গুলশানের হলি আর্টিজান ও শোলাকিয়া হামলার মূল পরিকল্পনাকারী জঙ্গীনেতা তামিম চৌধুরির নির্দেশে নরসিংদির মাধবদিতে ব্যবসায়ী চিত্তরঞ্জনের উপরে হামলা চালানো হয়। এর পরবর্তী টার্গেট ছিল নারায়ণগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এ বিষয়টি পুলিশ সদর দপ্তরের গোয়েন্দা ইউনিট নিশ্চিত হয়।
নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ার ভাড়া বাসায় বসে তামিম চৌধুরী নরসিংদির মাধবদিতে হামলার পরিকল্পনা করেন। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী জেএমবির কিলিং গ্রুপের সদস্যরা নরসিংদির মাধবদির রঘুনাথপুর গ্রামের বাসিন্দা কনফেকশনারি দোকানের মালিক চিত্তরঞ্জনের উপর গত মঙ্গলবার রাতে হামলা চালায়। হামলার আগে জেএমবির আরও দুই সহযোগী ওই স্থানে গিয়ে চিত্তরঞ্জনের অবস্থান মনিটর করে। তাদের সংকেত পেয়ে রাত ৮টায় মোটর সাইকেল যোগে তিন জেএমবি সদস্য চিত্তরঞ্জনের দোকানের সামনে গিয়ে উপস্থিত হয়। ওই সময় তিনি দোকানে বসা ছিলেন। একজন মোটর সাইকেলে বসে থাকে। অপর দুইজনের একজন চাপাতি ও অন্যজন অস্ত্র নিয়ে দোকানে ঢুকে পড়ে। চাপাতি দিয়ে ঘাড়ে কোপ দেয় এক জঙ্গী। ওই সময় দোকানের কাস্টমার পাঁচদোনার বেপারি পাড়ার হাবিব বাধা দিলে তার পেটে অস্ত্র ঠেকিয়ে হত্যার হুমকি দেয়। ওই সময় চিত্তরঞ্জনের চিত্কারে তার পরিবারের সদস্য ও আশেপাশের লোকজন এগিয়ে আসে। জঙ্গীরা দ্রুত মোটর সাইকেল যোগে পালিয়ে যায়। তাদের মুখম্লল কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল। চিত্তরঞ্জনের ঘাড় ছাড়াও গলা ও পেটে চাপাতির আঘাত লাগে। তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। গুলশান, শোলাকিয়া ও মাধবদি হামলার ঘটনার পর পুলিশ সদর দপ্তরের গোয়েন্দা ইউনিট নিশ্চিত হয় যে, তামিম চৌধুরী নারায়ণগঞ্জ শহরে অবস্থান করছে।
ইতোমধ্যে তামিম চৌধুরী একাধিক ঘনিষ্ঠ সহযোগী একটি গোয়েন্দা ইউনিটের কাছেও আটক হয়েছে। তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী পুলিশ সদর দপ্তরের গোয়েন্দা ইউনিট তামিম চৌধুরীর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়।
নারায়ণগঞ্জ পাইকপাড়ায় বসে ঢাকা-সিলেট হাইওয়ের নিকটে নরসিংদি মাধবদির রঘুনাথপুর মন্দিরের পাশে ব্যবসায়ী চিত্তরঞ্জনকে হত্যা করার পরিকল্পনা করার কথাও গোয়েন্দা ইউনিটের কাছে তারা প্রকাশ করে দেয়। তার পরিবার ও আশেপাশের লোকজনের কারণে ওই হামলায় জঙ্গীরা ব্যর্থ হয়েছে। চিত্তরঞ্জন গত শুক্রবার সকালে ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছেন। তিনি জানেন না এই হামলার পিছনে কারা রয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে চিত্তরঞ্জন ইত্তেফাককে বলেন, এ হামলা সম্পর্কে তিনি কিছু বলতে পারেন না। নরসিংদির হামলার পর নারায়ণগঞ্জ এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক এলাকা পরবর্তী টার্গেট ছিল তামিম চৌধুরীর। এই আবাসিক এলাকায় প্রায় তিনশ গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক বসবাস ও যাতায়াত করেন। গুলশান হামলার পর ৫ জুলাই নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ার বাসাটি ভাড়া নেয় তামিম চৌধুরীর সহযোগীরা। মাত্র ১৫ দিন আগে পাইকপাড়ার ওই বাসায় তামিম চৌধুরী ওঠে। পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহা পুলিশ পরিদর্শক মনিরুজ্জামান তামিমের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হন।
তিনি এ বিষয়টি পুলিশের আইজি এ কে এম শহীদুল হককে অবহিত করেন। আইজিপির দিক নির্দেশনায় এআইজিপি মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে তামিমের অবস্থান ও তাকে গ্রেপ্তারের কার্যক্রম শুরু করেন। গত শুক্রবার দিবাগত রাত দুইটায় পুলিশের এ দলটি নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় তামিম চৌধুরীর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। পুলিশের আইজি কাউন্টার টেরোরিজম ও সোয়াত ইউনিটকে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন। কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মনিরুল ইসলামের সার্বিক তত্বাবধানে গতকাল শনিবার ভোরে পাইকপাড়ার অভিযানের জন্য কার্যক্রম শুরু করা হয়। পুলিশের আইজি এ কে এম শহীদুল হক বলেন, নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ার অভিযানে তামিম চৌধুরীর মতো দুর্ধর্ষ জঙ্গীনেতার অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে। এতে নারায়ণগঞ্জবাসী বড় ধরনের একটি হামলা থেকে রক্ষা পেল। এ দেশে জঙ্গী মাথাচাড়া দিয়ে উঠলেই পুলিশের পক্ষ থেকে এ ধরনের কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানান।
ইত্তেফাক/এএন
