বন্যায় এনায়েতপুরের চরাঞ্চলে অন্তঃহীন দুর্ভোগ

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০১৬, ১৮:২৮
১০/১৫ দিন ধরে ১ থেকে ৪ ফুট করে ঘরের মধ্যে পানি। উঠানে দাঁড়ানোর মত অবস্থা নেই। নেই খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও কাজের সন্ধান। এ যেন বন্যার সকল অন্তঃহীন দুর্ভোগ বাসা বেধেছে সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার এনায়েতপুর থানার বেতিল, আশাননগর, মাচগ্রাম বিনদহ, ধুলিয়াবাড়ি ও তেবাড়িয়ার চরাঞ্চল জুড়ে।
 
অনেকেই আবার বন্যার দুর্ভোগের কাছে পরাস্ত হয়ে ঘর তালা লাগিয়ে বাড়ি ছাড়তেও বাধ্য হয়েছে। যারা আছেন নিরুপায় হয়ে মাচা করে গরু ছাগল নিয়ে করছেন বসবাস। এদের রান্না ও নামাজ আদায় হচ্ছে নৌকার উপর। হাত পায়েও ধরে গেছে থকথকে ঘাঁ। এতো কিছুর পরেও মানবিক ভাবে বিপর্যস্ত এদের সহযোগীতায় নেই সরকারি ও বেসরকারিভাবে কারো সহায়তার হাত।
IMG0
বেতিল চরের দিন মজুর জেলে সিরাজ ফকিরের স্ত্রী আনোয়ারা খাতুন (৫০)। ২ ছেলে ১ মেয়ে ও নাতি-নাতনী নিয়ে তার অভাবের সংসার। গত ১০/১২ দিন ধরে বন্যার পানিতে তিনি পরিবার নিয়ে হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। ৪ ফুট পানি থাকার ঘরে। সেখানে থাকার মত অবস্থা নেই বলে গত ৪ দিন ধরে দুয়ারের এক কোনায় পাশের বাড়ি থেকে টিন চেয়ে এনে মাচা করে কোন রকমে করছেন বসবাস। স্বামীর যেদিন মাছ ধরতে পারে সেদিনই তাদের চলে দু বেলা আহার। টিউবয়েল তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানি প্রাপ্তি নিয়েও বিরম্বনা। এখানে অবর্ননীয় দুর্ভোগ পোহালেও কেউ খোঁজ নিতে আসেনি। দুর্বল ঘরটি নিয়েও তার সংশয়ের শেষ নেই।
 
আনোয়ারা খাতুন জানান, পানি বাড়ার কারণে ঘর-দুয়ার সব কিছু তলিয়ে গেয়ে। থাকা, খাওয়া, পায়খানা-প্রসাব নিয়ে চড়ম দুর্ভোগ পোহাচ্ছি। বর্তমানে ভরা বন্যায় আমার স্বামীর জালে খুব একটা মাছও পাওয়া যাচ্ছেনা। তাই খেয়ে না খেয়ে চলছে সংসার। তিনি আরো জানান, গতবারের চেয়ে এবার আরো বেশি পানি হয়েছে। কেউ কোন সাহায্য করেনি বলে জনপ্রতিনিধিদের উপর ক্ষোভ প্রকাশ করলেন।
 
আনোয়ারা খাতুনের মত এসব এলাকার অন্তত ৫ শতাধিক পরিবারের বন্যা দুর্ভোগ তাড়া করছে প্রতি পদে। জেলার অন্যতম এই দুর্গত এলাকার প্রায় ৯৮ শতাংশ বাড়িতে ১ থেকে ৪ ফুট পানি বিরাজ করছে। ডুবে গেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ মসজিদ/মাদ্রাসা। চৌকি তলিয়ে যাওয়ায় অধিকাংশ মানুষ বসবাস করছে মাচা করে। গবাদী পশুও রাখতে হচ্ছে কচুরী পানার ভাসমান পাটাটনের উপর। বন্যা দুর্ভোগ পোহানো এমনি নানা অসহায়াত্বের কথা জানান, এই গ্রামের তাঁত শ্রমিক ছানোয়ার হোসেন, তার স্ত্রী ডলি খাতুন, আশরাফ আলী, তার স্ত্রী আসমা খাতুন, বৃদ্ধ আছিয়ন বেওয়া, আলম উদ্দিন, রমজান আলী, রাজ্জাক মোল্লা, সুলতান আলী।
 
তারা জানান, বাড়িতে ১ সপ্তাহ ধরে পানি উঠে পড়ায় গরুর গোয়াল ঘর, টিউবয়েল এবং নিজেদের থাকার ঘরেও ৩ ফুট করে পানি উঠে পড়েছে। কচুরী পানা দিয়ে ভেলা করে গরু রাখছি। কাজ না থাকায় দু বেলা খাবার জুটছেনা। হাত পায়ে থকথকে ঘাঁ হয়ে গেছে। কেউ দেখতে আসেনি। অথচ নির্বাচনের সময় মেম্বর, চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান ও এমপিরা বলেন নানা ভাবে সহায়তা দেবার কথা। কিন্তু এখন আমাদের চরম অবস্থা চললেও কেউ এ পর্যন্ত খবর নদী ভাঙ্গনে বিপর্যস্ত এসব মানুষ গত কয়েক বছর ধরে নদী তীরের গ্রাম গুলোতে আশ্রয় নিয়ে বন্যা দুর্ভোগেও দুর্বিপাকে পড়ছে। এবার অসহায় এই মানুষ গুলো নামাজ আদায়, রান্নার কাজ সারতে হচ্ছে নৌকায়। সরজমিনে বেতিল চরে গিয়ে দেখা যায়, আশরাফ আলীর মেয়ে রাশিদা খাতুন (১৪) রান্না করছে নৌকায়।
IMG1
পাশের ঠান্ড মুন্সী (৬৫) নামাজ আদায় করছেন নৌকার উপর। তারা জানান, নৌকাই ভেসে থাকার এক মাত্র পন্থা। তাই মসজিদ ও রান্না ঘর তলিয়ে যাওয়ায় এখন নৌকাই হচ্ছে একমাত্র ভরসা। এখন আল্লাহ পাক কবে এই বন্যা কাটিয়ে নেবে এই অপেক্ষায় রয়েছি আমরা।
 
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি ১৪ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদ সীমার ৭০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এজন্য চৌহালী ও এনায়েতপুরের ১০টি ইউনিয়নে নতুন নতুন এলাকায় বন্যা কবলিত হয়ে পড়ছে।
 
চৌহালীর উপজেলা নির্বাহী অফিসার রেজাউল বারী জানিয়েছেন, বন্যার্তদের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এ পর্যন্ত ৬০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ৪০ হাজার টাকা পেয়েছি। সে গুলো পর্যায় ক্রমে ইউনিয়ন গুলোতে বরাদ্ধ করা হচ্ছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় কম।