দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ইসলাম

আপডেট : ২১ মার্চ ২০১৯, ২১:১৪

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

স্বাধীনতা আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্য বিশেষ নিয়ামত। প্রত্যেক মানুষই স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকতে চায়, স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে চায়। স্বাধীনতাই মানুষের অস্তিত্বে লালিত সুপ্ত প্রতিভা ও শক্তিকে ক্রমাগত উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে বিকশিত করতে সহায়তা করে। তাই মানুষ সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পরাধীন থাকতে চায় না, ইসলাম এমন পরাধীনতাকে সমর্থন করে না। পরাধীনরা তাদের স্বীয় মাতৃভূমি উদ্ধার ও স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করবে-এটাই ইসলামের বিধান। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হলো তাদেরকে যারা আক্রান্ত হয়েছে, কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে; আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদেরকে সাহায্য করতে সম্যক সক্ষম। তাদেরকে তাদের ঘর-বাড়ি থেকে অন্যায়ভাবে বহিষ্কৃত করা হয়েছে শুধু এ কারণে যে তারা বলে, ‘আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ।’ (সূরা আল-হজ, আয়াত: ৩৯-৪০)

রাসূলুল্লাহ (স) অনেক ত্যাগ স্বীকার করে মদীনায় হিজরত করে একটি স্বাধীন ইসলামি প্রজাতন্ত্র গঠন করেন। তিনি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিতকে মজবুত করার জন্য মদীনা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মুসলমান, ইহুদি, পৌত্তলিক ও বিধর্মীদের নিয়ে সকল জাতি ও গোষ্ঠীর মানবিক ও ধর্মীয় অধিকারকে সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৬২২ খ্রিস্টাব্দে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পাদন করেন- যা ‘মদীনা সনদ’ নামে খ্যাত। বিশ্বাসের স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য স্বীকার করে নিয়ে আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং একটি সুখী-সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের মহতী লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি এ সমঝোতা সনদ প্রণয়ন করেন। একটি স্বাধীন জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য এটিই পৃথিবীর প্রথম লিখিত শাসনতন্ত্র বা সংবিধান, যাতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ দলমত নির্বিশেষে সকলের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়।

নবী করিম (স) মদীনা রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এমনকি অনেক আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ ও সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছেন। নির্যাতিত-নিপীড়িত অধিকার বঞ্চিত মানুষের স্বাধীনতার জন্য জনগণের প্রতিরোধ আন্দোলন ও সংগ্রাম করাকে তিনি শুধু উদ্বুদ্ধই করেননি, বরং সার্বভৌমত্ব অর্জন ও দেশ রক্ষায় জীবনদানকে শহীদের সম্মানজনক মর্যাদা দিয়েছেন। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত ও আক্রমণ প্রতিহত করে কার্যত বিনা যুদ্ধে, বিনা রক্তপাতে, বিনা ধ্বংসে মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তিনি জালিম, সন্ত্রাসী ও পৌত্তলিকদের কবল থেকে মক্কাকে স্বাধীন করলেন। মক্কাবাসী কর্তৃক দীর্ঘদিন ধরে অত্যাচারিত ও নির্যাতিত হয়েও মক্কা বিজয়ের পর আজাদীর সুমহান আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে তিনি পরাজিত সমবেত জনতাকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, ‘হে আমার দেশবাসী! তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো ক্ষোভ বা অভিযোগ নেই। তোমরা মুক্ত, স্বাধীন।’

স্বদেশবাসীর প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে বিশ্বের ইতিহাসে তিনি অতুলনীয় দেশপ্রেম, উদারতা ও মহানুভবতার অনুপম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন স্থাপন করেন। অতঃপর সামান্য সময়ের ব্যবধানে স্বাধীন ইসলামি রাষ্ট্রের পরিধিকে বিস্তৃত করে পুরো আরব ভূখণ্ডকে অবারিত শান্তি ও নিরাপত্তায়, অভূতপূর্ব শৃঙ্খলায়, অপূর্ব সুষম বন্টনে, অবর্ণনীয় ভ্রাতৃত্ববোধে এবং স্বপ্নাতীত জনকল্যাণে ভরে দিয়েছিলেন। মহানবী (স) স্বাধীন ইসলামি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সকল বিষয়কে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজান। ফলে সমাজে বসবাসকারী প্রতিটি জনগণই স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে থাকে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই সফলতা পেতে থাকে।

স্বাধীনতার সুমহান আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে লালন করে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পরাধীনতা আর গোলামির শৃঙ্খল ভেঙে ১৯৭১ সালে বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা ছিনিয়ে এনেছে স্বাধীন দেশের লাল-সবুজ পতাকা। যে স্বাধীনতার জন্য শোকর আদায় করে শেষ করা যায় না। যাদের সুমহান আত্মত্যাগ ও শাহাদাতের বিনিময়ে আমরা মাতৃভূমির স্বাধীনতা লাভ করেছি, যাদের অশেষ অবদানে বাঙালি জাতি গৌরব অনুভব করে আমরা তাদের রূহের মাগফিরাত কামনা করে সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলার কষ্টার্জিত স্বাধীনতার মর্যাদা সমুন্নত রাখা আমাদের ঈমানি দায়িত্ব ও পবিত্র কর্তব্য। স্বাধীনতা সুরক্ষায় জাতীয় ঐক্যমত ও জনসংহতি খুবই প্রয়োজন।

lলেখক: প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ইনস্টিটিউট অব ল্যাংগুয়েজ স্টাডিজ। প্রফেসর ও এডভাইজার, ইসলামিক স্টাডিজ ও ইসলামের ইতিহাস বিভাগ, স্কুল অব লিবারেল আর্টস, ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা, উত্তরা, ঢাকা

 

 

০