মানুষের দেহের একটি অত্যাবশ্যকীয় অঙ্গ হচ্ছে ফুসফুস। প্রতিটি মানব দেহে লালচে বাদামি রঙের এই অঙ্গটি থাকে। এটি সাধারণত এক জোঁড়া হয়ে থাকে। মানব দেহের গুরুত্বপূর্ণ এই অঙ্গের সাহায্যে মানুষ শ্বাস প্রশ্বাস নিতে পারে। এই অঙ্গদ্বয়ের অবস্থান হচ্ছে হূদপিণ্ডের দুই পাশে। ইংরেজি তে এর নাম হচ্ছে লাংস। পেটের উপরে বুকজুড়ে এর অবস্থান। মানব দেহের এই ফুসফুসটি বিভিন্ন
কারণে নানা রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে থাকে। ফুসফুসের ফোঁড়া সৃষ্টি হওয়া বক্ষের একটি দীর্ঘকালীন ব্যাধি। নানা ধরণের রোগ জীবাণুর কারণে ফুসফুসে ফোঁড়ার উদ্ভব হয়। মানুষের ত্বকের ফোঁড়া হওয়া এবং ফুসফুসে ফোঁড়া হওয়ার মধ্যে অনেক পার্থক্য। কারণ ত্বকে ফোঁড়া হলে তেমন জটিলতার সৃষ্টি হয় না, কিন্তু ফুসফুসে ফোঁড়া হলে তা খুব মারাত্মক আকার ধারণ করে। এ রোগ সৃষ্টির একটি জীবাণুর নাম হল- স্টেফাইলোকক্কাস। এই জীবাণুর দ্বারা সৃষ্ট ফোঁড়ার সংখ্যা সাধারণত বেশি হয়ে থাকে। ফুসফুসের ফোঁড়া একটি জীবাণু ঘটিত রোগ। বিবিধ বক্ষব্যাধির জীবাণুর সংক্রমণের ফলে এরোগ হয়ে থাকে।
যে সকল ব্যাধির কারণে
ফুসফুসে ফোঁড়ার সৃষ্টি হয়:-
lযক্ষ্মা হচ্ছে একটি জীবাণু
জনিত ব্যাধি। জীবাণু সংক্রমণের দ্বারা এই ব্যাধির উপক্রম হয়। ফুসফুসে ফোঁড়া সৃষ্টি হবার একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে যক্ষ্মার জীবানু।
lমানব দেহের ফুসফুসে যদি ক্যান্সার বা টিউমার হয়, তবে
সেই ক্যান্সার ও টিউমারের স্থানে জীবাণু দ্বারা ফুসফুসে ফোঁড়া হয়ে থাকে।
lফুসফুসের নিউমোনিয়া মারাত্মক আকার ধারণ করে ফুসফুসে ফোঁড়ার সৃষ্টি করতে পারে।
lলিভারের আমাশয়ের জীবাণু থেকেও ফুসফুসে ফোঁড়া হয়।
ফুসফুসে ফোঁড়ার কারণে যে
সমস্ত উপসর্গসমূহ লক্ষণীয়:
lমানুষের শরীরে এ রোগের উপক্রম হয় ধীরে ধীরে।
lএ ব্যাধির প্রথম উপসর্গ হচ্ছে প্রচণ্ড জ্বর আসা,শরীর ম্যাজম্যাজ করা, অসহনীয় কাশি হওয়া।
lকাশির সাথে রক্ত এবং
হলুদ, পাকা ও দুর্গন্ধযুক্ত কফ
নির্গত হওয়া ও বুকে খুব ব্যথা হওয়া।
lরক্তে শ্লেত কণিকার পরিমাণ বেড়ে যাওয়া
lক্লাবিং অর্থাত্ রোগীর আঙ্গুলের ডগা ফুলে যাওয়া।
ফুসফুসের কোন স্থানে পচন ধরলে সে স্থানে ফোঁড়ার সৃষ্টি হয়। ফুসফুসের এই ফোঁড়ার পাতলা আবরণ যদি কোন কারণে ফেটে যায়, তবে তা
থেকে ফুসফুসে অন্য রোগের সৃষ্টি হয় যেমন-ফুসফুসে বাতাস এবং পুঁজ জমা। ত্বকে ফোঁড়া হলে এর কারণ নির্ণয় করে চিকিত্সা করা চিকিত্সদের নিকট কঠিন ব্যাপার নয়। কিন্তু
ফুসফুসে ফোঁড়া হলে তার কারণ
নির্ণয় করে চিকিত্সা করা একটু জটিল ব্যাপার। যক্ষ্মা ও এ রোগের উপসর্গের সাথে অনেক মিল লক্ষ্য করা যায়। তাই এ সকল রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিত্সকদের সর্বপ্রথম করণীয় হচ্ছে সঠিক পরীক্ষা নিরীক্ষা
করে নিশ্চিত হওয়া যে কোন রোগের জীবাণুর সংক্রমণের ফলে ফুসফুসে ফোঁড়ার সৃষ্টি হয়েছে। বুকের এক্সরের
মাধ্যমে সাধারণত এ ব্যাধিটি নির্ণয় করা হয়। রক্ত ও কফ পরীক্ষার দ্বারা এ রোগটি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। এছাড়া চিকিত্সকগণ কখনও
কখনও ব্রংকোস্কোপের দ্বারাও এ
রোগ নির্ণয় করে থাকেন। আলট্রাসনোগ্রাম, সিটিস্ক্যান ও এফএনএসির মাধ্যমেও এ রোগ নির্ণয় করা যায়। ফুসফুসে ফোঁড়ার চিকিত্সা
ব্যবস্থা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি। এ ব্যাধিটি নিরাময়ের জন্য রোগীকে দীর্ঘদিন এন্টিবায়োটিক সেবন করতে হয়। এক্ষেত্রে চিকিত্সকগণ রোগীকে বুকে জমে থাকা বিষাক্ত কফ বের
করবার চেষ্টা করে থাকেন। কারণ ওষুধ সেবনের পাশাপাশি এই পাকা কফ রোগীর দেহ থেকে নির্গত
না হলে ওষুধ সেবনে কাজ হবে না। ফিজিওথেরাপি অনেক ক্ষেত্রে চিকিত্সার সহায়ক হিসেবে কাজ করে থাকে। পুস্সুরাল ড্রেনেজ এ ক্ষেত্রে
অনেক উপকারী।
অধ্যাপক ডাঃ একেএম, মোস্তফা হোসেন
বক্ষব্যাধি ও এজমা বিশেষজ্ঞ
চেম্বার:ইউনাইটেড হাসপাতাল, গুলশান-২, ঢাকা
