হাসান জাবির
সাইমন বলিভার ল্যাটিন আমেরিকার স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত্ ও সামরিক ব্যক্তিত্ব। আশির দশকের শুরুতেই ভেনিজুয়েলার একদল সেনা অফিসার তার আদর্শে উজ্জীবিত হয়েছিলেন। বলিভারের দর্শনের সঙ্গে মার্ক্সবাদের সমন্বয় করে এই গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রয়াত হুগো শ্যাভেজ। পরবর্তীতে তার নেতৃত্বেই ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলে নেয় তারা। মূলত ১৯৮২ সালে শ্যাভেজের চিন্তায় গড়ে ওঠে একটি অতিশয় ক্ষুদ্র আর্মি গ্রুপ ‘রেভ্যুলুশনারি বলিভারিয়ান মুভমেন্ট’-২০০ বা আরবিএম-২০০। ১৯৯২ সালে ওই গ্রুপটি বিস্তৃত হয়ে ‘ফিফথ রিপাবলিকান মুভমেন্ট’ নামক রাজনৈতিক প্লাটফর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এক্ষেত্রে ভেনিজুয়েলা প্রজাতন্ত্রের দীর্ঘ ইতিহাসে আরও একবার সাংবিধানিক পুনর্গঠনই ছিল তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। ১৯৯৯ সাল থেকে শুরু হওয়া এই সাংবিধানিক ও ‘রাজনৈতিক সংস্কার’ প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে। অবশ্য ২০০৭ সালে ‘ফিফথ রিপাবলিকান মুভমেন্ট’ বিলুপ্ত করে গঠিত হয় বর্তমান ক্ষমতাসীন ‘ইউনাইটেড সোশালিস্ট পার্টি অফ ভেনিজুয়েলা’। এর আগে ১৯৯৮ সালে ফিফথ মুভমেন্টের প্রার্থী হিসেবে ব্যাপক ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন প্রয়াত হুগো শ্যাভেজ। যে প্রক্রিয়ায় দেশটির শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আসে গুণগত পরিবর্তন। ফলে দেশটির পররাষ্ট্র ও সামরিক নীতিও পাল্টে যায়।
উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সালে গৃহীত নতুন সংবিধানের আওতায় ভেনিজুয়েলান রেজিমেন্টের বহুমুখী সংস্কার প্রক্রিয়ায় গুরুত্ব পায় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা। এই প্রক্রিয়ায় পেট্রোলিয়াম মজুদে সমৃদ্ধ দেশটির জ্বালানি বাণিজ্য সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এ পর্যায়ে ভেনিজুয়েলান রেজিমেন্টের বিরুদ্ধে শুরু হয় আন্তর্জাতিক বিরোধিতা। সব বিরোধিতা উপেক্ষা করেই সাইমন বলিভারের আদর্শকে ধারণ করে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে থাকে ভেনিজুয়েলা। এই ধারাবাহিকতায় নতুন সংবিধানে দেশটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘বলিভারিয়ান রিপাবলিক অফ ভেনিজুয়েলা’। এধরনের সংস্কারের মধ্যেই ২০০২ সালে একটি প্রতিবিপ্লবী গ্রুপ শ্যাভেজের বিরুদ্ধে পাল্টা অভ্যুত্থান সংঘটিত করেন। কিন্তু মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই সেটি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। মুক্ত শ্যাভেজ আবার দাপটের সঙ্গে ক্ষমতায় ফিরে আসেন। ঐ ঘটনায় ভেনিজুয়েলান সেনাবাহিনী ও শ্যাভেজ সমর্থক মার্ক্সবাদী জনগণের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকাই দেশটির আজকের প্রেক্ষাপট সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০১৩ সালে শ্যাভেজ মারা যাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন নিকোলাস মাদুরো। যিনি ছিলেন আরবিএম-২০০ এর অন্যতম সদস্য। ফলে পূর্বের মতো মাদুরো সরকারের প্রতিও দৃঢ় সমর্থন অব্যাহত রাখে আর্মি। মূলত আর্মির কারণেই শ্যাভেজ উত্তর ভেনিজুয়েলার ‘রিজিম চেঞ্জে’র আন্তর্জাতিক পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়।
সর্বশেষ ২০১৮ সালের মে মাসে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে জিতে গত ২৩শে জানুয়ারি ২য় দফায় প্রেসিডেণ্ট হিসেবে শপথ নেন মাদুরো। কিন্তু বিরোধীরা তার শপথকে অবৈধ আখ্যায়িত করে তাত্ক্ষণিকভাবে আন্দোলন শুরু করেন। অন্যদিকে সবাইকে হতবাক করে বিরোধী নেতা গুয়ান হুয়াইদো নিজেকে দেশটির প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে- ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক চ্যানেল প্রায় তাত্ক্ষণিকভাবে হুয়াইদোকে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে অনুসরণ করেন আটটি ইউরোপীয় দেশ, ইসরায়েল ও দক্ষিণ আমেরিকার গুটিকয়েক দেশ। ফলে ঘনীভূত হয় বর্তমান সংকট। তাই এই আলোচনায় অগ্রাধিকার পাচ্ছে সংকট উত্তরণে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা।
ছয়টি শাখা ও চারটি কমান্ডে বিভক্ত ভেনিজুয়েলার সশস্ত্র বাহিনীর অফিসিয়াল নাম হচ্ছে ‘ন্যাশনাল বলিভারিয়ান আর্মড ফোর্সেস অফ ভেনিজুয়েলা’। ‘মিনিস্ট্রি ওফ ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার ফর ডিফেন্স’ কর্তৃক পরিচালিত এই বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ হচ্ছেন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। দক্ষিণ আমেরিকার ২য় বৃহত্তম সামরিক শক্তির দেশ ভেনিজুয়েলার সেনাদের আছে দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্য। অতীতে আঞ্চলিক অনেক দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন ভেনিজুয়েলান সেনারা। এছাড়া অতীতে বহু আঞ্চলিক যুদ্ধে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতাও আছে তাদের। প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ নিয়মিত সেনা, পাশাপাশি দুই লক্ষ রিজার্ভ সেনা সমৃদ্ধ দেশটির বর্তমান সামরিক বাজেট ১ পয়েন্ট ১২ বিলিয়ন ডলার। সশস্ত্র বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ শাখা হচ্ছে- ‘ন্যাশনাল বলিভারিয়ান মিনিস্ট্রি অফ এভিয়েশন’ বা ভেনিজুয়েলান এয়ার ফোর্স। ২৮০টি যুদ্ধ বিমান সজ্জিত এই বাহিনীই নিয়ন্ত্রণ করে ‘ওয়েস্টার্ন এয়ার ডিফেন্স আর্টিলারি’। এই ডিভিশনই দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রধান নিয়ন্ত্রক।
এদিকে ১৯৯৯ সালের আগপর্যন্ত দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর অস্ত্রের প্রধান সরবরাহকারীই ছিল আমেরিকা, ইউরোপ ও ইসরায়েল। যদিও বর্তমানে দেশটির প্রধান মিলিটারি সাপ্লায়ার্স হচ্ছে- রাশিয়ান ফেডারেশন ও গণচীন। ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয় যে, ভেনিজুয়েলার কাছে রাশিয়ার অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এস-৩০০ আছে। দীর্ঘদিন থেকেই ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে আছে আর্মি। বিশেষ করে দেশটির জ্বালানি বাণিজ্যসহ সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সেনাদের আছে নিয়মিত অংশীদারিত্ব। রাজনৈতিক প্রক্রিয়াতেও এই ধারা অব্যাহত আছে। বর্তমানে আমেরিকা থেকে শুরু করে দেশটির বিরোধী জনগণ চাচ্ছেন আর্মি বর্তমান সংকটে মাদুরোর পক্ষত্যাগ করুক। এ ব্যাপারে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতেই গত বছর বিরোধী জোটের কর্মীরা দেশটির প্রধান প্রধান ক্যান্টনমেন্টে নিজেদের লিফলেটও বিতরণ করেছিলেন। কিন্তু সেনারা সেই লিফলেট গ্রহণ করলেও বর্তমান অবস্থা থেকে সরে আসার ব্যাপারে নেতিবাচক মনোভাব অব্যাহত রেখেছেন। কিন্তু গত কয়েকদিনের ঘটনাবলী বিশেষ করে মার্কিন ত্রাণ গ্রহণ করা না করা সংক্রান্ত বিষয়ে সেনাদের উপর চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে এই চাপ সামাল দিতেই সমপ্রতি ব্রাজিল ও কলম্বিয়ার সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ ঘোষণা করেছে ভেনিজুয়েলা। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বারবার দেশটির সেনাবাহিনীকে মাদুরোর পক্ষ ত্যাগ করতে বলছেন। আমেরিকার সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন ৩৫ সদস্যের আঞ্চলিক জোট ‘অর্গানাইজেসন অফ আমেরিকান স্টেটস’ ও মার্কিন সমর্থিত ১৩ সদস্যের ‘লিমা গ্রুপ’। তারা সংকটের রাজনৈতিক সমাধান মাদুরোর উপর সব ধরনের চাপ অব্যাহত রেখেছেন। যদিও এই পরিস্থিতিতে রাশিয়া, চীন, ইরান ও কিউবা মাদুরোর প্রতি দৃঢ় সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। মাত্র কয়েকদিন আগেই প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো রাশিয়া ও চীন থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্রের চালান গ্রহণ করার কথা প্রকাশ্যেই বলেছেন।
এই প্রেক্ষিতে খুব স্পষ্টভাবেই প্রতীয়মান হয় যে, সংকট উত্তরণে সেনাবাহিনীই শেষ কথা। যদিও এই মুহূর্তে সেনারা মাদুরোর উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করবেন তার সুস্পষ্ট কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। যে কারণে দেশটির উপর মার্কিন হামলার আশঙ্কা থাকছে। ধারণা করা হচ্ছে যে, বরাবরের মতো যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়েই ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে। তবে এমনটি না হলে বিরোধীরা আভ্যন্তরীণ সংঘাত শুরু করলে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে হস্তক্ষেপ করতে পারে। তবে স্বাভাবিক বিবেচনায় অনুমান করা যায় যে-ভেনিজুয়েলান সেনাবাহিনী যেকোন পরিস্থিতিই নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে।
n লেখক : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও
নিরাপত্তা বিশ্লেষক
