নদী তীরবর্তী চরাঞ্চলের এক শিশু জেলের বাবা ছোবহান মিয়াসহ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললে জানা গেছে—তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ইচ্ছার কমতি নেই। নদীতে মাছ নেই, সারা দিন জাল বেয়ে ৫০০ টাকাও ভাগে পড়ে না। সংসার চলা তো দূরের কথা সপ্তাহে তিনটি কিস্তি বারোশ থেকে তেরশ টাকা। তাই নৌকার অংশীদার না নিয়ে সন্তানদের সাথে নিয়ে জেতে হচ্ছে।
রায়পুর উপজেলা চেয়ারম্যান মাস্টার আলতাফ হোসেন হাওলাদার বলেন, ‘প্রতিবছর জাটকা সংরক্ষণ অভিযান চলাকালে সরকার জেলেদের মধ্যে চাল ও বিভিন্ন উপকরণ বিতরণ করে থাকে। কিন্তু তার পরিমাণ কম হওয়ায় জেলেদের জীবন-জীবিকা চলাচল কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। অচিরেই শিশুশ্রম বন্ধে নদী এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে অভিভাবকদের নিয়ে অবহিতকরণ সভা করা হবে।
রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন আলম বলেন, ‘চরাঞ্চলের শিশুরা যাতে শিশুশ্রম থেকে বেরিয়ে এসে স্কুলমুখী হতে পারে এবং সমাজে স্বাভাবিক গতিতে ফিরে আসতে পারে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগসহ বিভিন্ন সংস্থাকে নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছি। এরই মধ্যে অনেক চরাঞ্চলে নিয়মিত স্কুলে গিয়ে শিক্ষার জন্য স্থানীয়দের নিয়ে সভা ও আলোচনা করা হয়েছে।
