পৃথিবী বিজয়ীদের মনে রাখে, পরাজিতদের ভুলে যায়। ইতিহাসের ধর্মটাই আসলে এমন। কিন্তু একটু খোঁজ নিলে জানা যায়, পরাজিতদের করুণ গল্পগুলো হয়তো তাদের মত তুচ্ছ নয়। মাঝে মাঝে সেখান থেকে নিরন্তর সংগ্রামের অনুপ্রেরণা খুঁজে পেতে পারেন চির বঞ্চিতরা।
রিও অলিম্পিকের সাঁতারের কথাই চিন্তা করুন। কিংবদন্তি মাইকেল ফেলপসকে নিয়ে কত শত সংবাদ, কত আশা-আকাঙ্ক্ষার গল্প। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছেন তাদের কথা, যারা হিটেই ‘অদ্ভুতভাবে’ শুরু করে বাদ পড়ে যান প্রতিযোগিতা থেকে কিংবা বিজয়ীর চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি সময় নিয়ে হাসির পাত্র হন সবার? উল্টোটাও অবশ্য হয়। সংগ্রামের গল্পটা যারা জানেন, তারা হয়তো দাঁড়িয়ে সম্মান জানান অলিম্পিকে অংশ নেওয়ার আগে সুইমিং পুল না দেখা এরিক মৌসাম্বানির মতো মুকুটহীন কিংবদন্তিদের।
ফেলপসরা অনেক কিছু পান। বৈজ্ঞানিক অনুশীলন কিংবা লোভনীয় স্পন্সরশিপস- কী নেই তাদের? কিন্তু এমন সাঁতারুও অলিম্পিকে আসেন, যাদের জন্য অংশগ্রহণই স্বর্ণ জেতার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। মুকুটহীন রাজা তারা। অলিম্পিকে আসার আগে হয়তো ঠিকঠাক মাপের সুইমিং পুলও চোখে দেখেন না এইসব সাঁতারুরা।
একটু তাকান মালদ্বীপের আমিনাথ শাহজানের দিকে। অনুশীলনের জন্য কোনো সুইমিং পুল নেই তার। ভারত মহাসাগরের কোণে ভাসমান কোনো কিছু দিয়ে সীমানা তৈরি করে লোনা পানিতে নেমে যান তিনি। অনুশীলনে সঙ্গী হিসেবে কোনো সাঁতারু নন; শাহজান পান ময়লা-আবর্জনা, পানির নীচে লুকিয়ে থাকা কঠিন প্রবাল দ্বীপ কিংবা জেলিফিশ। ২২ বছর বয়সী সাঁতারু এএফপিকে বলছিলেন, ‘মালদ্বীপে আমরা সাগরে অনুশীলন করি। আমাদের কোনো সুইমিং পুল নেই। কোনোদিন আমরা ভেসে আসা আবর্জনার সঙ্গে অনুশীলন করি। আবার কোনোদিন আমরা কামড় খাই জেলিফিশের।’
আশ্চর্য এই যে, এতেই আনন্দ খুঁজে পান তারা। শাহজানের টিমমেট নিশবান ইব্রাহিম বলছিলেন, ‘রাতের আবছা আলোয় আমরা আবর্জনা এবং ঢেউকে উপেক্ষা করে অনুশীলন করি। আপনি যখন সেখানে হা করবেন, আবর্জনাযুক্ত পানি আপনার মুখের মধ্যে ঢুকে যায়। আরো ভয়ঙ্কর কিছুও হতে পারে। জেলিফিশ দেখে আপনি ভয় পেতে পারেন। কিন্তু আপনি যখন অভ্যস্ত হয়ে যাবেন, তখন এসব কিছুই নয়। সমুদ্রে সাঁতার কাটাই সহজ- ঠান্ডা আর শীতল অনুভূতি।’
রিও অলিম্পিকের আগে দক্ষিণ আফ্রিকার অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন চাদ লে ক্লোসের সঙ্গে কিছু সময় ব্যয় করেছেন ইব্রাহিম। চাদ লের মতো একজনের কাছ থেকে কী উপদেশ চাইবেন সেটাও যেন জানা নেই তার। ছেলেদের ৫০ মিটার ফ্রিস্টাইলে সাঁতরানো ১৯ বছর বয়সী বলেন, ‘সাঁতারে নামার আগে আমি অবশ্যই তার কাছ থেকে কিছু উপদেশ চাইব। কিন্তু জানি না, কী জিজ্ঞেস করব। কিন্তু একটা কিছু তো ভেবে নিবই!’
ইব্রাহিমের সঙ্গেই রিও তে ৫০ মিটার ফ্রিস্টাইলে সাঁতরাবেন মঙ্গোলিয়ার দুলগুন বাতসেইখান। রাজধানী উলানবাটরে তার বাড়ি থেকে সেলেঙ্গা নদীর দূরত্ব ৪৫০ কিলোমিটার। সেখানেই রিওর জন্য প্রস্তুতি সেরেছেন তিনি। বাতসেইখান বলেন, ‘আমার একমাত্র অনুশীলন সঙ্গী বড় বড় মাছ। নদীর পানি কিছুটা ঠান্ডা। কিন্তু ঠিক আছে। কারণ পানি পানিই। এই দর্শনে বিশ্বাস করি আমি।’ কী আর করবেন? বিশ্বাস করা ছাড়া যে কোনো উপায় নেই তার।
ফেলপসদের মতো অনেকগুলো অলিম্পিক স্বর্ণ পদক নেই ইব্রাহিম-শাহজানদের। জয়ের স্বপ্নটাও হয়তো অপূর্ণ থেকে যাবে চিরদিন। কিন্তু রিওর পুলে নামাও তাদের জন্য স্বর্ণজয়ের তুলনায় কম কিসে?
