বিএনপির পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নোমানের

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০১৬, ১০:৫৯
বিএনপির সদ্য ঘোষিত কমিটিতে পদবঞ্ছনা, সিনিয়রদের অবনমন আর অনাহুতদের পদায়নের কারণে ক্ষোভ-হতাশা ক্রমশ: তীব্র হচ্ছে। ইতিমধ্যে দলের দীর্ঘদিনের অন্যতম সিনিয়র নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ক্ষোভ হতাশা এবং অপমানে বিদ্ধ নোমান শুধু পদ ছাড়া নয়, বিএনপির রাজনীতি থেকেও সরে দাঁড়াতে পারেন। তারমতই অবমূল্যায়নের শিকার চট্রগ্রাম বিএনপির আরেক কাণ্ডারী গোলাম আকবর খোন্দকারসহ দলের অনেকেই পদত্যাগের চিন্তা করছেন। গত কমিটিতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম আকবর খোন্দকারকে এবার দলের মূল কমিটিতে রাখা হয়নি। তাকে করা হয়েছে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা। এমন পরিস্থিতিতে অনেকে মনে করছেন আরেক দফা ভাঙনের মুখে পড়তে পারে বিএনপি। অনেকে কৌশল হিসাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার চিন্তা করছেন। সব মিলিয়ে মাঠের রাজনীতিতে বেকায়দায় থাকা দলটিতে দেখা দিয়েছে সংকট।
 
বিএনপির সবগুলো সূত্র বলছে, আবদুল্লাহ আল নোমান দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হতে প্রচণ্ড আগ্রহী ছিলেন। তিনি এই পদ পাবেন-এমন জোরালো আলোচনাও ছিল সর্বত্রই। দলের হাইকমান্ডও তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু তাকে চরমভাবে আশাহত করে আবারো ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়েছে। তাঁর পরিবর্তে রাজনীতিতে নোমানের নবীন চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সাবেক সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদকে বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে নতুন মুখ হিসেবে জায়গা করে দেয়া হয়েছে। তাঁরা দুজনই নোমানের মতই বৃহত্তর চট্টগ্রামের বাসিন্দা। পরপর দুবার প্রত্যাশিত পদ না পেয়ে নোমান নিরাশ হয়েছেন। এর আগে ২০০৯ সালেও নোমান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হতে পারেন বলে দলে আলোচনা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়েছিল। নোমানকে এভাবে বঞ্চিত করায় নোমানের অনুসারী নেতা-কর্মীরাও প্রচণ্ড হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তারা তাঁকে দল ছাড়ার জন্যও চাপ দিচ্ছেন।
 
এব্যাপারে দীর্ঘদিনের রাজনিতিতে অভিজ্ঞ আবদুল্লাহ আল নোমান ইত্তেফাককে বলেন, বিভিন্ন এলাকা থেকে কর্মীদের চাপ আছে। এমন কি তারা বলছেন, রাজনীতি থেকে রিজাইন করেন। এসব নেতাকর্মীরা বলছে - এটা তাদের ইমোশন, তাদের বক্তব্য। আমি ব্যক্তিগতভাবে এখনো সিদ্ধান্ত নেইনি। আমি যে পদে আছি এই পদে আর থাকতে চাই না। দেখি কি হয়? 
 
দলীয় প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাত্ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কমিটি ঘোষণার আগে গুলশানের বাসায় একটি মিটিংয়ে দেখা হয়েছে। কমিটির ঘোষণার পর কোনো আলোচনা হয়নি। নিজস্ব উদ্যোগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনাও নেই বলে জানান তিনি। 
 
তিনি বলেন, দীর্ঘ দিন রাজনীতিতে আছি। আমার সমর্থকরা ক্ষুব্ধ। তারা প্রচণ্ডভাবে আশাহত হয়েছেন। নেতাকর্মীরা মনে করেছিল আমি স্ট্যান্ডিং কমিটিতে যাচ্ছি। কিন্তু এটা না হওয়াতে তারা আশাহত হয়েছে, কষ্ট পাচ্ছে। শুধু আমার আনুসারীরা নয়, সারা দেশের অনেক বিএনপি নেতাকর্মী ফোন করে কান্নাকাটি করেছে।
 
এদিকে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করার চিন্তা করছেন গোলাম আকবর খোন্দকার। নতুন কমিটিতে নিজের পদ দেখে হতাশ হয়েছেন বিএনপির সাবেক এই সাংগঠনিক সম্পাদক। গোলাম আকবর খন্দকার বলেন, পদত্যাগ করার জন্য তাঁর অনুসারী ও পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে তাঁর ওপর চাপ আছে। তিনি বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করছেন।
 
ইতিমধ্যে গত শনিবার বিএনপির নির্বাহী কমিটি ঘোষণার পরপরই ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে ভাইস চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেন মোসাদ্দেক আলী ফালু। একই দিন নিজের নাম প্রত্যাহার করার আবেদন জানিয়ে চিঠি দেন সহপ্রচার সম্পাদকের পদ পাওয়া শামীমুর রহমান। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন মোসাদ্দেক আলী কাংখিত পদ না পেয়ে পদত্যাগ করেছেন বলে মনে হয়েছে।
 
নেতাদের অনেকের অভিযোগ, নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে বিএনপির চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাস, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের প্রভাব কাজ করেছে। ফলে তাঁদের অনুসারীরা ভালো পদ-পদবি পেয়েছেন। অপর দিকে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা, আবদুল্লাহ আল নোমানসহ এ ঘরানার নেতারা হয়েছেন কোণঠাসা।
 
দলের একজন সিনিয়র নেতা ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, নতুন কমিটিতে নেতাদের সিনিয়রিটি ভঙ্গ করা হয়েছে। অনেক নেতার স্ত্রী, ছেলেমেয়ে, পুত্রবধূ, ভাইও কমিটিতে পদ পেয়েছেন। 
 
দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের বেশ কজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা, আবদুল্লাহ আল নোমান, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, হাফিজ উদ্দিন আহমদ, খন্দকার মাহবুব হোসেন, আবদুল আউয়াল মিন্টু, বিশেষ সম্পাদক আসাদুজ্জামান (রিপন) এবং গত কমিটির যুগ্ম মহাসচিব আমান উল্লাহ ও মিজানুর রহমান (মিনু), আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নাজিম উদ্দিন আলম (নতুন কমিটিতে সদস্য), সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম আকবর খোন্দকার ও মশিউর রহমান, প্রচার সম্পাদক জয়নুল আবদিন ফারুক, সহদপ্তর সম্পাদক আবদুল লতিফ (জনি) প্রমুখ নতুন কমিটিতে তাঁদের অবনমন দেখে অসন্তুষ্ট বা ক্ষুব্ধ।
 
জানা গেছে, পদ পাওয়ার পরও যেমন অনেকে ক্ষুব্ধ হয়েছেন; আবার পদ না পেয়ে রাজনীতি ছাড়ার চিন্তা করছেন কেউ কেউ। এমন একজন বিএনপির সাবেক সহপ্রচার সম্পাদক মহিউদ্দিন খান মোহন। তিনি কমিটি ঘোষণার পরপর শনিবার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘গুডবাই বিএনপি, গুডবাই। বিদায়।
 
বিএনপি চেয়ারপার্সনের অন্যতম পরামর্শক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কমিটি নিয়ে সন্তুস্ট নন। তিনি বলেন, যারা বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে সম্পদ রক্ষার জন্য আন্দোলনে নিষ্ক্রিয় ছিলেন, তারাই বিএনপির নতুন কমিটিতে জায়গা পেয়েছেন। তাদের অনেকের আত্মীয়-স্বজনের জায়গা হয়েছে। ফলে বিগত আন্দোলনের মতো সামনের কর্মসূচিগুলোতেও এসব নেতারা নিষ্ক্রিয়ই থাকবেন। আবারও তাদের ক্ষমতাসীনদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে দেখা যাবে। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, জনস্বার্থের কোনো কর্মসূচি দেয়া হলেও তা সফল হবে না। কারণ এ দলে কেউ সক্রিয় নন। শুধু পদ পাওয়ার জন্য দলের নেতারা সক্রিয় থাকেন, কিন্তু কর্মসূচি পালনের জন্য তাদের সক্রিয় হতে দেখা যায় না।
 
লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমানের বলেন, দলের স্থায়ী বা নির্বাহী কমিটি আরও সুন্দর হওয়া উচিত ছিল। যারা দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন বা করার জন্য প্রস্তুত সে ধরনের নেতাদের স্থান দেয়া উচিত ছিল।
 
রিজভীর আশ্বাসে পদ না পাওয়া নেতাদের সংবাদ সম্মেলন স্থগিত
 
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদের আশ্বাসে বিএনপির সহযোগী সংগঠন ঐক্য পরিষদের পূর্ব ঘোষিত সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে। গত ৬ আগস্ট বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির যে পূর্নাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেছে তাতে সহযোগী সংগঠনগুলোকে কোনো মূল্যায়ন করা হয়নি এই অভিযোগ তুলে সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বিএনপির ২৫টি সহযোগী সংগঠন।
 
কমিটি পুনর্বিবেচনার সুযোগ নেই : ফখরুল
 
বিএনপির সদ্য ঘোষিত কমিটি পুনর্বিবেচনার কোন সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একইসঙ্গে বাদপড়া যোগ্য নেতাদের বিভিন্ন উপকমিটিতে জায়গা দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। সোমবার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কমিটি নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ককে অনভিপ্রেত উল্লে­খ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দলের কমিটি সেই দলেরই ব্যাপার। এখানে অন্য দলগুলোর প্রতিক্রিয়া বা অন্য কোন ব্যক্তির প্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। এ ব্যাপারে ধৈর্য্য ধরতে হবে। সব সময়ই পরবর্তী একটা বিষয় থাকে।’ তিনি বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি বা কেউ যদি মনে করি, আমি বঞ্চিত হয়েছি, তাহলে উচিত্ হবে, অপেক্ষা করা পরবর্তী কাউন্সিলের জন্য।’