কোনো পুরুষের স্ত্রী, সন্তান ও ভরা সংসার রয়েছে জানার পরও কোনো তরুণী তার প্রতি আকর্ষিত হয়ে পড়তে পারেন। বাইরে থেকে বিষয়টি সহজ মনে হলেও এর পেছনে একাধিক মানসিক, সামাজিক ও সম্পর্কগত কারণ কাজ করতে পারে।
শুরুতেই এটি পরিষ্কার করা জরুরি যে সব তরুণী বয়স্ক বা বিবাহিত পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হন না, আবার বয়সের ব্যবধান থাকলেই সব সম্পর্ক একই ধরনের হয় না। গবেষণায়ও এমন কোনো একক কারণ পাওয়া যায়নি, যা দিয়ে এ ধরনের সম্পর্ককে সার্বজনীনভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।
পরিণত ও আত্মবিশ্বাসী পুরুষের প্রতি আকর্ষণ:
বয়সে বড় কোনো পুরুষের অভিজ্ঞতা, আত্মবিশ্বাস, সামাজিক অবস্থান বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তরুণীর কাছে বেশ আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। বিশেষ করে জীবনের কোনো অনিশ্চিত বা জটিল সময়ে একজন স্থির, মনোযোগী ও অভিজ্ঞ মানুষকে তুলনামূলক নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য মনে হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া বিভিন্ন গবেষণায় বয়সের ব্যবধানযুক্ত সম্পর্কে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের ভূমিকার কথাও উঠে এসেছে।
উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালে ‘সেক্সুয়াল অ্যান্ড রিলেশনশিপ থেরাপি’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, তরুণী ও বয়স্ক পুরুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সুবিধা বা আর্থিক স্থিতিশীলতার ধারণাটি বেশ জোরালোভাবে কাজ করে। তবে সীমিত নমুনা ও অনলাইনভিত্তিক হওয়ার কারণে এই গবেষণাকে সব সম্পর্কের ক্ষেত্রে শতভাগ প্রযোজ্য বলা চলে না।
মনোযোগ ও বিশেষ অনুভূতির অভাব পূরণের চেষ্টা:
সম্পর্কের ক্ষেত্রে কেবল বয়স নয়, মানুষটির আচরণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন বয়স্ক পুরুষ যদি নিয়মিত খোঁজখবর নেন, মন দিয়ে কথা শোনেন, প্রশংসা করেন কিংবা বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়ান, তবে সেই মনোযোগ ধীরে ধীরে গভীর আবেগে রূপ নিতে পারে। বিবাহিত পুরুষের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে।
তার পূর্বের সংসার থাকার কারণে সম্পর্কটি শুরু থেকেই সীমাবদ্ধ ও গোপনীয়তার চাদরে ঘেরা থাকে। নিয়মিত গোপন যোগাযোগ, সাক্ষাৎ এবং ‘আমাদের বিষয়টি অন্য কেউ জানে না’—এমন পরিস্থিতি অনেক সময় আবেগকে আরও তীব্র করে তোলে। তবে একে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত কোনো ‘পরকীয়ার সূত্র’ হিসেবে গণ্য করা যায় না।
বয়সের ব্যবধান ও আকর্ষণের বৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপট:
বয়সের ব্যবধানযুক্ত সম্পর্ক সমাজে কোনো বিরল ঘটনা নয়। ২০২৪ সালে ইউরোপের ২৯টি দেশের প্রায় ৩৬ হাজার দম্পতির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পুরুষের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের সঙ্গীর বয়স কিছুটা কম হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের আরেকটি বড় গবেষণায় দেখা গেছে, প্রথম দেখায় নারী ও পুরুষ উভয়েই নিজেদের তুলনায় কিছুটা কম বয়সী সঙ্গীর প্রতি আকৃষ্ট হন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, যৌনসঙ্গী হিসেবে নারীরা সাধারণত নিজেদের চেয়ে সামান্য বেশি বয়সী পুরুষ পছন্দ করলেও, পুরুষরা বয়স নির্বিশেষে বিশোর্ধ্ব নারীদের প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে থাকেন। ফলে ‘নারীরা স্বভাবতই কেবল বয়স্ক পুরুষ পছন্দ করেন’—এমন সরল কোনো সাধারণীকরণ করা সঠিক নয়।
সম্পর্ক গড়ার অন্যান্য অনুঘটক:
বয়সের পাশাপাশি মানসিক ঘনিষ্ঠতা, নিয়মিত যোগাযোগ, প্রশংসা, সামাজিক মর্যাদা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার ধারণাও এসব সম্পর্কে প্রভাব ফেলে। অনেক সময় সম্পর্কটি প্রেমের উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু হয় না; বরং বন্ধুত্ব, কর্মক্ষেত্রের সুসম্পর্ক, পরামর্শ নেওয়া কিংবা নিয়মিত আলাপচারিতা থেকে ধীরে ধীরে আবেগ তৈরি হয়। পাশাপাশি, বিবাহিত পুরুষের ক্ষেত্রেও দায়িত্ব কেবল একতরফা নয়। তিনি যদি নিজের বৈবাহিক অবস্থান গোপন রাখেন, অনুভূতির সুযোগ নেন বা সম্পর্কের গণ্ডি ইচ্ছাকৃতভাবে অতিক্রম করেন, তবে পরিস্থিতি তৈরিতে তাঁর ভূমিকাও সমানভাবে দায়ী।
সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদী সমীকরণ ও সতর্কতা:
বয়সের ব্যবধান নিজে থেকে কোনো সম্পর্ককে সফল বা ব্যর্থ করে তোলে না। তবে অস্ট্রেলিয়ার পারিবারিক তথ্যভিত্তিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বয়সে বড় এমন দম্পতিদের বৈবাহিক সন্তুষ্টি সময়ের সঙ্গে তুলনামূলক দ্রুত কমতে পারে এবং ৬ থেকে ১০ বছরের মধ্যে প্রাথমিক সন্তুষ্টির পার্থক্য অনেকখানি কমে যেতে পারে। এখানে ক্ষমতার ভারসাম্য একটি বড় বিষয়। বয়স, অর্থ, সামাজিক অবস্থান ও অভিজ্ঞতার বড় ব্যবধান কখনো কখনো সম্পর্কে একজনকে বেশি প্রভাবশালী করে তুলতে পারে, যা ২০২২ সালের একটি গবেষণায় তরুণ সঙ্গীর জন্য নেতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে বলে আলোচনা করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, স্ত্রী-সংসার আছে জেনেও কোনো বয়স্ক পুরুষের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হওয়াকে কেবল ‘বয়সের প্রতি দুর্বলতা’ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। ব্যক্তিত্ব, যোগাযোগ, পরিস্থিতি, প্রত্যাশা এবং সম্পর্কের অভিজ্ঞতার এক জটিল সমন্বয়ে মানুষের আবেগ তৈরি হয়। সম্পর্কটি বিবাহিত কারও সঙ্গে হলে আকর্ষণের পাশাপাশি সীমারেখা, সম্মতি, গোপনীয়তা এবং সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি দায়িত্বের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আত্মোপলব্ধি, মানসিক ও সামাজিক পরিস্থিতি এবং নিজের বিবেকের ওপর ভিত্তি করে চাইলেই এমন অসম সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।
সূত্র: গ্রাসিয়া ডেইলি ইউকে, দ্য গার্ডিয়ান

