চাকরিচ্যুতির প্রতিশোধ নিতেই রিশাকে হত্যা

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ০০:২২
চাকরিচ্যুত করার প্রতিহিংসা থেকেই ওবায়দুল উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সুরাইয়া আক্তার রিশাকে খুন করে। রিশার কাছে প্রেম নিবেদনের বিষয়টি টের পেয়ে তার মা তানিয়া হোসেন ইস্টার্ন মল্লিকা মার্কেটের বৈশাখী টেইলার্সে অভিযোগ দেন। এতে টেইলার্স কর্তৃপক্ষ ওবায়দুলকে চাকরিচ্যুত করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ওবায়দুল পুলিশের কাছে এ তথ্য দিয়েছেন।
 
ওবায়দুল প্রতিশোধ নিতে রিশাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। সেই অনুযায়ী তিনি স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেন। সুযোগ খোঁজেন কীভাবে তাকে খুন করা যায়। রাস্তায় খুন করলে সমস্যা হতে পারে। ফুটওভারব্রিজ একটু নিরিবিলি থাকে। সেখানেই খুন করা অনেকটা নিরাপদ। ঘটনার দিন তিনি ফুটওভারব্রিজের ওপর প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। এক পর্যায়ে স্কুল ছুটি হলে রিশা ফুটওভারব্রিজ দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিল। ফুটওভারব্রিজের মাঝামাঝি স্থানে রিশার পথ আগলে উপর্যুপরি ছুরি চালিয়ে পালিয়ে যান তিনি। তবে হত্যায় ব্যবহূত ছুরিটি তিনি কোথা থেকে          সংগ্রহ করেছেন বা কে তাকে দিয়েছে-এ ব্যাপারে কোনো তথ্য তিনি পুলিশকে জানাননি।
 
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানালেও পুলিশ বিষয়টি আরো নিশ্চিত হতে ছয় দিনের রিমান্ডে নিয়েছে। বুধবার রাতে ওবায়দুল খানকে ঢাকার রমনা থানায় আনা হয়। গ্রেফতারের পর গতকাল ওই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়। নতুন করে তদন্তে দায়িত্ব পেয়েছেন রমনা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আলী হোসেন। আলী হোসেন জানান, বৃহস্পতিবার ওবায়দুলকে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন তিনি। তার ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন ঢাকা মহানগর হাকিম দোলোয়ার হোসেন।
 
জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, রিশাকে ওবায়দুলের ভালো লাগতো। তাকে বিয়ে করার ইচ্ছে ছিল। যতবার তাকে দেখেছে ততবারই মুগ্ধ হয়েছে। কিন্তু রিশা তাকে বার বার কষ্ট দিয়েছে। বৈশাখী টেইলার্সেই প্রথম দেখা হয় রিশার সঙ্গে। ওই সময়েই তাকে ভালো লাগে বলে জানান ওবায়দুল। তারপর ফোনে কথা হয় রিশার সঙ্গে। জামা তৈরি সংক্রান্ত বিষয় নিয়েই নানা কথা হয়। তখনও ভালো লাগার বিষয়টি রিশাকে বলা হয়নি। এক পর্যায়ে রিশার মা বিষয়টি বুঝতে পারেন। তবু অচেনা ফোন নম্বর থেকে রিশাদের বাসার ফোনে কল দিতেন। রিশার মা রিসিভ করলে তা কেটে দিতেন, কখনও কখনও রং নম্বর বলে রেখে দিতেন। রিশা রিসিভ করলেই রোমান্টিক নানা কথা বলার চেষ্টা করতো। হঠাত্ রিশার ফোন নম্বরটি বন্ধ পান ওবায়দুল। তারপর থেকেই কখনও সকালে কখনও বিকালে সিদ্দিকবাজারের ফায়ার সার্ভিসের গলিতে রিশাদের বাসার পাশে চলে যেতেন। কখনও কখনও স্কুলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন। বিভিন্ন সময়ে রিশাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু প্রথম থেকেই রিশা তাকে এড়িয়ে যেত। এমনকি একাধিকবার ওবায়দুল অপদস্ত হয়েছেন বলে দাবি করেন।
 
রিশার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি চাকরি হারিয়েছেন। রিশার মা বিষয়টি এক পর্যায়ে বৈশাখী টেইলার্সের মালিককে জানান। ওই অভিযোগের কারণেই ওবায়দুলের চাকরি চলে যায়। তখন থেকেই যে কোনো মূল্যে রিশাকে বিয়ে করার পরিকল্পনা করেন ওবায়দুল।
 
পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মারুফ হোসেন সর্দার বলেন, হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ওবায়দুল স্বীকার করলেও বিস্তারিত কিছু জানাননি। হত্যাকাণ্ডের কারণ ও এর পেছনে আর কেউ জড়িত রয়েছে কি-না এসব বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
 
গত ২৪ আগস্ট পরীক্ষা শেষ করে কাকরাইলে স্কুলের সামনের ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে পার হওয়ার সময় ওবায়দুল রিশাকে ছুরিকাঘাত করেন। ২৮ আগস্ট চিকিত্সাধীন অবস্থায় রিশা মারা যায়। এ ঘটনায় রিশার মা বাদী হয়ে রমনা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা করেন। গত বুধবার সকালে নীলফামারীর ডোমারের সোনারাই বাজার থেকে ওবায়দুল খানকে র্যাব ও পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করে।
 
আদালতে কাদলেন রিশার মা
 
আদালতে আসামির কাঠগড়ায় সন্তানের ঘাতক ওবায়দুলকে দেখে অঝোরে কাঁদলেন রিশার মা। কৃহস্পতিবার যখন ওবায়দুলকে আদালতে হাজির করা হয়, তখন রিশার মা তানিয়া হোসেন ও বাবা রমজান হোসেন সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
 
আদালতে উপস্থিত একাধিক আইনজীবী জানান, রিমান্ড আবেদন শুনানির সময় উপস্থিত ছিলেন মামলার বাদী রিশার মা তানিয়া হোসেন। সঙ্গে ছিলেন রিশার বাবা রমজান হোসেনও। ওবায়দুল খানকে যখন আদালতে আসামির কাঠগড়ায় তোলা হয়, তখন রিশার মাকেও বাদীর কাঠগড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় মেয়ের ঘাতক ওবায়দুলকে দেখে ডুকরে কেঁদে ওঠেন তিনি। কোনওভাবেই তাকে থামানো যাচ্ছিল না। যতক্ষণ শুনানি চলেছে, ততক্ষণই তিনি কেঁদেছেন। এ সময় ওবায়দুল ছিল ভাবলেশহীন।’
 
শুনানি শেষে রিশার মা সাংবাদিকদের বলেন, ‘ওবায়দুলকে দেখে মেয়ে হারানোর কষ্ট যেন বেড়ে যায়। আমি চাই, যে আমার কোল খালি করে দিয়েছে, তার মতো জঘন্য অপরাধীর যেন ফাঁসি হয়। আমাদের মন তো ঠাণ্ড হয় না।’
 
ওবায়দুলের পক্ষে আদালতে দাঁড়াননি কোনও আইনজীবী। তারা বলেন, ওবায়দুলের মতো আসামির হয়ে আদালতে দাঁড়াতে ইচ্ছা করেনি কারও। এছাড়া তার পক্ষে কেউ কোনও আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন কিনা সেটাও জানি না।
 
 

ইত্তেফাক/এএন