ভালোবাসা আর ঐক্যের উদাহরণ

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০১৯, ২১:০৬

ক্রাইস্টচার্চের দুই মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার রক্তের দাগ কিছুতেই ভুলতে পারছেন না নিউজিল্যান্ডের শান্তিপ্রিয় জনগণ। এটা তো ভোলার মতো ঘটনাও নয়। স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করতে এসে ৫০টি তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়ার মতো শোক আর কী হতে পারে! সে কারণে মুসলমানদের প্রতি ভালোবাসা জানিয়ে তাদের শান্তনা দিতে সাধারণ মানুষ তো বটেই, স্বয়ং দেশটির প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আহডার্নও রাস্তায় নেমে এসেছেন। দাঁড়িয়েছেন নিহতদের স্বজনের পাশে। মুসলমানদের ধর্ম চর্চায় অভয় দিতে পাশে দাঁড়িয়েছে তারা। এমনকি মসজিদে হামলার ঘটনায় নিহতদের জন্য ক্রাইস্টচার্চের গির্জায় গির্জায় প্রার্থনাও করা হয়।

নিউজিল্যান্ডের মুসলমান নারীদের প্রতি সমর্থন জানাতে গত ২২ মার্চ দেশটির নারীরা একদিনের জন্য মাথাও ঢেকে রাখেন। এমন উদ্যোগ বিশ্ববাসীর দৃষ্টি কেড়েছে। ক্রাইস্টচার্চের মেমোরিয়াল পার্ক সমাধিক্ষেত্রে একজন নারী পুলিশকে মাথায় ওড়না পরে এবং বুকে লাল গোলাপ নিয়ে পাহারা দিতে দেখা গেছে।

এখনো ভাবায় আমাকে

তামিম ইকবাল

এখনো আমাকে ভাবায় বিষয়টি। মাত্র তো ৩০ সেকেন্ডের ব্যবধানে আমরা বেঁচে গেলাম।

সেদিন সকালেই স্থির করেছিলাম বাসে করে জুমার নামাজ পড়তে যাব মসজিদে। দুপুর দেড়টায় বাস ছাড়ার কথা। পূর্ব নির্ধারিত প্রেস কনফারেন্সে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ দু-মিনিট সময় বেশি নিয়ে নিলেন। আর এ দু-মিনিটই পার্থক্য গড়ে দিলো। বলতে পারেন বাঁচিয়ে দিলো। মসজিদের কাছাকাছি পৌঁছাতেই সহকর্মীরা কিছু একটা দেখতে পেল। আমি নিজে রাস্তায় একটি দেহ পড়ে থাকতে দেখি। তখন মনে হয়েছিল কেউ হয়তো মাতাল কিংবা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। স্বাভাবিকভাবে নিই বিষয়টি। বাস চলতে থাকে। মসজিদের কাছে থামতেই দেখি রক্তাক্ত অবস্থায় একজন শুধু চিত্কার করছে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলছে, মসজিদে গুলি চলছে। কেউ যেও না।

ভয় পেয়ে গেলাম। মাত্র ২০ গজ দূরে। বাস থেকে নেমেই মসজিদে প্রবেশ করার কথা। বাস থেকেই দেখতে পেলাম মসজিদের ফ্লোরে কয়েকটি দেহ পড়ে আছে। এটা দেখার পর হতবিহ্বল, কী করবো? যাদের মাথায় টুপি ছিল তারা সবাই টুপি খুলে ফেললো। যারা পাঞ্জাবি পরা অবস্থায় ছিল তারা জ্যাকেট পড়ে নিলো। এরপর বাসের মেঝেতে শুয়ে পড়লাম। বাস ড্রাইভারকে বললাম, কিছু একটা করুন। ড্রাইভার নড়লেন না। ৬/৭ মিনিট কেটে গেল। কোনো পুলিশও নেই। হঠাত্ স্পেশাল ফোর্স এলো ঝড়ের বেগে। আমরা সবাই তখন চিত্কার করে বলছি, আমাদের যেতে দাও।

ড্রাইভার কি কারণে যেন আরো কয়েক মিটার এগিয়ে নিলেন। তখন আমরা সবাই আশা ছেড়ে দিয়েছি। আমরা বাসের মাঝখানের দরজায় ধাক্কা ও লাথি মারতে শুরু করলাম। এই করতে করতে প্রায় ৮ মিনিট সময় চলে গেল। কী করবো? একবার ভাবলাম, সবাই পার্কের ভেতর দিয়ে দৌড় দেবো। পেছনে ভয়, যদি বন্দুকধারী আমাদের দেখে গুলি করতে শুরু করে।

খালি চোখে মৃত্যুকে দেখেছি। এটা সহজে ভুলতে পারবো না। একটু এদিক-সেদিক হলেই সব শেষ হয়ে যেত। আসলেই ৩০ সেকেন্ডের ব্যাপার।

হূদয় কেঁপে উঠেছিল

মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন

বেশ ছোট মসজিদটা। তবে দেখতে মসজিদের মতো নয়। পুরো কাঠামোটাই আমাদের দেশের মসজিদের চেয়ে আলাদা। ভেতরটা অনেকটা অ্যাপার্টমেন্টের মতো। ক্রাইস্টচার্চে নিউজিল্যান্ড সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডের আগে আমিও তো দলের সবার সঙ্গে ওই মসজিদে নামাজ পড়েছি।

আমাদের দেশে মসজিদগুলোর সামনে অনেক দরজা থাকে। আর ওই মসজিদে একটা দরজা দিয়ে ঢুকতে হয়, ওটা দিয়েই বের হতে হয়। মানুষ যে নৃশংস ঘটনা থেকে বাঁচবে সেই উপায়ও নেই। এ কারণে হতাহত এত বেশি।

বাংলাদেশে যেমন পাড়া-মহল্লায় একাধিক মসজিদ, ওখানে তো তা নয়। ক্রাইস্টচার্চের হ্যাগলি ওভালের খুব কাছে বলেই আমরা ওই মসজিদে নামাজ পড়ি। আগে থেকেই সবাই চিনতো বলেই সবাই ওখানেই নামাজ পড়তে গিয়েছিল। মাঠ থেকেও বেশিদূরে নয়। সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই এ খবর দেখে হূদয় কেঁপে উঠেছিল। ঢোকার যে পথে ওই লোকটা গুলি ছুঁড়েছে, ১ মাস আগেই ওখান দিয়ে যাওয়া-আসা করেছি।

সেদিন মিরাজের সঙ্গে একটা বিষয় নিয়ে বেশ রসিকতা করেছি। দেশে যখন কোনো মসজিদে নামাজ পড়তে যাই অভ্যাসবশত চুরি হয়ে যাওয়ার ভয়ে স্যান্ডেল বা জুতা হাতে নিয়ে ভেতরে ঢুকি। ওখানেও যখন হাতে জুতা নিয়ে ঢুকছি মিরাজ তখন বলছে, ‘এটা বাংলাদেশ না, নিউজিল্যান্ড! এখানে তোর জুতা কে নেবে?’

অথচ এই নৃশংস ঘটনার পর মনে হলো, জুতা কেউ নেবে না, কিন্তু মানুষের জীবনটাই তো নিয়ে গেল!’