‘বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় উগ্রবাদ প্রতিরোধে নজরুল চর্চা ও প্রসার জরুরি’

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০১৬, ১৫:০৫
বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় উগ্রবাদের বিস্তার, সাম্প্রদায়িক চেতনার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্মের প্রচার-প্রসার ও নজরুল পাঠ অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। নজরুলের আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িক অপতত্পরতার বিরুদ্ধে জাতিকে নজরুল চর্চা ও অধ্যয়নের আহ্বান জানানোর মধ্য দিয়ে গতকাল শনিবার জাতীয় কবির ৪০তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়েছে।
 
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি পালন করে। কর্মসূচির মধ্যে ছিল সকালে কবির মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ, ফাতেহা পাঠ ও আলোচনা সভা। বিকালে বিভিন্ন সংগঠনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বাংলাদেশ বেতার, টেলিভিশন এবং বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন নজরুলের গান, আলেখ্য অনুষ্ঠান এবং নাটকসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচার করে। সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাহিত কবিকে ফুলেল       শ্রদ্ধা জানানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয়  দিবসের কর্মসূচি। সকাল সাতটায় কবি পরিবারের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তার নাতনি খিলখিল কাজী। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপুমনি এবং সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল সকালে কবির মাজারে পুষ্প অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ করেন। এরপর একে একে বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, শিশু একাডেমি, নজরুল সঙ্গীত শিল্পী পরিষদ, নজরুল সঙ্গীত সংস্থা, নজরুল ইনস্টিটিউট, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, নজরুল একাডেমি, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, আন্তর্জাতিক নজরুল চর্চা কেন্দ্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ কবির মাজারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৪০তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়েছে। সকাল ৭টায় কলাভবন প্রাঙ্গণে ‘অপরাজেয় বাংলা’র পাদদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ জমায়েত হন। সেখান থেকে তারা সকাল সোয়া ৭টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আআমস আরেফিন সিদ্দিকের নেতৃত্বে শোভাযাত্রা সহকারে কবির মাজারে গমন, পুষ্প অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ করেন।
 
 পরে কবির মাজার প্রাঙ্গণে উপাচার্য অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় নজরুল গবেষক ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম, প্রো-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দীন, বিশ্ববিদ্যালয় সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ফরিদউদ্দিন আহমেদ বক্তব্য রাখেন। কলা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন ও বাংলা বিভাগের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক বেগম আকতার কামাল সূচনা বক্তব্য রাখেন। সঞ্চালনা করেন নজরুল গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর।
 
আরেফিন সিদ্দিক বলেন, নজরুলের মানবতাবাদী চেতনা, সাম্য ও মুক্তবুদ্ধির ধারণায় নতুন প্রজন্মকে এর তাত্পর্য সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। আজকে ধর্মকে ব্যবহার করে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতাকারীরা প্ররোচণা ও প্রণোদনা দিয়ে জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এতে জড়িয়ে পড়ছে। তাই আজ শুধুমাত্র পরীক্ষা পাসের জন্য নজরুল পাঠ নয়– নজরুল চর্চা করতে হবে মূল্যবোধ আর দেশপ্রেমকে উজ্জীবিত করার জন্য।
 
অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে নজরুলের ছিল গভীর সম্পৃক্ততা। ১৯২৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্পণ করার পর থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত এই সম্পর্ক স্থায়ী হয়ে গিয়েছিল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নজরুলকে মর্যাদার আসনে বসিয়ে এই স্থায়িত্ব দিয়েছেন। অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীবৃন্দ নজরুল সঙ্গীত পরিবেশন করেন। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদুল জামিয়ায় কোরআনখানি অনুষ্ঠিত হয়।
 
নজরুল ইন্সটিটিউট
 
নজরুল সঙ্গীতে বিশেষ অবদানের জন্য শিল্পী সাদিয়া আফরিন মল্লিক ও নজরুল গবেষণায় অনন্য অবদানের জন্য গবেষক আবু হেনা আবদুল আউয়াল পেলেন ‘নজরুল পুরস্কার-২০১৫’। গতকাল তাদের এ পুরস্কার প্রদান করা হয়। সম্মাননা স্মারকের পাশাপাশি শিল্পীদের ১ লাখ টাকার চেকও প্রদান করা হয়।
 
নজরুল ইন্সটিটিউটের আয়োজনে শনিবার বিকেলে রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরে প্রধান মিলনায়তনে আলোচনা অনুষ্ঠান, নজরুল পুরস্কার প্রদান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন আবুল মাল আবদুল মুহিত।
 
অর্থমন্ত্রী বলেন, “কাজী নজরুল ইসলামকে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে নিয়ে আসেন, তাঁর সিদ্ধান্তটি ছিল অত্যন্ত দূরদর্শী। নজরুলের সৃষ্টির প্রভাব বিস্তৃত। তিনি যে কর্মযজ্ঞ রেখে গেছেন তা অনন্য। গল্প-কবিতা-উপন্যাসে সাবলীল গতিতে অসাধারণ মেধায় বাংলা সংস্কৃতিতে উপস্থাপন করেছেন।
 
অনুষ্ঠানে নজরুল ইনস্টিটিউট ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, “নজরুল সংগীত নিয়ে প্রতারণা চলছে। নজরুলের গানে নতুনভাবে সুরারোপের কথা বলে তারা অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অনুদান নিচ্ছেন। কিন্তু আমি কপিরাইট আইনানুযায়ী বলব, নজরুলের গানে নতুনভাবে সুরারোপের অধিকার কারও নেই।”
 
জাতীয় কবির নাতনী খিলখিল কাজী বলেন, “দাদু সারাজীবন মানুষ ও জীবনের জয়গান গেয়েছেন। সাম্যের গান গেয়ে তিনি জীবনভর ধর্মীয় উগ্রতার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তিনি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রকাশ করেছেন।
 
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ইকরাম আহমেদ, জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে প্রবাসে নজরুল সাহিত্য গবেষণার নানাদিক তুলে ধরেন সাজেদ কামাল, সাহিত্যকর্মের নানাদিক নিয়ে আলোকপাত করেন নজরুল ইনস্টিটিউট ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক মোঃ আব্দুল কাইয়ুম।
 
শিল্পকলা একাডেমি
 
সন্ধ্যায় জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে শিল্পকলা একাডেমি। দুই পর্বে বিভক্ত অনুষ্ঠানমালার প্রথম পর্বে ছিল নজরুলবিষয়ক আলোচনা। এই পর্বে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি সচিব আকতারী মমতাজ। একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. বিশ্বজিত ঘোষ।
 
আলোচনা শেষে ছিল সাংস্কৃতিক পর্ব। দেশের স্বনামধন্য শিল্পীরা নজরুল সঙ্গীত পরিবেশন করেন। ছিল নৃত্য পরিবেশনা।
 
 

ইত্তেফাক/এএন