শিশুর দুরন্তপনা

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ১৪:১৩
 
শিশুর দুরন্তপনা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু কখনো কখনো এই দুরন্তপনা স্বাভাবিকের মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। বইপত্র, খেলনা, ঘরের জিনিসপত্র সব কিছু ভেঙে ফেলে কেউ কেউ। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব বাড়িতে বেড়াতে এলে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, আবার তাদের বাড়িতে গেলেও একই অবস্থা। শিশু মহলেও এই অতি দুরন্ত শিশুটি ত্রাসের সৃংষ্ট করে। অনেক বাবা-মা এই দুরন্তপনার ব্যাপারটি লক্ষ করতে চান না। তাদের কাছে এটা যেন শিশুর স্বাভাবিক ব্যবহারের অংশ। কিন্তু আসলে তা নয়।
 
অতি দুরন্ত শিশু যখন স্কুলে যায়, তখন স্কুল থেকেও চিঠি আসে অভিভাবকের কাছে যে, তার সন্তান দুরন্ত, অমনোযোগী এবং অন্য শিশুদের এতে সমস্যা হচ্ছে। এই দুরন্তপনা এক বিশেষ ধরণের মনোরোগ। আমরা যাকে বলি Attention Deficit Hyper Active Disorder বা সংক্ষেপে ADHD. সাধারণত তিন থেকে সাত বছরের শিশুদেরই এই রোগের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে দেখা যায়। ছেলে শিশুরা মেয়ে শিশুদের তুলনায় সাধারণত বেশি আক্রান্ত হয়। এই রোগের লক্ষণ হচ্ছে- চঞ্চলমনা, হঠাত্ সাত-পাঁচ না ভেবে কোনো কাজ করা, ছটফট স্বভাব ও দুরন্তপনা। এরা এত ছটফটে হয় যে, পড়ালেখায় মনোসংযোগ করতে পারে না। ক্লাসে এরা ভীষণ অমনোযোগী হয়। বাসায়ও পড়ালেখা করে না। ধৈর্যের এত অভাব যে, ছবি আঁকা, টিভি দেখাও এদের দিয়ে হয় না। অনেক শিশু আছে ঝগড়া বা মারামারি করলে তার আপাতদৃষ্টিতে কোনো কারণ থাকে। কিন্তু এসব শিশু কারণ ছাড়াই তা করে। যেমন, কোনো কারণ ছাড়াই অন্য শিশু বা ভাই-বোনকে চড়, থাপ্পড় দেয়া। এরা নিজেদের জিনিসপত্র সম্পর্কে উদাসীন ও সহজেই হারিয়ে ফেলে।
 
এই রোগের কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি। একে মনোরোগ বলে চিহ্নিত করা হলেও বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সে মস্তিষ্কের কিছু রাসায়নিক পদার্থ বা Neuro Transmitter-এর কম-বেশির জন্য এমন হতে পারে। Position Emission Tomogrophy (PET)-এর সাহায্যে জানা গেছে যে, রোগগ্রস্ত শিশুদের ডানদিকের মস্তিষ্কে মেটাবলিজম কম হয়। বংশগত, মানসিক ও মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট বৃদ্ধির নানারকম অসুবিধাও অনেকাংশে এ রোগের জন্য দায়ী।
 
শিশুদের এই রোগের চিকিত্সা পদ্ধতি প্রধানত দুই রকমের ওষুধের দ্ব্বারা এবং বিহেভিয়ার থেরাপি। বিহেভিয়ার থেরাপি এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ধীরস্থির হতে শিশুটিকে সবার সাহায্য করতে হবে। এখানে বাবা-মা, পরিবারের লোকজন ও স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকার যথেষ্ট সহনশীল হতে হবে ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। দৈনন্দিন জীবনে শিশুটির যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে, সে ব্যাপারেও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। শিশুর আত্মমর্যাদা বাড়াতে সাহায্য করতে হবে। এরকম অতি দুরন্ত শিশুর জন্য তার বাবা-মায়ের সামাজিক জীবন বিপর্যস্ত হতে পারে। কিন্তু তার জন্য তাকে মারধর বা রাগারাগি করা যাবে না। কারণ তাতে কোনোই লাভ হবে না। মনে করুন শিশুটি গ্লাস ভেঙে ফেলল, তখন তাকে বলতে হবে- আমরা গ্লাসে পানি খাই, তুমি গ্লাস ভেঙে ফেললে আমরা কিভাবে পানি খাব।
 
এই রোগের চিকিৎসায় মিথাইল ফেনিতেই ও ডেক্সট্রো অ্যাম্ফিটামিন ওষুধ ব্যবহার করা হয়। কোনো শিশুকে কোনটা বা কতটা দেয়া হবে তা অবশ্যই নির্ধারণ করবেন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ। অতি দুরন্ত শিশুর বাবা-মায়েরা অবশ্যই শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে তাদের শিশুটির ব্যাপারে যোগাযোগ করবেন।
 
সব শেষে একটি ব্যাপার লক্ষ করতে অনুরোধ করছি। প্রথমেও বলছি, শিশুর অতি দুরন্তপনা হচ্ছে এডিএইচডি যা কি না সামাজিক জীবন বিপর্যস্ত করে তোলে। স্বাভাবিক দুরন্ত শিশু নিয়ে বাবা-মায়েরা ঘাবড়ে যাবেন না। আর অতি দুরন্ত শিশুর ব্যাপারে সতর্ক হোন ও সঠিক চিকিত্সার মাধ্যমে তার যত্ন নিন।
 
ডা. ওয়ানাইজা
সহকারী অধ্যাপিকা, ফার্মাকোলজি অ্যান্ড থেরাপিউটিক্স
ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ।
চেম্বার: জেনারেল মেডিক্যাল হাসপাতাল (প্রা.) লি.,
১০৩, এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা