চলতি বোরো মৌসুমে ধান সংগ্রহ অভিযানে চলছে অনিয়ম ও দুর্নীতির মহোত্সব। প্রান্তিক কৃষকের লাভের কথা চিন্তা করে সরকার এ বছর বোরো মৌসুমে অধিক পরিমাণ ধান ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিলেও লাভ যাচ্ছে স্থানীয় কতিপয় প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, অসাধু খাদ্য কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের পকেটে। প্রান্তিক কৃষকদের জন্য থাকছে শুধুই হতাশা।
চলতি বোরো মৌসুমে সরকার ১৩ লাখ টন ধান-চাল সংগ্রহ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। যারমধ্যে ৭ লাখ টন ধান। যা গত মৌসুমের তুলনায় ৬ লাখ টন বেশি। গত মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ টন। এছাড়া ধান সংগ্রহ মূল্য কেজিতে ১ টাকা বাড়িয়ে ২৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়। শুধুমাত্র প্রান্তিক কৃষকদের কষ্টার্জিত ফসলের ন্যায্যমূল্য দিতেই দাম বাড়ানো ও অধিক পরিমাণে ধান ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। কিন্তু প্রকৃত কৃষকরা গুদামে ধান দিতে পারছে না।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক জায়গায় প্রভাবশালীরা ভয়ভীতি দেখিয়ে কৃষকদের কাছে থেকে সামান্য টাকার বিনিময়ে তাদের পরিচয়পত্র নিয়ে নিজেরাই গুদামে ধান দিচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও ধানের মান ভালো না এমন অজুহাতে প্রান্তিক কৃষকের ধান ফিরিয়ে দিয়েছেন গুদাম কর্মকর্তা। অথচ সেই ধানই কৃষকের কাছ থেকে কিনে তা গুদামে সরবরাহ করেছেন কোন প্রভাবশালী। আবার কোন কোন প্রভাবশালী খাদ্য কর্মকর্তা নিজ এলাকায় বরাদ্দের চেয়ে বেশি ধান কিনেছে। ফলে বঞ্চিত হয়েছে আরেক এলাকার কৃষক।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কৃষক যদি তার কষ্টার্জিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পায়, সরকারের গুদামে ধান দিয়ে লাভের মুখ না দেখে তাহলে উত্পাদনের উপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। যা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
বাহুবল (হবিগঞ্জ) সংবাদদাতা সৈয়দ আব্দুল মান্নান জানান, বাহুবলে ধান সংগ্রহ অভিযানে চলছে অনিয়ম ও দুর্নীতির মহোত্সব। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা কৃষক সেজে সরকারি গুদামে ধান সরবরাহ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষক।
কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার কথা ধাকলেও সংশ্লিষ্টরা জানান, এলাকার রাজনৈতিক প্রভাবশালী কতিপয় ব্যক্তি উপজেলা প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের সাথে সমঝোতা করে কৃষক সেজে গুদামে ধান দিয়েছে।
গত ২৪ জুলাই উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির নেতৃত্বে দলের কিছু সুবিধা বঞ্চিত নেতাকর্মী খাদ্য গুদাম কর্মকর্তার দপ্তরে গিয়ে ধান সরবরাহের কথা বললে তিনি অপারগতা প্রকাশ করলে তাদের হাতে নাজেহালের শিকার হন। এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন গুদাম কর্মকর্তা শাহিন মিয়া। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম জানান, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীরা সমঝোতা করে গুদামে ধান সরবরাহ করছে।
উখিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা রফিক উদ্দিন বাবুল বলেন, ধান সংগ্রহে মান যাচাইয়ের নামে হয়রানি করা হচ্ছে কৃষকদের। সরেজমিনে খাদ্যগুদাম ঘুরে দেখা যায়, দালাল ফড়িয়াদের মাধ্যমে সরবরাহকৃত ধান যাচাই-বাছাই না করে তাত্ক্ষণিকভাবে গুদামজাত করা হচ্ছে। কিন্তু কৃষকদের পক্ষ থেকে ধান নিয়ে আসা হলে ঐ ধান নিয়ে নানা রকম জটিলতা ও তালবাহানা করে কৃষকদের ধান পুনরায় রোদে শুকিয়ে নিয়ে আসার কথা বলে ফেরত দেওয়া হচ্ছে। গয়ালমারা গ্রামের কৃষক আলী হোসেন জানান, তিনি তিন বার রোদে শুকিয়ে ফ্যানের বাতাসে ধান, চোয়া পৃথক করে প্রায় দেড় টন ধান নিয়ে এসেছিলেন খাদ্যগুদামে বিক্রির জন্য। তাকে ঐ ধান নিয়ে পুরো একদিন অপেক্ষার পর ফেরত দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, তার ধান পানিতে পুরোপুরি ডুবেনি বিধায় ঐ ধানে প্রচুর পরিমাণ চোয়া রয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে উপজেলা খাদ্যগুদাম কর্মকর্তা সুনীল দত্ত জানান সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ধান ক্রয় করা হচ্ছে।
হাজীগঞ্জ (চাঁদপুর) সংবাদদাতা শাখাওয়াত হোসেন শামীম জানান, হাজীগঞ্জ উপজেলায় সিন্ডিকেট চক্রের কারণে সরকারের গুদামে ধান বিক্রি করতে পারেনি প্রকৃত কৃষকরা। উপজেলার আলীগঞ্জ গ্রামের কৃষক কাজী ছফিউল্লাহ বলেন, ধান বিক্রি করতে গিয়ে গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও তার ধান নেয়নি।
ধান ক্রয়ে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রসঙ্গে খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (সংগ্রহ) ইলাহী দাদ খান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, যে পদ্ধতিতে ধান কেনা হচ্ছে তাতে অনিয়মের কোন সুযোগ নেই। তারপরও যেসব অনিয়মের কথা শোনা যাচ্ছে সে ব্যাপারে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেব।
