অবশেষে নয়াদিল্লির আলোচিত শিশু অভিরুপ সনুকে ভারতীয় দূতাবাসের জিম্মায় দেয়া হয়েছে। বরগুনার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. আবু তাহেরের আদালত মঙ্গলবার সনুকে ভারতীয় দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি (কনস্যুলার) রমা কান্ত গুপ্তের হেফাজতে দিয়েছেন। তিনি সনুকে ঢাকায় নিয়ে গেছেন। সেখান থেকে সনুকে নয়াদিল্লিতে তার মা-বাবার কাছে ফিরিয়ে দেয়া হবে।
২০১০ সালে ভারতের নয়াদিল্লি থেকে বরগুনার বেতাগী উপজেলার গেরামর্দন গ্রামের একটি চক্র সনুকে ফুঁসলিয়ে নিয়ে আসে। দীর্ঘ ৪ বছর চেষ্টার পর বরগুনার জামাল ইবনে মুসা নামে এক ব্যক্তি ওই চক্রের হাত থেকে সনুকে উদ্ধার করেন। এর ৫ মাস পর জামাল ইবনে মুসাই নয়াদিল্লিতে সনুর মা-বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ সনুকে মা-বাবার কাছে ফিরিয়ে দিতে টুইট করেন। ২৪ মে সুষমা টুইট বার্তায় বলেন, ‘আমরা সনুর মা-বাবার সাথে ডিএনএ পরীক্ষা করব। পরীক্ষার রিপোর্ট পজেটিভ হলে আমরা সনুকে ভারতে ফিরিয়ে আনব।’
সুষমার এই টুইটের ১৬ দিনের মাথায় ৯ জুন দিল্লি থেকে চিকিৎসকেরা এসে সনুর রক্তসহ বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করেন। এরপর সেগুলো নিয়ে তার মা-বাবার রক্তের সাথে পরীক্ষা করেন। পরীক্ষার রিপোর্ট পজেটিভ হওয়ায় ভারতীয় দূতাবাসের কর্মকর্তারা সোমবার সনুকে ফিরে পেতে বরগুনার আদালতে আবেদন করেন। ওই আদালতে সনুর সঙ্গে তার মা-বাবার ডিএনএ প্রতিবেদন জমা দেন ভারতীয় দূতাবাসের আইনজীবী সঞ্জীব কুমার দাস। সনুকে ফিরে পাবার আবেদন এবং ডিএনএ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এক লাখ টাকার জামানতে সনুকে ভারতীয় দূতাবাসের কর্মকর্তা রমা কান্ত গুপ্তের জিম্মায় দেয়ার আদেশ দেন। একইসাথে আদালত সনুর অপহরণ সংক্রান্ত একটি মামলা চলমান থাকায় প্রয়োজন অনুসারে সনুকে আদালতে হাজির হবার আদেশ দেন। তবে জামানত দিয়ে সনুকে জিম্মায় নিতে দূতাবাস অস্বীকৃতি জানায়।
ভারতীয় দূতাবাসের আইনজীবী সঞ্জীব কুমার দাস মোবাইলে ইত্তেফাককে জানান, মঙ্গলবার পুনরায় বরগুনার ওই আদালতে আবেদন করা হয়। আবেদনে বাংলাদেশ-ভারত হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে পাচারকারীদের কবলে পড়া একটি শিশুকে মা-বাবার কাছে ফিরিয়ে দিতে আর্থিক বিষয় থেকে অব্যাহতি দিয়ে মানবিক কারণে বিবেচনার কথা বলা হয়। আদালত আবেদন আমলে নিয়ে শুনানির পর এক লাখ টাকার জামানতের বিষয়টি বাদ দিয়ে ‘আদালতের প্রয়োজনে সনুকে হাজির হবার শর্তে’ ভারতীয় দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি (কনস্যুলার) রমা কান্ত গুপ্তের জিম্মায় সনুকে দেন।
উল্লেখ্য, বরগুনার পাচারকারী চক্রের হাত থেকে সনুকে উদ্ধারকারী জামাল ইবনে মুসা চক্রটির বিরুদ্ধে মানবপাচার মামলা করেছেন। মামলায় শুনানির পর আদালতের নির্দেশে গত বছরের ২২ ডিসেম্বর থেকে সনু যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে রয়েছে। সেখান থেকে সনুকে বরগুনার আদালতে হাজির করা হয়।
প্রসঙ্গত, বলিউডের সাড়া জাগানো ‘বাজরাঙ্গি ভাইজান’ চলচ্চিত্রের সাথে সনু-জামালের কাহিনীর মিল রয়েছে বলে জামাল ভারতীয় মিডিয়ায় ‘বাংলাদেশি বাজরেঙ্গি ভাইজান’ নামে পরিচিতি পান। এই শিরোনামে ৪ জুন ইত্তেফাকের ভিন্ন চোখের প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ছাপা হয়। ৯ জুন সনুর ডিএনএ পরীক্ষা সংক্রান্ত পৃথক একটি রিপোর্টও ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়।
বাংলাদেশি বাজরেঙ্গি ভাইজানের প্রতিক্রিয়া : সনুকে পাচারকারীদের কবল থেকে উদ্ধার, নয়াদিল্লির অচেনা শহরে নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে সনুর মা-বাবাকে খুঁজে বের করার দূরুহ কাজটি করা বরগুনার অতি সাধারণ মানুষ জামাল ইবনে মুসা আদালতের আদেশে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। মোবাইলে ইত্তেফাককে তিনি বলেন, ‘মনের দিক থেকে আমি আজ অনেক শান্তি পেলাম। সঠিক জায়গায় আমি সনুকে পৌঁছে দিতে পেরেছি।
