কাদেরকে সরিয়ে রওশনকে উপনেতা করলেন এরশাদ

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০১৯, ২২:৫২

 ‘পার্টি পরিচালনায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ, পার্টির সাংগঠনিক কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়া, পার্টির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি, তার নেতৃত্বে সংগঠন করতে পার্টির সিনিয়র নেতাদের অপারগতা প্রকাশ’- এমন অভিযোগে জাতীয় পার্টির (জাপা) কো-চেয়ারম্যানের পদ হারানোর পরদিনই গতকাল শনিবার সংসদের বিরোধী দলীয় উপনেতার পদ থেকেও বাদ পড়লেন জিএম কাদের। জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ ‘সাংগঠনিক নির্দেশ’ শিরোনামে গতকাল নিজের স্বাক্ষরিত আরেক চিঠিতে ছোট ভাই জিএম কাদেরকে সরিয়ে বিরোধী দলীয় উপনেতা হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছেন স্ত্রী ও দশম সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদকে। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ও জাপা চেয়ারম্যান এরশাদ গতকালই সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে চিঠি পাঠিয়েছেন। জাপার দফতর সম্পাদক এম এ রাজ্জাক বিকালে স্পিকারের বাসভবনে গিয়ে এরশাদের চিঠি পৌঁছে দেন।

জানা গেছে, কো-চেয়ারম্যান পদ হারানোর পর শুক্রবার রাতে আর বড় ভাই এরশাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি জিএম কাদের। তবে গতকাল সকালেই এরশাদের বারিধারার বাসায় ছুটে যান তিনি। প্রায় তিন ঘণ্টা ড্রইং রুমে জিএম কাদের অপেক্ষা করলেও শয়নকক্ষ থেকে বের হননি এরশাদ। বাসার লোকজনের মাধ্যমে তিনি জিএম কাদেরকে বার্তা পাঠান এই বলে, ‘ওকে গিয়ে বলো আমি অসুস্থ, আজ আমার সাথে দেখা হবে না।’ সাক্ষাত্ না পেয়ে এরশাদের বাসা থেকে চলে যান জিএম কাদের।

জিএম কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধী দলের উপনেতার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে জাপার দায়িত্বশীল একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এর নেপথ্যে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। ৩০ জানুয়ারি একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির সঙ্গে জি এম কাদেরের যোগাযোগের অভিযোগ ওঠে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচন বর্জনেরও পক্ষে ছিলেন তিনি। সর্বশেষ গত ১১ মার্চ সংসদ অধিবেশনের সমাপনী দিনে দেওয়া বক্তব্যে জিএম কাদের জাপাকে ‘আংশিক কৃত্রিম বিরোধী দল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

জাপার এই নেতারা জানান, গত ১ জানুয়ারি এরশাদ এক সাংগঠনিক নির্দেশে তার অবর্তমানে জিএম কাদেরকে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করেন। এমনকি চিকিত্সার জন্য বিদেশে থাকাবস্থায় জিএম কাদের পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন বলেও ঘোষণা দেন এরশাদ। এরপর গত ৪ জানুয়ারি জিএম কাদেরকে সংসদের বিরোধী দলীয় উপনেতা হিসেবেও তিনি মনোনয়ন দেন। রওশন এরশাদ দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান হলেও জিএম কাদের কীভাবে এরশাদের অনুপস্থিতিতে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন-এনিয়ে দলের ভেতরে তখনই কথা ওঠে। রওশন সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান হলেও তাকে ডিঙ্গিয়ে কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে বিরোধী দলীয় উপনেতা করার কারণেও দলের সংসদ সদস্য ও নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ জন্মায়। যার কারণে জিএম কাদেরকে এসব দায়িত্ব দেওয়ার পর দলের কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন জ্যেষ্ঠ নেতারা। এমনকি সর্বশেষ গত ২০ জানুয়ারি এরশাদের ৯০তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানেও যোগ দেননি অধিকাংশ জ্যেষ্ঠ নেতা। এছাড়া এরশাদ যখন অসুস্থ তখন সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনে জাপার মনোনয়ন দেওয়াকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও ওঠে।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ১৭ জানুয়ারি রংপুরে গিয়ে জিএম কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন এরশাদ। এনিয়ে রওশন বেঁকে বসলে আবার রংপুর গিয়েই এরশাদ তিন মাস দশ দিনের মাথায় ওই বছরের ২৭ মার্চ জিএম কাদেরের ওপরে পদ দিয়ে রওশনকে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান করেন।

জিএম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান করার তিন বছর ২ মাসের মাথায় এই পদ থেকে তাকে বাদ দিলেন এরশাদ। আর এ বছরের ৪ জানুয়ারি বিরোধী দলের উপনেতা হিসেবে মনোনয়নের মাত্র ২ মাস ১৯ দিনের মাথায় এখান থেকেও কাদেরকে তিনি সরিয়ে দিলেন।

প্রসঙ্গত, দলের মহাসচিব পদেও গত পাঁচ বছরে তিন দফা পরিবর্তন এনেছেন এরশাদ। ২০১৪ সালের পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের তিন মাসের মাথায় ওই বছরের ১০ এপ্রিল দলের দীর্ঘ ১৪ বছরের মহাসচিব ও ঘনিষ্ঠ সহচর এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারকে সরিয়ে দিয়ে জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে মহাসচিব করেন। মাত্র পৌনে দুই বছরের মাথায় ২০১৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বাবলুকে বাদ দিয়ে ফের হাওলাদারকে মহাসচিব পদে বসান এরশাদ। সর্বশেষ একাদশ সংসদ নির্বাচনের কিছুদিন আগে গত বছরের ৩ ডিসেম্বর আবার হাওলাদারকে সরিয়ে দিয়ে এরশাদ মহাসচিব করেন মসিউর রহমান রাঙ্গাকে।