লে. কর্নেল সৈয়দ মো. রফিকুল ইসলাম
প্রতিদিনের খবরের হেডলাইন সড়ক দুর্ঘটনায় মর্মান্তিক মৃত্যু। সড়ক-মহাসড়কগুলো যেন মৃত্যুর ফাঁদ। প্রতিটি যাত্রাই যেন এক আতঙ্ক। যে ব্যক্তি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে যে সুস্থভাবে ঘরে ফিরবে তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৈশ্বিক সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২৫ হাজার লোক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়। আহত হওয়া বা আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণকারীর সংখ্যা অগণিত এবং যানবাহন ও মালামালের ক্ষতির পরিমাণ অপরিমেয়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাব মতে, সারাদেশে মোট যানবাহনের সংখ্যা ৩৮ লাখ এবং লাইসেন্সধারী চালকের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। সে হিসাবে প্রায় ১৮ লাখ যানবাহন ভুয়া চালক দিয়ে চলছে। ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ। সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তর (সওজ) এর তথ্য মতে, মহাসড়কে সাইনবোর্ড ও সংকেত চিহ্ন নির্দেশক বোর্ড নেই প্রায় ৬২% রাস্তায়। জাতীয় মহাসড়কে অন্তত ১৫৪ কিলোমিটার রাস্তা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই) মনে করে, ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনার পেছনে অতিরিক্ত গতি ও চালকের বেপরোয়া মনোভাবই দায়ী।
পরিবহন খাতে এখন বড় চ্যালেঞ্জ, দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করে প্রাণহানি কমানো। সড়ক-মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার কমানোর জন্য সরকার নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সড়ক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা, মালিক, চালক সকলে সম্মিলিতভাবে কাজ করলে এবং তাদের নিজ নিজ করণীয় সঠিকভাবে পালন করলে নিশ্চিতভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দুর্ঘটনার হার কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এ জন্যে সুনির্দিষ্ট কিছু করণীয় তুলে ধরা হলো।
যেসব রাস্তায় ধারণক্ষমতার অধিক যানবাহন চলাচল করে তা প্রশস্ত করতে হবে। সড়ক ও মহাসড়কে পর্যাপ্ত সাইনবোর্ড স্থাপন করতে হবে। বিপজ্জনক বাঁক/দুর্ঘটনাপ্রবণ বাঁকগুলো চিহ্নিত করে প্রতিটি বাঁকে প্রয়োজনীয় দূরত্বের ডিভাইডার স্থাপন করতে হবে। রাস্তায় গতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (স্পিড বাম্প/হাম্প/কুশন স্থাপন) রাখতে হবে। গাড়িতে স্পিড লিমিটিং ডিভাইজ স্থাপন করতে হবে। প্রতি ৪০/৫০ কিলোমিটার পরপর টোল ঘরের ন্যায় পুলিশ নিয়ন্ত্রণ বক্স অথবা চালকদের বিশ্রামাগার নির্মাণ করা এবং সেখানে চালকদের বাধ্যতামূলক বিশ্রাম বা কিছু সময় বিরতির সুযোগ রাখা। প্রতি ২৫ কিঃমিঃ পরপর প্রয়োজনীয় স্থানে ছোট আকারের স্পিড ব্রেকার নির্মাণ করা (একত্রে একাধিক ছোট ছোট বিট থাকবে)। প্রতি ১০ কিঃমিঃ পরপর সতর্কীকরণ ফ্লাসড্ বেকন লাইট স্থাপন করা (রাতের জন্য)। প্রতি ২ কিলোমিটার পর রাস্তায় মাইলফলকে রিফ্লেক্টিং পেইন্ট লাগানো। প্রতিটি বাজারের সামনে রাস্তার পাশে লোহার রেলিং দেওয়া, নিচু স্পিড ব্রেকার নির্মাণ এবং পর্যাপ্ত সাইনপোস্ট স্থাপন করা। রাস্তা পারাপারের জন্য প্রয়োজনীয় স্থানে জেব্রা ক্রসিং তৈরি করা। প্রতিটি পার্শ্ব রাস্তা এবং প্রধান সড়কের সংযোগ স্থলের পূর্বে সতর্ক সাইনপোস্ট স্থাপন করা। জেলাভিত্তিক মনিটরিং সেল গঠন করা এবং নিয়মিত সভা করা। স্পিড ব্রেকার, মাইলস্টোন, জেব্রা ক্রসিং এবং সকল সাইনপোস্ট রিফ্লেক্টিং পেইন্ট দিয়ে লেখা। ধীরগতি সম্পন্ন যানবাহনের (নছিমন, করিমন, ভটভটি, হিউম্যান হলার, সাইকেল, রিকশা, ভ্যান, সিএনজি, অটোরিকশা ইত্যাদি) জন্য আলাদা লেন তৈরি করা এবং ডিভাইডার নির্মাণ করা। বিআরটিসি ও বিআরটিএ কর্তৃক সঠিক ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং ভুয়া লাইসেন্স বন্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা। গাড়ির ফিটনেস যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দেওয়া। স্পিড লিমিটিং ডিভাইজ সংযোজন ব্যতীত ফিটনেস সনদপত্র না দেওয়া। গাড়ির মালিকের নিকট হতে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতির জন্য নিরাপত্তা জামানত রাখা।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর করণীয় : চালকদের ট্রাফিক আইন মানতে বাধ্য করা। স্থায়ী পুলিশ চেকপোস্ট তৈরি করে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ ও চালকের বাধ্যতামূলক বিরতি নেওয়া নিশ্চিত করা। ট্রাফিক ডিউটি সঠিকভাবে পালন করা ও আইন অমান্যকারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। হাইওয়ে পুলিশের টহল কার্যক্রমকে গতিশীল করা। দুর্ঘটনায় পতিত যানবাহনের উদ্ধার কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা। মোটর সাইকেলকে বিপজ্জনক বাহন হিসেবে ঘোষণা করে তাদের অগ্রাধিকার প্রদান করা এবং রাস্তায় রাস্তায় এ বিষয়ে সতর্কতা সাইন পোস্ট স্থাপন করা। মহাসড়কে স্পিড রাডার গান ব্যবহার করা এবং ওভার স্পিড গাড়ির চালকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
গাড়ির মালিকদের করণীয় : চালকদের বিরতিহীনভাবে গাড়ি চালাতে না দেওয়া, তাদের বিশ্রাম নিশ্চিত করা। ভুয়া লাইসেন্সধারীকে গাড়ি চালাতে না দেওয়া।
গাড়ির চালকদের করণীয় : যাত্রার পূর্বে গাড়ি চলাচলের উপযোগী কিনা তা পরীক্ষা করা। নির্ধারিত গতিসীমার মধ্যে গাড়ি চালানো; মনে রাখতে হবে, অধিক গতি দুর্ঘটনার মূল কারণ। রাস্তায় চলাচলরত ধীরগতিসম্পন্ন যানবাহন ও পথচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া।
সরকার ইতোমধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দূরপাল্লার যানবাহনের জন্য বিকল্প চালক রাখা এবং একজন চালককে ৫ ঘন্টার বেশি গাড়ি চালাতে না দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে। নির্দিষ্ট দূরত্বে সার্ভিস সেন্টার ও চালকদের জন্য বিশ্রামাগার তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। গাড়ি চালক ও সহকারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। সিগন্যাল মেনে পথচারী পারাপারে জেব্রাক্রসিং ব্যবহার করা এবং অবৈধভাবে রাস্তা পারাপার বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-রংপুর ও ঢাকা-খুলনা এই চার মহাসড়কে চারটি বিশ্রামাগার নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। পাঁচ হাজার ৫শ কিঃমিঃ জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে যথাযথ সাইন-সংকেত বসাতে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। মহাসড়কে যানবাহনের সর্বোচ্চ গতিসীমা ৮০ কিঃমিঃ নির্ধারণ করা হয়েছে। মহাসড়কে সিএনজি, অটোরিকশা, হিউম্যান হলার, নছিমন, করিমন ও ভটভটি চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে— যদিও তা নানাবিধ কারণে কার্যকর করা সম্ভবপর হয়নি। সরকার এক লাখ চালক তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে এবং এর মধ্যে বিআরটিসি’র মাধ্যমে ৩৬ হাজার চালক তৈরি করা হবে।
আশা করা যায় যে, সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ এবং সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, এনজিও, মালিক, চালক, যাত্রী পথচারী সকলে সচেতন ও দায়িত্বশীল হলে এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ হলে সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনার হার ক্রমান্বয়ে কমে আসবে।
n লেখক: সেনা ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ লাইসেন্স প্রদানকারী ইউনিটের কর্মকর্তা
