আসিফুর রহমান সাগর
নদীর পানি প্রবাহ কমে যাচ্ছে। প্লাবন বেড়ে গেছে। পানিবাহিত রোগে মানুষের মৃত্যুও হচ্ছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশে সবার জন্য বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়েছে। গ্রীষ্মকাল এখনো শুরু হয়নি; কিন্তু দেশের প্রধান প্রধান নদ-নদীগুলো শুষ্ক। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভুঁইয়া জানান, রাজশাহীর পদ্মা ও মহানন্দা নদীর পানি একেবারেই শুকিয়ে গেছে। তিস্তা নদীর পানি ১ হাজার কিউসেকের নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ সব নদ-নদীতে জেগে উঠেছে চর।
বাংলাদেশের নদীগুলোর এই মরণ দশার জন্য প্রধান কারণ হলো গ্রীষ্মকালে উজান থেকে পানি প্রবাহ কমে আসা। বর্ষায় পানির গড় প্রবাহ ঠিক থাকলেও গ্রীষ্মকালে সব নদীর গড় প্রবাহ ভয়াবহভাবে কমে এসেছে। বাংলাদেশে গঙ্গা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্রর (জেএমবি বেসিন) এই তিন অববাহিকার পানিই প্রধান উত্স।
বিশ্বে জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে থাকা সবচেয়ে সংকটময় অবস্থা বাংলাদেশের। এর সঙ্গে পানির অপ্রতুলতা ও বিশুদ্ধ পানির অভাব বাংলাদেশের পরিবেশ ও প্রকৃতিকে ভারসাম্যহীন করে তুলেছে। কারণ, বিশ্বে সর্বমোট রোগের চার-পঞ্চমাংশ রোগ এবং এক-তৃতীয়াংশ মৃত্যু দূষিত পানির জন্যই হয়ে থাকে। জাতিসংঘ বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি-৬ অর্জনের প্রধানতম লক্ষ্য হচ্ছে ‘সবার জন্য বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করা’। বিশ্ব ব্যাংক গত বছর এক প্রতিবেদনে বলেছে, বিশুদ্ধ পানি সবার জন্য নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশের মানুষের দারিদ্র্য দ্রুত দূর হবে। এমন বাস্তবতার মুখেই আজ বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব পানি দিবস। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন। এবার পানি দিবসের প্রতিপাদ্য ‘কাউকে পিছনে ফেলে নয়’।
বাংলাদেশকে নদীমাতৃক দেশ বলা হলেও দেশের সাড়ে আট কোটি মানুষ বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে পারছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) এ তথ্য জানিয়ে বলছে, বাংলাদেশের মানুষ ঝুঁকির মধ্যে বাস করছে। কারণ, ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশে ৯৭ ভাগ মানুষের পানি প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা হলেও বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে না পারার কারণে এবং মৌসুম ভেদে পানি সংকটের কারণে স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিঘ্নিত হচ্ছে, শিল্পোন্নয়ন ও কৃষি কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানিই পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রেখেছে, বাসযোগ্য রেখেছে। বলতে গেলে পানি ছাড়া প্রকৃতি, জীবন ও সভ্যতা অচল; কিন্তু নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা ও সুষ্ঠু ব্যবহারের অভাবে প্রকৃতি তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়ছে। প্রকৃতি ও পানির অবিবেচক ব্যবহারের ফলে পানির গুণাগুণ ও পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। নিরাপদ পানির অভাবে মানুষের স্বাস্থ্য ও সামগ্রিক জীবনযাত্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ সমস্যা নিরসনে দরকার প্রকৃতিনির্ভর পানি ব্যবস্থাপনা।
জাতিসংঘের দেওয়া এক তথ্য মতে, বিশ্বে বর্তমানে ২ দশমিক ১ বিলিয়ন মানুষ নিরাপদ সুপেয় পানি সেবা থেকে বঞ্চিত। বর্তমানে বাংলাদেশে বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে ১০ কোটিরও বেশি মানুষ। যা ২০৫০ সালে ১৫ কোটির বেশিতে দাঁড়াবে। দেশের অধিকাংশ মানুষ ভূমি ক্ষয় ও মরুকরণ প্রক্রিয়া দ্বারা প্রভাবিত। দেশের বনভূমির পরিমাণ বাড়ছে। তবে ১৯০০ সাল থেকে ৬৪ পর্যন্ত ৭১ শতাংশ জলাভূমি হারিয়ে গিয়েছে। কৃষি ভূমির মাটি ক্ষয়ের ফলে প্রতি বছর ২৫ থেকে ৪০ বিলিয়ন টন টপসয়েল হারিয়ে যাচ্ছে, যাতে ফলন কমে যাচ্ছে এবং টপসয়েলে প্রচুর পরিমাণে নাইট্রোজেন ও ফসফরাস থাকায় তা পানি দূষণে ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি অতিমাত্রায় নগরায়ণ, কল-কারখানা পানি দূষিত হচ্ছে। সেই দূষিত পানি বর্জ্যযুক্ত পানি নদীতে যাওয়া ঠেকাতে হবে।
এক গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকায় জলাশয় ও নিম্নাঞ্চল ১৯৬০ সাল হতে ২০০৮ সাল পর্যন্ত কমেছে ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ ও ৫২ দশমিক ৫০ শতাংশ। ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ নিম্নাঞ্চল ভরাট করা হয়েছে। ভরাটের এ গতি অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ শতভাগ নিম্নাঞ্চল হারিয়ে যাবে। ঢাকায় এক দিকে দখল এবং অন্যদিকে দূষণ ও আগ্রাসনের ফলে নদী সংকীর্ণ হয়ে পড়ে এবং পানি দূষিত ও দুর্গন্ধময় হয়ে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনীতির প্রতি হুমকি হয়ে দেখা দেয়।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ঢাকার ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়ায় যেমন পরিবেশ ব্যাপক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে তেমনি বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার অন্যান্য নদীর দূষিত পানি এই পানির স্তরে প্রবেশ করছে। এতে ঢাকার ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর তিন ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এক. পানি নিচে নেমে যাওয়ায় জলের উত্স হারানো, দুই. ভূ-গর্ভের পানি দূষিত হয়ে ব্যবহারকারীদের মাঝে রোগ ছড়ানো, তিন. পরিবেশ বিপর্যয় ও ভূমিকম্পের আশঙ্কা বাড়ছে।
