একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর অন্যদিকে মানবসৃষ্ট দুর্যোগের কারণে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে সুন্দরবনের আদলে সৃষ্ট বরগুনার উপকূলের সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলগুলো। তীব্র ভাঙনের কবলে পড়ে প্রতিদিনই সাগরে তলিয়ে যাচ্ছে বনের গাছ, কমছে আয়তন। এসব বন রক্ষা করতে না পারলে দক্ষিণাঞ্চলে চরম প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শঙ্কা জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় এই মুহূর্তে ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না বলে জানালেন বন রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।
বন বিভাগের তথ্য মতে, ১৯৬০ সালে ১৩ হাজার ৬৪৭ দশমিক ৩ একর আয়তনের টেংরাগীরি বনকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করে তত্কালীন পাকিস্তান সরকার। গত প্রায় ছয় দশকে সেই বনের আয়তন না বেড়ে উল্টো সাগরে বিলীন হয়েছে দুই হাজার একরেরও বেশি এলাকা। নিশ্চিহ্ন হয়েছে প্রায় দশ লাখ গাছ। একদিকে সাগরের তীব্র ভাঙন আর অন্যদিকে বনদস্যুদের অবাধে গাছ কাটার কারণেই হুমকির মুখে পড়েছে উপকূলীয় এলাকার বনাঞ্চল।
পরিবেশ আন্দোলন বরগুনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মুশফিক আরিফ বলেন, একদিকে সাগরের তীব্র ভাঙন আর অন্যদিকে বনদস্যুদের অবাধে গাছ কাটার কারণেই উপকূলীয় এলাকার বনগুলোর অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। আর এ দায় বন বিভাগের এড়ানোর সুযোগ নেই।
উপকূলীয় এলাকার সংরক্ষিত বনরক্ষা কমিটির সভাপতি হাছান ঝন্টু বলেন, বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা বনদস্যুদের কাছে বনের গাছ বিক্রি করে দিচ্ছেন স্বল্পমূল্যে। যার একাধিক প্রমাণ রয়েছে সাধারণ জনগণের কাছেও। এমনকি সংরক্ষিত বনের গাছ বিক্রি করার সময় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে বন রক্ষীরা। এমন ঘটনাও নতুন নয়। তবে বন বিভাগের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদাসীনতার কারণেই বন কাটা হচ্ছে অবাধে।
অন্যদিকে বন কর্মকর্তারা জানান, পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় এই মুহূর্তে ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। জনবল সংকটের কারণে অনেক চেষ্টা করেও গাছ কাটা থামানো যাচ্ছে না। তবে বন রক্ষায় নানা উদ্যোগের কথাও জানান তারা। টেংরাগীরি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বিট কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন প্রামাণিক বলেন, আসলে এটা তো অনেক বড় প্রজেক্ট, হাজার হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন। আমাদের মন্ত্রণালয়গুলোতে এত টাকার প্রজেক্ট পাস হয় না। তাই সরকারিভাবে বড় প্রকল্প নেওয়া উচিত।
বরগুনা সদরের রেঞ্জ কর্মকর্তা মতিয়ার রহমান বলেন, যেখানে বন ভেঙে যাচ্ছে প্রাকৃতিক কারণে সেখানে শেল্টার বেল্ট স্বরূপ আমরা চরে বনায়ন করছি। সমুদ্রে সাইক্লোন আসলে এগুলো প্রতিরোধ করবে। আমাদের লোকবল কমের কারণে এতবড় বনভূমি রক্ষায় কষ্ট হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
এ বিষয় বরগুনা সরকারি কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞানের বিভাগীয় প্রধান সৈয়দ শাহ আলম বলেন, সমুদ্রতলের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় সমুদ্রের পানির সঙ্গে পলিমাটি যুক্ত জোয়ারের পানি প্রবেশ করছে বনের মধ্যে। তাই ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছের শ্বাসমূল দীর্ঘ সময় ঢেকে থাকার কারণে অনেক গাছ মারা যাওয়ায় ভাঙনের তীব্রতা বেড়ে গেছে। এগুলো সংরক্ষণ করতে না পারলে বায়োডাইভারসিটি হারিয়ে ফেলব। নতুন গাছ লাগাতে হবে, ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে আমরা বড় দুর্যোগ ঠেকাতে না পারলেও ছোটগুলো পারব।
বরগুনা উপকূলে প্রায় ১০ হাজার একর জমিতে নতুন করে বনায়নের কাজ শুরু করেছে বন বিভাগ।
