সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসীর কোনো ধর্ম নেই

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০১৯, ২১:৪২

শফিকুল ইসলাম

বলা হয়ে থাকে, নিউজিল্যান্ড হলো ‘শান্তির স্বর্গোদ্যান’। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটকে, বিশেষত গত সপ্তাহে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরের দুটি মসজিদে হামলার ঘটনায় পাঁচজন বাংলাদেশিসহ ৫০ জন নিহতের মর্মস্পর্শী আক্রমণের আলোকে সেই খেতাবে কিছুটা টানাপোড়েন চলছে বলে আমার ধারণা। ‘ব্রেন্টন ট্যারেন্ট’ নামক একজন শ্বেতাঙ্গ উগ্র ও ডানপন্থী অস্ট্রেলীয় নাগরিক উক্ত সহিংস সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডটি ঘটায়। ব্রেন্টন ট্যারেন্ট আল নূর মসজিদে যখন হামলা করেন সেই সময় তার হেলমেটে বসানো ছিল ক্যামেরা। যা দিয়ে অনলাইনে সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছিল এই লোমহর্ষক ঘটনাটি। হামলার পূর্বাভাস হিসেবে তিনি ‘ব্যাপক প্রতিস্থাপন’ শিরোনামে একটি ৭৩ পৃষ্ঠার ইশতেহার পোষ্ট করেন। ‘ব্যাপক প্রতিস্থাপন’ হচ্ছে শ্বেতাঙ্গ গণহত্যা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও এর ফরাসি প্রকরণের একটি সূত্র। যেহেতু হামলাকারী একজন ইসলাম-বিদ্বেষী ব্যক্তি তাই এই ইশতেহারে মুসলিম এবং অভিবাসন বিরোধী বিভিন্ন অনুভূতির প্রকাশ পাওয়া যায়। অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কটূক্তি, শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী অলঙ্করণ এমনকি শ্বেতাঙ্গ জাতি রক্ষার জন্য রাষ্ট্রে আক্রমণকারী মুসলিমদের হত্যা করার আহ্বানও ছিল। যা থেকে স্পষ্ট হয় যে তিনি মুসলমানদের ঘৃণা করেন। তিনি ২০১১ সালে অসলোতে ৭৭ জনকে হত্যা করা অ্যান্ডারর্স ব্রেইভিকসহ অন্য শ্বেতাঙ্গ হামলাকারীদের থেকে অনুপ্রাণিত হন আর তা এই হামলার মধ্য দিয়ে শ্বেতাঙ্গদের বিজয় হবে বলে দাবি করে। হামলাকারী ওই ইশতেহারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

২০১৫ সালে ফিরে যাওয়া যাক। ১৭ জুন সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ক্যারোলিনার কৃষ্ণাঙ্গদের একটি গির্জায় চরম বর্ণবাদী তরুণ ডিলান রুফ ৯ জনকে হত্যা করে। ডিলান রুফ কুখ্যাত দাস প্রথা সমর্থক, মার্কিন সেনাবাহিনীর পতাকা ও পিস্তল হাতে নিয়ে বর্ণবিদ্বেষমূলক ইশতেহার ঘোষণা করেছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীতে গৃহযুদ্ধকালে কনফেডারেশন সমর্থক বাহিনী এমন পতাকা ব্যবহার করত। ওই গৃহযুদ্ধ অবসানের পর দাস প্রথা সমর্থকেরা ১৮৬৫ সালে প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনকে হত্যা করে। কৃষ্ণাঙ্গদের দাসতুল্য মনে করে নতুন যুক্তরাষ্ট্র গড়তে চেয়েছিল ডিলান রুফ। ব্রেন্টন ট্যারেন্ট ইশতেহারে ডিলান রুফ, এন্ডারসন বেহরিং ব্রেইভিক-এর প্রতি সমর্থন দিয়েছে। ইউরোপীয় ও আমেরিকান সমাজগুলো শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের হুমকিকে যেভাবে গুরুত্বসহকারে নেওয়া উচিত সেভাবে নিচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা হামলার এ ঘটনাকে ‘নজিরবিহীন’ এবং ‘সন্ত্রাসী হামলা’ বলে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু পশ্চিমা মিডিয়াগুলোর ব্রেন্টন ট্যারেন্টকে সন্ত্রাসী বলতে এতো সঙ্কোচ কেন? হামলাকারী অস্ট্রেলিয়ান বংশোদ্ভূত শ্বেতাঙ্গ বলে? মিডিয়ায় বর্তমানে একটা প্রবণতা চালু আছে। কোনো আক্রমণকারী যদি মুসলিম হয় তাকে ‘জঙ্গি’ কিংবা ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এবং ইসলামধর্মকে সামনে টেনে আনা হয়। তারা ইঙ্গিত করতে চায় ইসলাম সন্ত্রাসবাদের ধর্ম। অথচ ব্রেন্টন ট্যারেন্টের ক্ষেত্রে একবারও ধর্মের প্রশ্ন আসেনি। পশ্চিমা মিডিয়ার প্রোপাগাণ্ডায় বিশ্বের মানুষদের মনে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, অধিকাংশ জঙ্গি হামলার সঙ্গে মুসলমানরা জড়িত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণা সংস্থার জরিপে উঠে এসেছে- গত ১০ বছরে দেশটিতে শতকরা ৭১ ভাগ হামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীরা। আর মুসলমানরা জড়িত ২৬ শতাংশ হামলার সঙ্গে।

 ট্যারেন্টের হামলার সবচেয়ে যে বিষয়টি আকর্ষণ করেছে সেটা হলো বন্দুকের গায়ের লেখাগুলো। গুগল সার্চ করে সেই লেখাগুলোর নির্ভরযোগ্য ইতিহাস খোঁজার চেষ্টা করেছি। ট্যারেন্টের বন্দুকের নলে বড় করে লেখা ছিল ‘রিফুউজিস ওয়েলকাম টু হেল’। এটি দিয়ে সে মুসলিম অভিবাসীকে ইঙ্গিত করছে। বন্দুকে Alexandre Bissonnette  নামে ২৯ বছর বয়সী একজন রাজনীতি নিয়ে পড়া শিক্ষার্থীর নামও লেখা ছিল। ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে কানাডার কিউবেক সিটির একটি মসজিদে সে হামলা করে যাতে ১৭ এর অধিক লোক আহত ও নিহত হয়।

‘বৈশ্বিক সন্ত্রাস সূচক ২০১৮’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে (সারাবিশ্বে) উগ্র-ডানপন্থি দল ও ব্যক্তিরা ১১৩টি সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে। শুধুমাত্র ২০১৭ সালেই হামলা হয়েছে ৫৯টি। আর সংস্থাটির হিসেবে সেসব হামলার অধিকাংশই পরিচালিত হয়েছে ‘মুসলিমবিরোধী ভাবাবেগে আক্রান্ত উগ্র-ডানপন্থি শ্বেতাঙ্গদের’ দ্বারা।

ট্যারেন্টের ঘটনার রেষ কাটতে না কাটতেই ২০ তারিখ রাতে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামের পাঁচটি মসজিদে হামলা চালিয়েছে অজ্ঞাত অস্ত্রধারীরা। সবকিছু বিশ্লেষণ করলে ইউরোপ, আমেরিকায় দৃশ্যমান মুসলিমবিদ্বেষী নতুন সন্ত্রাসবাদের যে উত্থান হয়েছে তা এখন একেবারেই স্পষ্ট। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা মোড়লরা কী এর পরও চুপ করে থাকবেন। নাকি নিজের  ধর্মের, বর্ণের সন্ত্রাসীকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ আছে? ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্যারেন্টের ঘটনায় বলেন, ‘এরা ছোট্ট একটি গ্রুপ। আমি সত্যিই মনে করি না এরা বিশ্বের জন্য হুমকি’। আসলেই কি শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীর সন্ত্রাসবাদ বিশ্বের জন্য হুমকি নয়?

n লেখক:শিক্ষার্থী, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়