মিতুর বাবা বললেন

হত্যাকারী যেই হোক আমি বিচার চাই

আপডেট : ২৯ জুন ২০১৬, ২৩:৪৮
আমি মেয়ে হারিয়েছি। তার দুই সন্তান আজ এতিম। কারণ তাদের বাবাকে আজ হারাচ্ছে। আমি অবশ্যই আমার মেয়ের হত্যার বিচার চাই। এই খুনের সঙ্গে কারা জড়িত সেটি জাতির কাছে উন্মোচন করা হোক। গতকাল খিলগাঁওয়ের ভূঁইয়াপাড়ায় এসপি বাবুল আক্তারের শ্বশুর পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন এসব      কথা বলেন। মেয়ে খুন হওয়ার পর থেকে জামাতা বাবুল আক্তার ও তার দুই সন্তান আখতার মাহমুদ মাহির ও তাবাসুম তাসনিম টাপুর খিলগাঁওয়ের এই বাসায় থাকছেন। দুই তলা বাড়ির দোতালার একটি কক্ষে এখন বাবুল আক্তার দিন অতিক্রম করছেন। গত শনিবার বিকালে ডিবি কার্যালয় থেকে ফেরার পর বাবুল আক্তার গণমাধ্যমের কাছে এখন পর্যন্ত তার স্ত্রী খুনের বিষয়ে কোন বক্তব্য দেননি। তবে তার শ্বশুর মোশাররফ হোসেন গণমাধ্যমের কাছে এ বিষয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন।
 
গতকাল ঐ বাসায় বাবুল আক্তার কোথায় আছেন এবং কেমন আছেন-এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মোশাররফ হোসেন বলেন, এই বাড়ির দোতালায় সে নিরিবিলি অবস্থান করছে। তার মাইগ্রেনের ব্যাথা আরো বেড়েছে। মানসিকভাবে একেবারে বিপর্যস্ত। দুই সন্তানের মানসিক অবস্থা খুব করুন অবস্থায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ঘটনার পর পুলিশের কেউ তার কাছে একটি বারের জন্য খোঁজ নিতে আসল না। দুই সন্তান তাদের মাকে হারিয়েছে। নিষ্পাপ এই শিশু দুইটির দিকে একবারও পুলিশের বুক কাঁদে না। তারা তাদের মাকে হারিয়েছে। গত সোমবার দ্বিতীয় সন্তান তাবাসুম তাসনিম টাপুরের জন্মদিন গেছে। কত ধুমধামে বাবা-মা তার জন্মদিন পালন করে। হায় আজ বাচ্চাটির মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না।
 
এসময় টাপুর একবার তার নানার কোলে এসে বলে,‘নানু ভাই চাচার বাড়িতে যাব।’ অগত্যা মোশাররফ হোসেন বাড়ির একজনকে দিয়ে বাইরে নিয়ে যেতে পাঠিয়ে দেন।
 
হতাশার কথা ব্যক্ত করে মোশাররফ হোসেন বলেন, মঙ্গলবার সকালে বাবুল আক্তার ও তার দুই সন্তানকে নিয়ে ল্যাব এইড হাসপাতালে গিয়েছিলেন একজন মানসিক চিকিত্সকের কাছে। হাসপাতাল থেকে ফিরে বাবুল আক্তার বাড়ির দোতালার একটি কক্ষে অবস্থান করছে।
 
স্ত্রীর সঙ্গে চট্টগ্রামের একজন হিন্দু ব্যবসায়ীর পরকীয়া সম্পর্কের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘ আমার মেয়েটির কখনও ধন-সম্পদের প্রতি লোভ ছিল না। স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে সে সুখেই ছিল। আর এ ধরনের সম্পর্ক হলে তো বাবুলের পক্ষ থেকে অভিযোগও আসত। কিন্তু এরকম কোন সম্পর্ক ছিল না বলে মন্তব্য করে বলেন, ‘ শ্বশুর বাড়ির প্রতি বাবুলের কোন লোভ ছিল না। ঢাকায় এলে বেশিরভাগ সময় সে অফিসার্স মেসে থাকত। পদোন্নতি পেয়ে পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত হওয়ার খবর পেয়ে তিনি নিজেই জামাইকে বলেছিলেন, ‘এবারের মত রমজানে অন্তত তাদের বাসায় থাকতে। দুই-তিন দিনের মধ্যে মেয়ে ও দুই নাতিকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আনারও কথা ছিল।’
 
মিতু হত্যায় বাবুল আক্তারের দুই সোর্সকে গ্রেফতার করে আদালতে দেয়া জবানবন্দির প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘ধরেই নিলাম বাবুল আক্তার তার স্ত্রীকে খুন করেছে। কিন্তু তাই বলে সোর্স দিয়ে হত্যার করতে হবে কেন? বাবুল আক্তার তো অনেক হত্যার ঘটনা তদন্ত করে সাকসেসফুল হয়েছে। তাহলে সোর্স দিয়ে হত্যা করলে তো শেষে সে ধরা পড়ে যাবে। এ ধরনের কাঁচা কাজ কি বাবুল আক্তারের মত একজন দক্ষ পুলিশ অফিসারের পক্ষে সম্ভব?
 
তিনি আরো বলেন, আমরা চাই এ ঘটনার প্রকৃত রহস্য বের হোক। আমাদের পুলিশের প্রতি কোন অভিযোগ নেই। অবশ্যই পুলিশের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। কারণ আমিও তো ৩০/৩৫ বছর পুলিশে চাকরি করেছি। পুলিশ অবশ্যই এর প্রকৃত হত্যাকারীকে খুঁজে বের করবে।
 
হত্যার ২০ দিন পর হঠাত্ করে বাবুল আক্তারকে এ খুনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা করার অভিযোগের বিষয়টির সঙ্গে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আছে কী না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আগে তো হত্যাকারী কারা সেটা বের হোক। বাবুল অনেক সুনামের সঙ্গে পুলিশ বিভাগে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। সে বর্তমান সরকারের জন্য অনেক ত্যাগ করেছে। নিজের সংসার ফেলে রেখে সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার ও জঙ্গি দমনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। এতে একটি গ্রুপের ঈর্ষার শিকার হতে পারেন বলে তিনি ধারনা করছেন।
 
বাবুল আক্তার কেন গণমাধ্যমের কাছে মুখ খুলছেন না-এ ব্যাপারে মোশাররফ হোসেন বলেন, ডিবি অফিস থেকে ফেরার পর তার মানসিক অবস্থা ভালো না। একজন এসপি হয়ে পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া সে গণমাধ্যমের কাছে কোন মন্তব্য করতে পারবে না। পুলিশের ওপর তার আস্থা আছে। সময় হলে সব কিছুই জানা যাবে।
 
চট্টগ্রামে জেএমবির বিরুদ্ধে অপারেশন চলাকালে একটি বিশেষ বাহিনীর পোশাক উদ্ধার নিয়ে ঐ সময় বাবুল আখতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই।
 
চাকরিতে ইস্তফা দেয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত খবর প্রকাশ হওয়ার পর আমি বাবুলকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। সে বলেছে, পুলিশের কর্তৃপক্ষই জানে আসলে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ব্যাপারে সে কোন কিছুই জানে না।
 
শনিবার বিকালে এক দফা ঐ বাড়িতে পুলিশী নিরাপত্তা দেয়া হলেও পরদিন থেকে পুলিশ আর ঐ বাড়িতে যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে তাদেরও কোনও চাহিদা নেই যে তাদের বাড়িতে নিরাপত্তা দিতে হবে। তবে তাদের একটি পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, বাবুল আক্তারকে পুলিশের একটি গ্রুপ মানসিকভাবে চাপ দিচ্ছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের একটি শক্তিশালী গ্রুপ তার বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লেগেছে। বাবুল পুলিশ বিভাগে আগের মতো কাজ করতে চায় মন্তব্য করে মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘ এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তিনি দেখা করতে চান।’