নিউজিল্যান্ডের মসজিদে হামলা

মানবতার বিরুদ্ধে বর্বরতা

আপডেট : ২১ মার্চ ২০১৯, ২১:১৩

মুফতী মীযানুর রহমান রায়হান

গত শুক্রবার জুমার নামাজ চলাকালীন নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে উগ্রবাদী খ্রিস্টান জঙ্গির নির্মম বন্দুক হামলায় নারী ও শিশুসহ অর্ধশত মুসল্লি শহীদ হয়েছেন। যাদের মধ্যে তিন বছরের শিশু থেকে ৭৭ বছর বয়সী বৃদ্ধও রয়েছেন। শুধু যে মসজিদে হামলা হচ্ছে তা নয়; অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোও আক্রান্ত হচ্ছে উগ্রবাদী টেররিস্টদের হিংস্র থাবায়। অথচ ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোকে মনে করা হয় দুনিয়ার সবচেয়ে শান্তির জায়গা। আসলে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। ধর্ম মানব জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ধর্মই মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটায় এবং আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। আর ধর্মের মাধ্যমেই আত্মিক উন্নতি সাধন ও নৈতিক শক্তি অর্জিত হয়। প্রকৃত ধার্মিক ব্যক্তিরা সত্ ও মহত্ হয়ে থাকেন। তাই তাদের কাছে জাতিভেদ-ধর্মভেদ সম্পূর্ণ গৌণ থাকে। জীবনে যারা ধর্মীয় বিধি-বিধান পালনে অভ্যস্ত নয় তারাই অন্য ধর্মের ওপর আঘাত করে থাকে। ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, ইয়াহূদি, খ্রিস্টান, কনফুসিয়াম, যরাথুস্টসহ সব ধর্মই সংঘাত নয়, সহনশীলতায় বিশ্বাসী। কোনো ধর্মই অন্য ধর্মের প্রবর্তককে হেয় জ্ঞান করে না। ইসলাম পূর্বের সকল নবী-রাসূলকে আল্লাহ প্রেরিত বলে স্বীকার করে। ইসলাম ধর্মের অধিকাংশ বিধি-বিধান তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিলের সংস্করণ মাত্র।  কুরআন হচ্ছে আল্লাহর সর্বশেষ কিতাব, আর মুহাম্মদ (স) সর্বশেষ নবী। সর্বশেষ আসমানী কিতাব কুরআনের নাযিলের মাধ্যমে ইসলামের পূর্ণতা দান করা হয়েছে। তবে কুরআন নাযিলের পর পূর্বের সকল কিতাবের বিধান রহিত হয়ে গেছে।

ইয়াহূদি, খ্রিস্টান ও ইসলামের ইতিহাস-ঐতিহ্য অভিন্ন। ইসলাম তার অভিন্নতার স্মৃতি উল্লেখ করে সেমেটিক ধর্মাবলম্বীদেরকে মিলনের আহ্বান জানিয়েছে। আল-কুরআনে ইরশাদ আছে—‘আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি আল্লাহর প্রতি এবং যা আমাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে তাতে। ইবরাহীম ইসমাঈল ইসহাক ইয়াকুব ও তাঁর বংশধরদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং মূসা ঈসা ও অন্যান্য নবীগণকে তাঁদের রবের পক্ষ থেকে যা দেওয়া হয়েছে সেগুলোর প্রতিও আমরা বিশ্বাস স্থাপন করি। আর আমরা কোনো নবীর মধ্যে পার্থক্য করি না। মূলত আমরা সবাই আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণকারী। (সূরা আল ইমরান, আয়াত ৮৪) ইসলাম তার অনুসারীদেরকে পরমতসহিষ্ণুতা ও পরধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে বলেছে। আল-কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে- ‘আল্লাহর পরিবর্তে তারা যাদের ডাকে তাদের তোমরা কখনো গালি দিও না, নইলে তারাও শত্রুতার কারণে না জেনে আল্লাহ তাআলাকেও গালি দেবে।’ (সূরা আনআম, আয়াত ১০৮)

আল-কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে- ‘আল্লাহর নিষেধ করেন না ওই সব লোকদের সাথে সদাচার ও ইনসাফপূর্ণ আচরণ করতে যারা তোমাদের সঙ্গে ধর্মকেন্দ্রিক যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের আবাসভূমি থেকে তোমাদের বের করেনি। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদের পছন্দ করেন।’ (সূরা আল মুমতাহিনা, আয়াত ৮) এছাড়া কোনো বিধর্মী উপাসনালয়ে সাধারণ অবস্থায় তো দূরের কথা যুদ্ধাবস্থায়ও হামলা করতে ইসলাম নিষেধ করেছে। মানবতার বন্ধু নবী মুহাম্মদ (স) কাফেলা প্রেরণকালে নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন—‘তোমরা আল্লাহর নামে আল্লাহর পথে যাত্রা করো। আল্লাহর প্রতি কুফরকারীদের বিরুদ্ধে তোমরা লড়াই করবে। আমি তোমাদের কয়েকটি উপদেশ দিয়ে প্রেরণ করছি- যুদ্ধক্ষেত্রে তোমরা বাড়াবাড়ি করবে না, ভীরুতা দেখাবে না, শত্রুপক্ষের কারো চেহারায় বিকৃতি ঘটাবে না, কোনো শিশুকে হত্যা করবে না, কোনো গির্জায় আগুন দেবে না এবং কোনো বৃক্ষ উত্পাটন করবে না।’ (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদিস নং ৯৪৩০) ঐতিহাসিক মুওতার যুদ্ধে কাফেলা রওনার প্রাক্কালেও রাসূলুল্লাহ (স) নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন- ‘তোমরা কোনো নারীকে হত্যা করবে না, অসহায় কোনো শিশুকেও না, আর না অক্ষম বৃদ্ধকে।’ (মুসলিম শরীফ, হাদিস নং ১৭৩১)

পাক কালামে ইরশাদ হচ্ছে- ‘যারা তোমাদেরকে মসজিদে হারামে আসার পথ রুদ্ধ করেছিল, তাদের প্রতি ঘৃণা যেন তোমাদেরকে সীমা লঙ্ঘন না করায়। যা কিছু ন্যায় এবং ভালো তা করতে তোমরা একে অন্যকে (অমুসলিমদেরকে) সাহায্য করো। অন্যায় এবং আগ্রাসনে একে অন্যকে কখনোই সাহায্য করবে না। আল্লাহর কথা সবসময় মনে রাখবে। তাঁর শাস্তি খুবই কঠিন।’ (সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত ২)

lলেখক : ইসলামি গবেষক ও বাংলাদেশ বেতারের ধর্মীয় উপস্থাপক