কয়েক মাস পরই নতুন বছর শুরু হতে যাচ্ছে। আপনার সন্তান কি চার বছর অতিক্রম করেছে? শহরের বাবা-মা সন্তানের বয়স চার বছর হলেই তাকে স্কুলে ভর্তি করে দেন। যদিও গ্রামাঞ্চলে এত অল্প বয়সে শিশুদের স্কুলে যেতে বেশি দেখা যায় না। চার বছরের মধ্যে শিশুকে স্কুলে দিতে চাইলে এখনই প্রস্তুতি শুরু করতে হবে।
শিশুকে প্রথম স্কুলে ভর্তি করানোর সময় এগিয়ে আসতে শুরু করলে সব বাবা-মায়েরই দুশ্চিন্তা ও ভয় বাড়তে থাকে। তবে আপনার সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করানোর পূর্বে কিছু পদক্ষেপ বা পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ করলে দুশ্চিন্তা ও ভয় অনেকটা কমে যায়। শিশুকে প্রথমবার স্কুলে পাঠানোর আগে দরকার কিছু পূর্ব প্রস্তুতির। তাই আসুন, জেনে রাখা যাক শিশুকে প্রথম স্কুলে দেয়ার আগে কী কী প্রস্তুতি নেয়া উচিত।
সন্তানকে প্রথম স্কুলে ভর্তি করাতে কিছুটা সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ, স্কুলে ভর্তির পর এ বয়সী শিশুদের ওপর বাড়তি চাপ যেন না পড়ে। স্কুলে ভর্তির পর প্রথমেই তাকে কিছু নিয়মকানুনের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। প্রথম যেটা প্রয়োজন তা হলো তাকে সকালে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করতে হবে। অনেক শিশুই সকালে ঘুম থেকে উঠতে চায় না। যে স্কুলে শিশুকে ভর্তি করাতে হবে সেই স্কুলের সঙ্গে কমবেশি পরিচিত করাতে পারলে ভালো হয়।
যেমন- স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের সময় বাবা-মার সঙ্গে শিশুকে স্কুলে নিয়ে যেতে হবে। স্যার, ম্যাডামদের সঙ্গে পরিচয় করে দিতে হবে, সম্ভব হলে স্কুলের চারপাশের পরিবেশ বা খেলাধুলার সরঞ্জাম দেখানো যেতে পারে। এতে শিশুর মনে স্কুল নিয়ে ভয় বা উৎকণ্ঠা অনেকটাই কেটে যাবে।
IMG0
বোঝার চেষ্টা করুন সে কোন দিকে মনযোগ দেয়। শিশুর মাঝে যদি গল্প শোনার ঝোঁক থাকে তাহলে তাকে পাশে নিয়ে কোনো একটি বই থেকে শিশুকে মজার মজার গল্প পড়ে শোনান। এ ক্ষেত্রে গল্পগুলো যদি শিশুর ভালো লাগে তাহলে সে নিজেও গল্প পড়ার জন্য কীভাবে বানান করে পড়তে হয় তা শিখতে আগ্রহী হবে।
আপনি নিজেই শিশুর পড়ালেখার বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন কিনা খেয়াল করুন। শিশুর লেখাপড়া শেখার জন্য পরিবেশও অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আপনি তাকে পড়তে বলে নিজে টিভি দেখতে বসে যাবেন এমনটা যেন কখনোই না হয়, বরং শিশুর পাশে থেকে তাকে বুঝান যে, পড়ালেখার এই সময়টাকে আপনিও গুরুত্বের সঙ্গেই নিচ্ছেন এবং তার পাশেই আছেন।
সাধারণত অধিকাংশ শিশুর ক্ষেত্রেই পড়তে শেখার প্রক্রিয়াটি যত দ্রুত এগোয় ঠিক ততটা দ্রুততার সাথে লেখা শেখার বিষয়টি এগোয় না। এ ক্ষেত্রে অনেক বাবা-মা'ই একেবারে প্রথম দিন থেকেই শিশুর হাতে চক বা পেন্সিল তুলে দিয়ে তাকে লেখা শেখানোর চেষ্টা করেন। তবে চক বা পেন্সিল হাতে দেয়ার আগে শিশুকে যদি বিভিন্ন খেলার সামগ্রী দিয়ে বা ছোট ছোট খেলনা দিয়ে বর্ণমালা তৈরি করতে শেখান তবে তার প্রাথমিক ভিত্তিটা সহজেই তৈরি হয়ে যাবে।
IMG1
স্কুলে দেয়ার আগে প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে শিশুকে বর্ণমালা, কিছু ছড়া ও সাধারণ জ্ঞান বিষয়ে শিখিয়ে নিতে হবে। আজকাল বাজারে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষণীয় খেলনা, লোগোর বর্ণমালা, শব্দের সঙ্গে মিল করে বিভিন্ন ফল, ফুল ও জীবজন্তুর ছবি সংবলিত বই পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে শিশুরা প্রাথমিক লেখাপড়া শিখতে উৎসাহী হতে পারে। শিশুকে লেখাপড়ায় উদ্বুদ্ধ করতে সামর্থ্য অনুযায়ী আকর্ষণীয় স্কুলব্যাগ, পেন্সিল বক্স, স্কেল, পেন্সিল কাটার, রাবার, টিফিন বক্স, ছবি আঁকার সরঞ্জাম, পানির পট ইত্যাদি দিতে হবে। এতে শিশুর স্কুলে যাওয়ার প্রতি আগ্রহ বাড়বে।
সবকিছু অনেক দামি হতে হবে তা নয়। আমাদের দেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত কমদামেও ভালো জিনিস পাওয়া যায়। শিশুরা যেন রুটিন দেখে নিজের বই, খাতাসহ ব্যাগ নিজেই গুছিয়ে নিতে পারে, সেভাবে তার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ক্লাস শুরুর আগে তার প্রস্তুতি সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। হাত-মুখ ধোয়া, নাস্তা খাওয়া, স্কুল ড্রেস পরার জন্য নির্ধারিত সময় রাখতে হবে। পাশাপাশি বাবা-মাকে শিশুর আগেই ঘুম থেকে উঠে তৈরি হতে হবে।
পড়া, খাওয়া, খেলার সময় সবকিছু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে করার অভ্যাস এখন থেকেই গড়ে তুলতে হবে। স্কুলে যাওয়ার পর শিক্ষক ও সহপাঠীদের মধ্যে যদি শিশুর সুসম্পর্ক তৈরি করার সুযোগ করে দেয়া যায় তাহলে শিশুর স্কুলে যাওয়ার প্রতি উৎসাহিত হবে। সম্ভব হলে স্কুল সময়ের পরে বাবা-মা ক্লাসের শিক্ষকদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে পারেন। শিশুর আচরণ কেমন, কীভাবে তাকে বুঝালে ভালোভাবে বুঝবে সেটা শিক্ষককে বলতে হবে।
IMG2
টিফিনের সময় স্কুলের অন্য শিশুদের সঙ্গে স্কুল চত্বরে মেলামেশা ও খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুর মধ্যে সামাজিকতা গড়ে ওঠে। স্কুল যে শুধু লেখাপড়ার জন্য নয়, এখানে খেলাধুলা ও বন্ধুদের সঙ্গে মজাদার গল্প ও আনন্দ করার জায়গা সেটাও যেন শিশুরা অনুভব করতে পারে। সে বিষয়টি স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং অভিভাবকের নিশ্চিত করতে হবে। অভিভাবকদের একটু স্নেহ, ভালোবাসা বা শিশুর ভালো কাজের জন্য পুরস্কার প্রদান করতে হবে। ভালো কাজ করার প্রতি তাকে উৎসাহ ও প্রেরণা দিতে হবে। যেমন- অবসরে ছবি আঁকা, খেলাধুলা করা এবং শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান দেখার অভ্যাস করাতে হবে।
ছুটির দিনে বাবা-মার উচিত শিশুর সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা সুন্দর ও দর্শনীয় স্থান থেকে ঘুরে আসা। এতে শিশুর মানসিক প্রশান্তি বাড়বে। শিশুকে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার অভ্যাস করতে হবে। বাইরের খোলা খাবার না খেয়ে বরং বাসার তৈরি খাবার খেলে সুন্দর ও সুস্থ থাকা যায় এ বিষয়ে তাকে অনুপ্রাণিত করতে হবে। খাবার আগে অবশ্যই হাত ভালোভাবে ধোয়ার অভ্যাস করতে হবে। শিশুকে চাপ দিয়ে শেখানোর চেষ্টা করা যাবে না। এতে তার মনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যা তার স্বাভাবিক লেখাপড়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
স্কুলের যে প্রথম হয় তার সঙ্গে তুলনা না করে বরং বলতে হবে তুমি ইচ্ছা করলে অন্যদের মতো ভালো ফল করতে পার। পরিবার থেকেই শিশুকে নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। শিশুদের দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
শিশুকে ছবি আঁকার অভ্যাস ছোটবেলা থেকেই গড়ে তুলতে হবে। এতে তার মধ্যে সৃজনশীলতা ও মেধা দুটোই বাড়বে। শিক্ষার সঙ্গে আনন্দ না থাকলে সে শিক্ষা অর্থবহ হয় না। বর্তমান সরকার শিক্ষার সঙ্গে আনন্দযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ইত্তেফাক/কেকে
