আদিবাসীদের জীবনযাত্রা দেখতে

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০১৯, ২১:০৬

বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থানগুলোর একটি হচ্ছে সাজেক ভ্যালি। এক সময় সাজেককে বলা হতো দুর্গম সাজেক। সেনাবাহিনীর হাতে পড়ে এখন আর জায়গাটি দুর্গম নেই। বেড়ানোর জন্য সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা ফিটফাট পর্যটন কেন্দ্র। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগ থেকে সাজেক ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। আমাদের উদ্দেশ্য সাজেকের পথটা উপভোগ করা এবং আদিবাসীদের জীবনযাত্রা দেখা।

১২ ফেব্রুয়ারি রাতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে যাত্রা শুরু করে সকাল ৮টায় খাগড়াছড়ি পৌঁছালাম। গাড়িতে হালকা ঠাণ্ডা লাগলেও তা ছিল সহ্য করার মতো। কিন্তু খাগড়াছড়ি নামার পর আর সহ্য করতে পারিনি। কিছুক্ষণ শীতের সাথে যুদ্ধ করার পর দেখতে পেলাম আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে অনেক পুরোনো কয়েকটি জিপ গাড়ি। যে গাড়িগুলো স্থানীয়ভাবে ‘চাঁদের গাড়ি’ নামে পরিচিত। সাজেক মূলত রাঙ্গামাটিতে অবস্থিত হলেও যেতে হয় খাগড়াছড়ি হয়ে। অনেক বেশি সুন্দর একটি জায়গা। খাগড়াছড়ি থেকে আসতে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টার মতো লাগে। দু-পাশের সৌন্দর্য দেখতে দেখে কখন যে পৌঁছাবেন টেরই পাবেন না। খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক আসার সারা পথে প্রচুর ছোট ছেলেমেয়ে দেখা যাবে। তারা হাত নাড়তে থাকবে। হাত নাড়ারা মানে হচ্ছে তাদেরকে চকলেট বা টাকা দেওয়া।

সাজেক ভ্যালিতে থাকার জন্য সুন্দর ব্যবস্থা রয়েছে। পৌঁছেই সবাই উঠে গেলাম রিসোর্টে। পাশের একটি হোটেলেই ছিল খাওয়ার ব্যবস্থা। ফ্রেশ হয়ে খাবার খাওয়া আর বিশ্রামের পর সবার যাত্রা এবার কংলাক পাহাড়ের চূড়ায়। যেখান থেকে সাজেকের প্রকৃত সৌন্দর্য দেখা যায়। সন্ধ্যার পর সাজেকের সত্যিকারের সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। আকাশের তারাগুলো খুব কাছে মনে হয়।

সকালে সাড়ে ৫টায় ঘুম থেকে উঠে হেলিপ্যাডে গেলাম সূর্যোদয় দেখতে। আমাদের মতো অনেকেই বের হয়েছে। অনেকে আমাদের আগেই বের হয়েছে। সাজেকের সূর্যোদয় অন্যরকম এক সৌন্দর্য, সব থেকে আলাদা। ছবি তোরার জন্য সবার মাঝে হৈ-হুল্লোড় পড়ে গেল। সকাল ১০টার মধ্যেই নাস্তা করে আমরা খাগড়াছড়ির দিকে রওনা দিলাম। সাজেকের উঁচু-নিচু পথ পাড়ি দিয়ে চলে এলাম খাগড়াছড়ি। খাগড়াছড়িতে ‘সিস্টেম’ নামে একটা রেস্টুরেন্ট রয়েছে। সেখানে দুপুরের খাবার খেলাম। যথেষ্ট ভালো খাবার। দুপুরে খাবারের মেন্যুতে ছিল চিকেন বাঁশ, বিভিন্ন ভর্তা, কাঠিতে ভাজা মাছ ইত্যাদি। খাবার খেয়ে আমরা চলে গেলাম আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রে। সেখানে ছিল আলুটিলা রহস্যময় গুহা। গুহার একপাশ দিয়ে ঢুকে হয়ে অন্যপাশ দিয়ে বের হওয়া যায়। গুহার ভেতর দিয়ে অল্প অল্প করে পানি প্রবাহিত হয়। গুহার ভেতর মশাল নিয়ে আমরা সবাই ঢুকেছি। ৩৬৮ ফুটের লম্বা মতো গুহাটি। ভালোই লেগেছে। এরপর চলে এলাম কাপ্তাই লেক। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত হলো তাঁবুতে থাকবো। যে কথা সেই কাজ। আধঘণ্টার মধ্যে তাঁবু রেডি! এরপর সবাই মিলে বারবিকিউ করে রাতের খাবার সেরে নিলাম। এবার ঘুমানোর পালা। কাপ্তাই লেকের পাড়ে  তাঁবু টানিয়ে ঘুমানো!-এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। সকালে ঘুম থেকে উঠে নাশতা করতে করতেই দেখি লেকের ঘাটে ছোটখাটো একটা ঝিঙি নৌকার সাইজ ট্রলার অপেক্ষা করছে। এত ছোট ট্রলারে সবার জায়গা হবে কি-না টেনশন থাকলেও তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। সারাদিন ট্রলারে চড়ে কাপ্তাই লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করলাম। ঝুলন্ত ব্রিজ, লাভ পয়েন্ট, বৌদ্ধবিহার, শুভলং ঘুরে দুপুরের একটু পরেই এসে পড়লাম আমাদের তাঁবুতে। সবাই প্রচণ্ড ক্লান্ত শরীর নিয়েই দুপুরের খাবার সেরে নিলো। এরপর সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত কাপ্তাই লেকে কায়াকিং। যে যার পছন্দমতো বোট নিয়ে নিয়ে কাপ্তাই লেকের পানিতে ভাসতে শুরু করলো। সব মিলিয়ে রোমাঞ্চকর অনেক অনুভূতির সাক্ষী হয়ে থাকলাম পুরো একটা ট্যুরে। ১৫ তারিখ রাতে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম নৃবিজ্ঞানের এক দল ভ্রমণপিপাসু।