মো. ইমরান হোসাইন
২০০ ফুট প্রস্থের বাসিয়া নদীটি চারটি উপজেলায় ৪২ কিলোমিটার জনপদ দিয়ে বয়ে যাওয়া এক সময়ের খরস্রোতা নদী ছিল। অনেক ইতিহাস ঐতিহ্য রয়েছে এই বাসিয়া নদীতে। এই নদীটি সুরমা নদী থেকে উত্পত্তি হয়ে দক্ষিণ সুরমা উপজেলা, বিশ্বনাথ উপজেলা, উসমানী নগর উপজেলা, জগন্নাথপুর উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কুশিয়ারা নদীতে মিলিত হয়েছে। এই নদীর সঙ্গে অসংখ্য খাল-বিল, হাওর ও ছোট-বড় নদীর সংযোগ রয়েছে।
৯০ দশকে আমরা দেখেছি এই নদীতে লঞ্চ, ইঞ্জিনের নৌকা, পালতোলা নৌকা, বালু-পাথরের নৌকা সারি সারি চলতো। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) তথ্য মতে- প্রায় ১,৩৬,০০০ হাজার মানুষের যাতায়াতের মূলপথ ছিলো এই বাসিয়া নদীর জলপথ। এবং এই নদী থেকে অনেক সুবিধা ভোগ করে থাকেন। যেমন- জেলেরা মাছ ধরে জীবিকানির্বাহ করে, অনেক সৌখিনও মাছ ধরছেন, হাওর, খাল, বিল, নালাতে মাছ এসে পরিপূর্ণ থাকতো। কৃষকরা হাল চাষ করে, বিভিন্ন জাতের সবজি চাষ করে জীবিকানির্বাহ করতেন, অতিরিক্ত ফলন বাহিরে বিক্রি করে পরিবারে সচ্ছলতা আনতো।
দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, আজ এই বাসিয়া নদীটি তার নাব্যতা হারিয়ে মরা খাল বা ড্রেইনে পরিণত হয়েছে। পূর্বের কোনো কিছু নেই, তার আগের যৌবন নেই। সে আজ মানবজাতির কাছে অসহায়।
এখানে প্রশ্ন আসতে পারে- কেন নাব্য হারিয়ে মরা খাল বা ড্রেইনে পরিণত হলো?
উত্তরটা এভাবে দিতে হয়- নদীর তীরে গঞ্জ, মানব সভ্যতার ইতিহাস গড়ে উঠেছে। কিন্তু, এই বাসিয়া নদীর তীরে গড়ে উঠা গঞ্জ বা বাজারের অধিকাংশ অবৈধ দখল করে কল কারখানা, হোটেল, কেমিক্যাল জাতীয় কারখানার অট্টালিকা তৈরি করেছে। প্রভাবশালী মহল দল-মত নির্বিশেষে নদীর দুই তীর অবৈধ দখল করে পাঁচ/ছয়তলা ভবন তৈরি করে স্থায়ীভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করছে।
এই বাসিয়া নদীর তীরে গড়ে উঠেছে—মাসুদগঞ্জ বাজার, কামালবাজার, মুনশীবাজার, লালাবাজার, বিশ্বনাথ, কালিগঞ্জবাজার, গুদামঘাট, কোনারাইবাজার, রানীগঞ্জ, জামালপুরবাজার, প্রতিটি হাট-বাজারের ময়লা-আবর্জনা ফেলে নদীটিকে ড্রেইন হিসেবে ব্যবহার করছে এবং পরিবেশ দূষিত করছে কুচক্র মহল। ফলে বৃহত্তর এই নদীটি গভীরতাহীন হয়ে এখন মাত্র ৬০ থেকে ১০০ ফুটে দাঁড়িয়েছে। সরকারি তালিকা মতে ৫০০ মিটারের মধ্যে ১৬০টি, তিন কিলোমিটারে মোট ১৮৬টি অবৈধ স্থাপনা দৃশ্যমান আছে। আমাদের হিসেব মতে ৪২ কিলোমিটারের মধ্যে ৫০০টি অবৈধ স্থাপনা দৃশ্যমান আছে। বিশ্বনাথ উপজেলা প্রশাসন এই বিশ্বনাথ বাজারের ১৮৬ জন অবৈধ দখলদার চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ মামলা করেন।
অন্যদিকে সুরমা নদী থেকে উত্পত্তি বাসিয়া নদীর মুখ ও শেষে কুশিয়ারা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে যাওয়া বাসিয়া নদীর মুখ পলি মাটিতে ভরাট হয়ে গেছে। ফলে অনেকে ঐ দুই মুখে অবৈধ স্থায়ীভাবে ঘর-বাড়ি নির্মাণ করে ফেলেছে। যার কারণে নদীর স্রোত হারিয়ে গেছে। অন্যদিকে পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে নদীর মধ্যভাগে পলি মাটি জমে নদীর তীর ও তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে।
গত ২০১৩-১৪-১৫ অর্থ বছরে ৭.৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৮ কিলোমিটার খনন কাজ করেন সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু এখানে ১৮ কিলোমিটারের শেষমাথায় বিশ্বনাথ বাজারের অবৈধ স্থাপনা থাকায় খনন কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি। ২০১৬ অর্থ বছরে আবার জলবায়ু পরিবর্তন ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে দুই কোটি টাকা বরাদ্দে সাত কিলোমিটার খনন কাজ আসে। ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড আবার বিশ্বনাথ বাজার বাদ দিয়ে খনন কাজ শুরু করলে ছয় কিলোমিটার খনন কাজ করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু ঐ বিশ্বনাথ বাজারের অবৈধ স্থাপনা থাকার কারণে এক কিলোমিটার খনন কাজ সমাপ্ত করা সম্ভব হয়নি। এখানে বিশ্বনাথ বাজার থেকে পূর্বে ১৮ কিলোমিটার অসম্পূর্ণ খনন কাজ হয় এবং বিশ্বনাথ বাজারের পশ্চিমে ছয় কিলোমিটার খনন কাজ করা হয়। মধ্যভাগে খনন কাজ অসম্পূর্ণ এক কিলোমিটার ময়লা-আবর্জনা ও অবৈধ দখল করে রাখার কারণে নদী খনন কাজ করা সম্ভব হয়নি। এই এক কিলোমিটার খনন না করা হলে জনগণ কোনো সুফল ভোগ করতে পারবে না।
এই নদীর সঙ্গে অনেক ছোট-বড় নদী, হাওর, বিল, খাল সংযোগ রয়েছে। এই বাসিয়া নদীটি রক্ষা না করায়- বর্ষা মৌসুমে পানি বন্দি হয়ে যাই। এবং শীত মৌসুমে পানির অভাবে কৃষি জমি মরুভূমিতে পরিণত হয়।
আমাদের নদী রক্ষা আন্দোলনে সবাইকে এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করি। আমাদের সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বাসিয়া নদী রক্ষার দিকে নজর দিতে অনুরোধ করছি। তা না হলে বাসিয়া একদিন কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
