কুড়িগ্রামের রৌমারীর সাহেবের আলগা সীমান্তের আন্তর্জাতিক মেইন পিলার নং- ১০৫২ এর কাছ দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের বানের পানিতে ভেসে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে চরবাগুয়ার চর নামক এলাকায় আটকা পড়ে একটি বুনো হাতি। ভারতের আসাম রাজ্যের শিশুমারা পাহাড়ি এলাকার ওই বুনোহাতিটি হঠাৎ দলছুট হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের স্রোতের কবলে পড়ে। নদের পানিতে ভাসতে ভাসতে বাংলাদেশে ঢুকে-এমনটাই ধারনা করা হচ্ছে বলে জানান আবুল কাশেম নামের এক সীমান্তবাসী।
বাংলাদেশে অভ্যন্তরে প্রবেশের পর রৌমারী, রাজীবপুর, দেওয়ানগঞ্জ, ফুলছরি, সাঘাটা, সারিয়াকান্দি, কাজিপুর, সরিষাবাড়ি ও মাদারগঞ্জ উপজেলার অধীনে ১৫টি চর ঘুরে প্রায় দুই শ কিলোমিটার জলপথ দিয়েছে। হাতিটির সর্বশেষ (১০আগস্ট পর্যন্ত) জামালপুরের সরিষাবাড়ি উপজেলার কামরাবাদ ইউনিয়নের সৈয়দপুর চরে নামক অবস্থান করছে। দীর্ঘ সময়ে সঙ্গীহীন হয়ে প্রয়োজনীয় খাবার ও জলের সঙ্গে লড়াই করে হাতিটি খুবই ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েছে।
২৮-৩০ জুন
২৮ জুন মঙ্গলবার সকাল সাতটার দিকে নদের বুকে কিছু একটা ভাসছে। ভারত থেকে মহিষ ভেসে এসেছে-এমন খবরে ব্যাপক উৎসাহ নিয়ে ছোট একটা নৌকায় ওই মহিষ ধরতে যায় সাহেবের আলগা চরের আনোয়ার হোসেন, বিনত মোল্লা, সিরাজুল ইসলাম ও সোনাউল্লাহ। কাছে ভিড়তে তাদের দিকে তেড়ে আসে হাতিটি। কোনো রকমে হাতির আক্রমণ থেকে জীবন নিয়ে ফিরে আসেন তারা। সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত হাতিটি চরবাগুয়ার চরেই অবস্থান করে। কিন্তু চরে খাবার না থাকায় চর ছাড়ার চেষ্টা করে নদের তীব্র স্রোতের কবলে পড়ে। সেখান থেকে ভাসতে ভাসতে প্রায় ১০কিলোমিটার দক্ষিণে একই উপজেলার খেড়ুয়ার চর নামক চরে আটকা পড়ে।
খেড়ুয়ার চরে খাবার ছিল না। তবে সারাদিন ওই চরেই অবস্থান করে রাতে স্রোতে ভেসে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে রাজীবপুরের নয়াচর বাজারের পশ্চিমে মধ্যপাড়া নামক চরে কাদায় আটকা পড়ে। এ সময় নয়াচর বাজার এলাকার হাজারো উৎসুখ জনতা ভিড় করে হাতিটি দেখার জন্য। নয়াচর মধ্যপাড়া চরের কাদা পানিতে আটকে যায়। সারাদিন এক স্থানেই দাঁড়িয়ে ছিল হাতিটি। রাতে প্রায় এক কিলোমিটার উজানে চড়াইহাটি নামক চরে ঢোকে।
১-৩১ জুলাই
চড়াইহাটি চরে প্রচুর কাশবন থাকায় খাবার হিসেবে তা বেছে নেয় হাতিটি। এখানে একটানা আটদিন অবস্থান করে হাতিটি। এ চরে কোনো জনবসতি ছিল না। রাতে আবার ছুটে যায় নয়াচর মধ্যপাড়া চরে। খুব ভোরে নয়াচর মধ্যপাড়া চরে হাতিটিকে দেখা যায়। এখানে দুই দিন অবস্থান করে। খাবার না পেয়ে রাতে দক্ষিন বড়বেড় চরের জনবসতি হামলা করে একটি পরিবারের ঘর ভেঙ্গে ফেলে। কয়েকটি গাছও উপড়ে ফেলে। এ সময় মানুষের তাড়া খেয়ে আবার স্রোতে ভেসে যায়।
ওই রাতেই গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার এরেন্ডাবাড়ি নামক চরে অবস্থান নেয়। এখানে খাবার না থাকায় খাবারের খোঁজে জনবসতিতে ঢোকে। কিন্তু হাতি দেখে চরের মানুষ ভয়ে হাতিটিকে তাড়ানোর চেষ্টা করে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে হাতিটি মানুষের বাড়িঘরে আক্রমণ করে। এতে ১২ পরিবারের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এক পর্যায়ে রাতের অন্ধকার আগুন ও ঢোলের শব্দ করে হাতিটিকে তাড়িয়ে দেয় চরের মানুষ। এরেন্ডাবাড়ি চরের মানুষের তাড়া খেয়ে চরহাগড়া নামক চরে গিয়ে ওঠে। এ চরে জনবসতি ছিল না। কাশবন থাকায় এচরে দুইদিন অবস্থান করে হাতিটি। চরটি জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চুকাবাড়ি ইউনিয়নের অধীনে। গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের পাতিল তলা চরে আটকে পড়ে। এখানে কোনো খাবার ছিল না। যে কারণে সারাদিন অবস্থানের পর রাতে ছুটে চলে অন্য চরের দিকে।
বগুড়ার সারিয়াকান্দির হরিরামপুর কাশিয়া বাড়ি নামক চরে গিয়ে ওঠে হাতিটি। রাতের বেলায় জেলেরা হাতিটিকে প্রথমে দেখে ভয় পেয়েছিল। সকালে হাতি দেখার জন্য অসংখ্য নৌকায় উৎসুক জনতা ভিড় করে। চরে কাশবন অন্যদিকে কলাগাছ খাবার পেয়ে শেষ পর্যন্ত হাতিটি ওই চরেই অবস্থান করে। পরে এ চর থেকে ১৩ কিলোমিটার দক্ষিণে কাজিপুর উপজেলার মুনসুর নগর ইউনিয়নের ছিন্নার চরে গিয়ে ওঠে। এরপর হাতিটি খাসরাজবাড়ী ইউনিয়নের গোদারবাগ চর হয়ে আবার ছিন্নার চরের একটি পাটক্ষেতে উঠে আসে।
হাতিটি ছিন্নারচর ছেড়ে যমুনা নদী সাঁতরে ১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে নাটুয়ারপাড়ার ৭৫ নম্বর চরে আশ্রয় নেয়। পরের দিন একই উপজেলার উত্তর দিকে যুক্তিগাছা নতুন চরে অবস্থান নেয়। এখান থেকে গভীর রাতে জামালপুরের সরিষাবাড়ীর সাতপোয়া ইউনিয়নের লোকালয়ে ঢোকে। পরে হাতিটি সাতপোয়া ইউনিয়নের চর রৌহা, নান্দিনা ও ছাতারিয়া এলাকা ঘুরে কামরাবাদ ইউনিয়নের শুয়াকৈর গ্রামে অবস্থান নেয়।
১-১০ আগস্ট
১ আগস্ট থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত হাতিটি সরিষাবাড়ী উপজেলার সাতপোয়া ইউনিয়নের জনবহুল চুনিয়া পটল গ্রাম, মাদারগঞ্জ উপজেলার জোড়খালী ইউনিয়নের দুর্গম ফুলারপাড়া গ্রাম, ঝালোপাড়ার আখক্ষেত, ভাটারা ইউনিয়নের কৃষ্টপুর গ্রাম, কামারবাদ ইউনিয়নের পপুলার জুট মিল এলাকা ঘুরে বেড়ায় জামালপুরের অধীনে এচর ওচর ঘুরে বেড়ায়। চারপাশে বন্যার পানি থাকায় হাতিটিকে অজ্ঞান করা যাচ্ছিল না। এরমধ্যে একটা পোষা হাতি নিয়ে আসা হয় চর ভাটিয়ানী গ্রামে। পোষা হাতির পিঠে চড়ে কর্মকর্তারা ট্যাংকুলাইজার গান দিয়ে বুনো হাতিটিকে অজ্ঞান করতে গেলে বুনো হাতির তাড়া খেয়ে ফিরে আসে পোষা হাতি।
১১ অাগস্ট
এই ৪৫ দিনে হাতিটি প্রায় ৮০০ কিলোমিটার জলপথ পাড়ি দেয়। ১১ আগস্ট বৃহস্পতিবার ট্যাংকুলাইজার গান দিয়ে বুনো হাতিটিকে অজ্ঞান করা হলে পানিতে পড়ে যায় হাতিটি। পড়ে স্থানীয়দের সহায়তায় হাতিটিকে লোহার শিকলে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হাতিটিকে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে নিয়ে যাওয়া হবে।
IMG0উদ্ধার সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
বন্য প্রাণি পরিদর্শক অসীম মল্লিক বলেন, ট্যাংকুলাইজার গান দিয়ে বুনো হাতিটিকে অজ্ঞান করা হলে এটি পানিতে পড়ে যায়। স্থানীয়দের সহায়তায় হাতিটিকে পানি থেকে শুকনো জায়গায় তোলা হয়।
তিনি বলেন, হাতিটি এখন বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে রাখা হবে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে তারা হাতিটি নিয়ে যাবে কিনা।
এ সময় চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ কর্মকর্তা অশিত অঞ্জন পাল জানান, বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের প্রাণি বিশেষজ্ঞ ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ও ময়মনসিংহ বিভাগের বন কর্মকর্তা গোবিন্দ রায়সহ ১৭ সদস্যও প্রকটি প্রতিনিধি দল উপস্থিত ছিলেন।
ইত্তেফাক/এএসএমইউ
