দেশের উত্তরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। প্রবল বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। বন্যায় তলিয়ে যাচ্ছে ভিটে, বাড়িঘর, বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন জেলায় পানিবন্দী মানুষের সংখ্যা ১০ লক্ষাধিক। বিশুদ্ধ পানি, খাবার সংকট ও ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টি বন্যা দুর্গতদের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিচ্ছে ।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) জানায়, নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কুড়িগ্রামের সদর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। গতকাল সোমবার নেত্রকোনার কংশ ও কুড়িগ্রামের ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার ১ মিটারেরও বেশি উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। পদ্মা, যমুনা, তিস্তা, ঘাঘট, ব্রহ্মপুত্র, গুর, আত্রাই, ধলেশ্বরী, সুরমা ও তিতাস নদীর বিভিন্ন স্থানে বিপদসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল সকালে বিভিন্ন নদীর ৫৭টি স্থানে (স্টেশনে) পানি প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বন্যায় প্লাবিত অন্য জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে- নীলফামারি, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, টাঙ্গাইল, রাজবাড়ি, শরিয়তপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া। আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্র জানায়, গত রবিবার সকাল ৯টা থেকে গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে সুনামগঞ্জে ১৪৩ মিলিমিটার। প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর-
সিরাজগঞ্জ: জেলার কাজিপুর, সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি, চৌহালি ও শাহজাদপুর উপজেলার প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পদখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকট। এ পর্যন্ত জেলায় আড়াই শ মেট্রিক টন চাল ও ছয় লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে তিন লাখ টাকা ও ৬৫ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। এদিকে এনায়েতপুরের ব্রাহ্মনগ্রাম থেকে পাচিল পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটারজুড়ে শুরু হয়েছে ভাংগন । এছাড়া কাজিপুরের খাশরাজবাড়ির বিলধলী ও দাদবোরা গ্রামে ভাংগন দেখা দিয়েছে।
সুনামগঞ্জ:জেলার ছয়টি উপজেলায় কয়েক লাখ মানুষ গত ছয় দিন ধরে পানিবন্দী রয়েছে। শুধু দোয়ারাবাজারেই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী আছেন। গতকালও জেলা সদরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ ছিল তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর ও দোয়ারাবাজার উপজেলার। বন্যাকবলিত এলাকায় মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি সংকট দেখা দিয়েছে বন্যা ছয় উপদ্রুত এলাকায়। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. কামরুজ্জামান জানান, জেলার ১১টি উপজেলায় ত্রাণ সহায়তা হিসেবে ১১৬ মেট্রিক টন চাল ও আট লাখ ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
কুড়িগ্রাম: সরকারি হিসেবে ৯টি উপজেলার ৫৩টি ইউনিয়নের ৫শ গ্রামের ৬৩ হাজার পরিবারের তিন লাখ মানুষ পানিবন্দী রয়েছে। তবে ইউপি চেয়ারম্যানদের তথ্যমতে এ সংখ্যা সাড়ে তিন লাখেরও বেশি। ঘরে ঘরে খাদ্যের জন্য হাহাকার বিরাজ করছে। কুড়িগ্রাম-যাত্রাপুর সড়ক বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দু’দিন ধরে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। সরকারিভাবে দুর্গত মানুষের জন্য বরাদ্দ মিলেছে মাত্র ১৯২ টন চাল ও সাড়ে আট লাখ টাকা। এ বরাদ্দ হাতির মুখে দুর্বা ঘাসের মতো। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজার রহমান জানান, যাত্রাপুর বাজারের নিকট বাঁধের ১৫০মিটার ভেঙে যাওয়ায় পানির ১৫টি বাড়ি ভেসে গেছে। ২০০ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ১০টি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২২ কি. মি. বাঁধ। দ্রুত তা মেরামতের চেষ্টা চলছে।
বগুড়া: সারিয়াকান্দি , ধুন্ট ও সোনাতলা এই তিন উপজেলায় ৮২ হাজার মানুষ পানিবন্দী রয়েছে। এরমধ্যে সারিয়াকান্দিতেই রয়েছে ৭৫ হাজার মানুষ। ৭২ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে । বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য, জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত নানা রোগবালাই ছড়িয়ে পড়ছে। সারিয়াকান্দি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. সরওয়ার আলম জানান, ইতোমধ্যে ৩০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ৫০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে। বগুড়া পানি উন্নয়ন বোডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) মো. আবু সাঈদ জানান, যমুনায় পানি আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা শাহারুল ইসলাম মো. আবু হেনা জানান, প্রয়োজনীয় ত্রাণ সামগ্রী মজুদ রয়েছে।
জামালপুর: জেলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী নবকুমার চৌধুরী জানান, ‘যমুনার বাহাদুরাবাদঘাট পয়েন্টে বিপদ সীমার ৭১ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।’ শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল আলীম জানান, ৯৬টি বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ৭টি উপজেলায় প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। মেলান্দহ উপজেলার মুহমুদপুর-উলিয়াবাজর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ইসলামপুর শিংভাঙ্গা ও গুঠাইল সড়ক তলিয়ে উপজেলার সদরের সাথে যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে পড়েছে। জামালপুর-২ আসনের এমপি ফরিদুল হক খান দুলাল জরুরি ভিক্তিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে মানুষের জন্য সাহয্য কামনা করেছেন। জেলা প্রশাসক শাহাবউদ্দিন খান জানান- সাত শ’ পরিবারকে শুকনো খাবার ও নগদ এক লক্ষ টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন।
গাইবান্ধা: গতকাল সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও গাইবান্ধা সদর উপজেলার নদী তীরবর্তী আরো প্রায় আট হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এই নিয়ে জেলায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে চরম দুর্ভোগে রয়েছে। মানুষ ও গো খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকাশ কৃষ্ণ সরকার জানান, গাইবান্ধা শহর রক্ষা বাঁধের কিছু অংশ ধসে যাওয়ায় বাঁধটি হুমকির মুখে পড়েছে। এসব স্থানে মেরামত কাজ অব্যাহত রেখেছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, এ পর্যন্ত বন্যা কবলিত এলাকায় শুকনো খাবার কেনার জন্য পাঁচ লাখ টাকা, ২০০ মেট্রিক টন চাল ও আরো দুই লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
লালমনিরহাট: জেলার হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও সদর উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের তিস্তা ও ধরলা নদীর তীরবর্তী চরাঞ্চলের ৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ৫০ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা জানান, ইতিমধ্যে ২৭৬ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।
পঞ্চগড়: পঞ্চগড় পৌরসভা এলাকায় করতোয়া নদীর উভয় পাশের ১০টি বস্তি প্লাবিত হয়েছে। এতে কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পৌরসভার মেয়র তৌহিদুল ইসলামসহ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা প্লাবিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
মানিকগঞ্জ: জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল জানান, ‘নিম্নাঞ্চলের কিছু এলাকা জলমগ্ন হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সবরকম প্রস্তুতি রয়েছে।’ যমুনার ভাঙনে আরিচা ঘাটের নিকট নিহালপুর-জাফরগঞ্জ সড়কে বাঁধের তিনটি অংশের সিসি ব্লক ধসে পড়েছে। শিবালয় উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী আকবর জানান, ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নিতে উপজেলা প্রকৌশলীকে নিদের্শ দেওয়া হয়েছে। এদিকে শিবালয়ের পদ্মা-যমুনা তীরবর্তী এলাকায় নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। তেওতা ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের জানান, এ ইউনিয়নের অন্তত একহাজার পরিবার ভাঙনে সর্বশান্ত হয়ে খোলা আকাশের নিচে জীবন যাপন করছে।
