জাপানে বাংলাদেশি প্রবাসীদের এড়িয়ে চলছেন জাপানিরা

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০১৬, ১৮:৪৮
 
সম্প্রতি ঢাকার গুলশানে জঙ্গি হামলায় নিহত ২৮ জনের মধ্যে ৭ জন জাপানি নাগরিক নিশ্চিত হবার পর থেকেই বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে দিন পার করছেন জাপান প্রবাসী বাংলাদেশিরা। বিশেষ করে রেস্তোরা, অফিস-আদালতসহ সবখানেই আলোচনার বিষয় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। আর যে সব প্রতিষ্ঠানে জাপানিজদের সঙ্গে বাংলাদেশি প্রবাসীরা কাজ করছেন সেখানেই জাপানি নাগরিকরা বাংলাদেশিদের এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছেন।
 
বিশেষ করে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজে অ্যাবে'র কড়া বক্তব্যের পর থেকেই বাংলাদেশিদের প্রতি জাপানিজদের ভীতি জন্মাতে শুরু করে।
 
জাপানের রাজধানী টোকিও'র একটি রেস্টুরেন্টে কাজ করেন বাংলাদেশি নাগরিক শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, রংপুরে যখন জাপানিজ নাগরিককে হত্যা করা হলো তার জন্য যে প্রভাব প্রবাসী বাংলাদেশিদের উপর পড়েছে তা অতি সামান্যই। তবে এই ঘটনায় চিত্রটা সম্পূর্ণই অন্যরকম।
 
তিনি বলেন, রেস্টুরেন্টে আমিই একমাত্র বাংলাদেশি। এখানে কাজ করেন তার বেশিরভাগই জাপানিজ। তবে অন্যান্য দেশেরও কয়েকজন আছে। আগে আমার কাজের দক্ষতা দেখে রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার প্রায়ই আমার প্রশংসা করতো। কিন্তু এখন এ ঘটনার পর তিনি বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের মানুষ সম্পর্কে বিভিন্ন নোংরা নোংরা মন্তব্য করছেন।
 
তার দেখাদেখি রেস্টুরেন্টের প্রায় সবাই তাকে এড়িয়ে চলছেন বলেও জানান তিনি।
 
গত শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কের লেকভিউ ক্লিনিক সংলগ্ন হলি আর্টিসান বেকারিতে ছয় সদস্যের জঙ্গি দল হামলার চালায়। হামলার পর প্রথমদিকে জাপানিজ প্রধানমন্ত্রী শিনজে অ্যাবে সমবেদনা এবং সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিলেও ৭ জাপানিজ নাগরিকের মৃত্যু নিশ্চিতের পর দৃশ্যপট সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। এ ঘটনা নিয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী ভীষণ ক্ষুব্ধ হন। শিনজে অ্যাবে বলেন, ঢাকায় এই সন্ত্রাসী হামলা অগ্রহণযোগ্য এবং এটা ‘আমায় ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ করেছে’।
 
জাপানে দীর্ঘদিন বসবাস করেন এমন একজন হলেন পিয়াস মাহমুদ। তিনি বলেন, সম্প্রতি জাপানের আদালত মুসলমানদের ওপর পুলিশি নজরদারী বাড়াতে নির্দেশ দিয়েছেন। এর পর থেকেই আমরা অনেকটাই শঙ্কার মধ্যে দিন পার করছি। এ ঘটনা আমাদেরকে বিশেষ করে বাংলাদেশিদেরকে আরো বিপদের মধ্যে ঠেলে দিবে।
 
টোকিওর একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়েন বাংলাদেশি ছাত্র ফিরোজ আলম। তিনি বলেন, এ ঘটনার পর থেকে ক্লাসে গেলে শিক্ষকরা বাংলাদেশ নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করে। যার প্রায় প্রত্যেকটিই নেতিবাচক। যা আমার জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর।
 
জাপানে দীর্ঘদিন ধরে গাড়ির ব্যবসা করছেন মনির হোসেন। জাপান এবং জাপানের বাইরে তার ব্যবসা রয়েছে। তিনি বলেন, এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আমাদের ব্যবসা চাপের মধ্যে পড়ে যাবে। বিশেষ করে জাপানে যেসব ক্রেতা আছে তারা আমাদের কাছ থেকে গাড়ি নিতে চাইবে না সহজেই। তিনি এই ঘটনাকে জাপানে অবস্থানরত প্রবাসীদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ বলেও জানান।
 
সাইতামা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি ছাত্র ইমতিয়াজ বলেন, বিদেশিদের কাছে আমাদের যে সংগ্রামী অর্জন তা এমন ঘটনার মধ্য দিয়ে ধুসর হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আমার অনেক জাপানিজ বন্ধুই এ ঘটনা জানতে চেয়েছে। তারা অনেকে বলতে শুরু করেছে, বাংলাদেশিরা কি অনেক ধর্মান্ধ? আই এস কি? এমন অনেক প্রশ্ন।
 
এ ঘটনার পর বাংলাদেশিদের সঙ্গে জাপানিজদের আচরণেও পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
 
বাংলাদেশে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড নিয়ে জাপানের নাগরিক মামিকে ঐশী বলেন, আমরা শান্তিপ্রিয় জাতি। অথচ গত ১ বছরে বাংলাদেশে অনেক জাপানিজ নিহত হয়েছে। 
তিনি এ সময় বলেন, তোমাদের দেশ (বাংলাদেশ) আসলেই ভয়ানক।
 
ট্রেন এক কাজে যাচ্ছিলেন হিরোতোসি ফুনাকি। তার হাতে জাপানিজ পত্রিকা। আর তার প্রথম পাতাতেই বড় করে বাংলাদেশের এ হত্যাকাণ্ডের সংবাদ। তিনি বলেন, যেসব জাপানিজ বাংলাদেশে গিয়ে নিহত হয়েছেন তারা বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বার্থেই সেদেশে গিয়েছেন। অথচ যাদের ভালোর জন্য সেখানে গিয়েছিল তাদের হাতেই প্রাণ দিতে হয়েছে। এ ঘটনাকে তিনি ঘৃন্যতর বলে দাবি করেন।
 
তিনি বলেন, এর কঠিন বিচার হওয়া উচিৎ এবং বাংলাদেশের উন্নয়নের সকল কর্মকাণ্ড থেকে জাপানকে সরে আসা উচিত।
 
জাপানে বসবাস করেন এমন অনেক বাংলাদেশি আছেন যাদের স্ত্রী জাপানিজ। জানা যায়, তাদের মধ্যেও এক ধরনের শঙ্কা বিরাজ করছে। যে যেভাবেই পারছেন তারা সেভাবেই প্রশ্ন করছেন বাংলাদেশি নাগরিকদের।
 
জাপানে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করছেন সুমন আহম্মেদ। বাংলাদেশ থেকে যেসব ছাত্ররা জাপানে পড়ালেখা করতে আগ্রহী তিনি তাদের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তিনি বলেন, আমি জানি না সামনে কি হতে যাচ্ছে। তবে আমার মনে হচ্ছে এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের স্টুডেন্ট ভিসায় আসাটা এই দেশে আরেকধাপ কঠিন হয়ে যাবে। তিনি বলেন, এখানে যেসব শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা করতে আসে তারা প্রত্যেকেই দেশের উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা রাখে। কিন্তু ৭ জন জাপানিজকে হত্যার মধ্যদিয়ে তা আর কতখানি এগুবে তা নিয়েই সন্দিহান।
 
অন্যদিকে বাংলাদেশে এ নৃশংস ঘটনার পর জাপান আওয়ামী লীগ শোক প্রকাশ করে। এক বার্তায় দলটির পক্ষ থেকে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানো হয়। শোকবার্তায় বলা হয়, জাপান আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জাপানের ৭ জন নাগরিকসহ নিহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।
 
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার রাতে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলা চালানো হয়। সে সময় দুই পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। শনিবার সকালে জিম্মিদের উদ্ধারে কমান্ডো অভিযান চালানো হয়। পরে সেখান থেকে ১৭ বিদেশিসহ ২০ জিম্মির লাশ উদ্ধার করা হয়। কমান্ডো অভিযানে ছয় জঙ্গি নিহত হয় ও একজনকে সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়।