চম্পট টু চাঁপাই

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০১৯, ২১:০৭

রাজশাহী শহর থেকে বাসে দেড়ঘণ্টার পথ। বাস চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিশ্বরোডে থামলে আমরা সবাই নেমে পড়লাম। সেখানে আমাদের সঙ্গে যোগ দিলো আমাদের আরেক বন্ধু। সে চাঁপাইনবাবগঞ্জের স্থানীয়। তাই আমাদের ঘুরে নিয়ে বেড়ানোর দায়িত্ব দিলাম তার হাতেই। সকালে নাস্তা করা সত্ত্বেও বন্ধুর জোরাজুরিতে আরেকবার নাস্তা করতে হলো। নাস্তা শেষে দুটো মাহেন্দ্র ভাড়া করে আমরা রওনা দিলাম ছোট সোনা মসজিদের উদ্দেশ্যে।

ছোটবেলায় ‘জার্নি বাই ট্রেন’ প্যারাগ্রাফে আমরা সবাই লিখেছিলাম, ‘জানালার বাইরে যতদূর চোখ যায় শুধু ধানক্ষেত আর ধানক্ষেত।’ তেমনভাবে যদি ‘জার্নি বাই মাহেন্দ্রা’ নামে একটা প্যারাগ্রাফ লেখা যেত তবে এই লাইনটা সামান্য পরিবর্তন করে লিখতে হতো, ‘বাইরে যতদূর চোখ যায়, শুধু আমগাছ আর আমগাছ।’ একটুও বাড়িয়ে বলছি না, হাতেগোনা কয়েকটি স্থান বাদে পুরো পথটার দু-ধারেই সারিসারি করে আমগাছ লাগানো। গাছগুলোর প্রতিটি ডালপালা সদ্য সেজে উঠেছে মুকুলের অলঙ্কারে। খানিকক্ষণ চোখ বুজে থাকলে মুকুলের তাজা ঘ্রাণে কেমন যেন একটা নেশা লেগে যায়।

প্রায় সোয়া ১ ঘণ্টা পর আমরা পৌঁছে গেলাম শিবগঞ্জ থানায়। সেখানেই প্রাচীন বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য ও শিল্প-সংস্কৃতির সাক্ষী হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে ছোট সোনা মসজিদ। রাস্তার একেবারে কিনার ঘেঁষে মসজিদটির অবস্থান। সুলতান আলা-উদ-দীন শাহের শাসনামলে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন ওয়ালি মোহাম্মদ নামের এক ব্যক্তি।  ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায় ছোট সোনা মসজিদের আসল নাম হলো ‘গৌড়ের রত্ন’। কিন্তু তত্কালীন গৌড়ে সুলতান নুসরত শাহ আরেকটি মসজিদ নির্মাণ করেন, যা আকারে গৌড়ের রত্নের তুলনায় বড়। তাই স্থানীয় লোকজনের কাছে গৌড়ের রত্ন প্রচলিত হয় ছোট সোনা মসজিদ নামে আর সুলতান নুসরত শাহ নির্মিত মসজিদটি বড় সোনা মসজিদ নামে।

ছোট সোনা মসজিদ যে শুধুমাত্র প্রাচীন বাংলার ইতিহাসই ধারণ করে আছে তা কিন্তু নয়, মসজিদ প্রাঙ্গণের দক্ষিণ-পূর্বদিকে তাকালে চোখে পড়ে দুটি সমাধি। যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর নাজমুল হক।

আমরা যখন ছোট সোনা মসজিদ থেকে বের হলাম সূর্যের তেজ তখন সর্বোচ্চ। রোদের তীব্রতায় দু-চোখ খুলে রাখা দায়। স্থানীয় বন্ধু জানালো, আমাদের পরবর্তী গন্তব্যস্থলে তেমন ভালো কোনো হোটেল নেই। তাই সবাই মিলে ঢুকে পড়লাম কাছের একটি হোটেলে। দুপুরের খাবার সেরে আবার উঠে পড়লাম মাহেন্দ্রতে। পরবর্তী গন্তব্যস্থল ভারত-বাংলাদেশ বর্ডার। প্রায় মিনিট ১৫ পর পৌঁছে গেলাম বর্ডারে। সেখানে দেখার মতো কিছু না পেলেও পেয়ে গেলাম ‘বাংলাদেশের শেষ সীমানা, অতিক্রম নিষেধ’ লেখা সাইনবোর্ড। যেহেতু ‘অতিক্রম নিষেধ’ লেখা সেহেতু অতিক্রম না করলে কী চলে? সবাই সেই সাইনবোর্ডকে অতিক্রম করে ছবি তুলতে লাগলাম। ছবি তোলা শেষে সেখান থেকে চলে গেলাম চামচিকা মসজিদে।

বর্ডার থেকে চামচিকা মসজিদে যেতে সময় লাগলো প্রায় মিনিট পাঁচেকের মতো। এখানে একটা কথা না বললেই নয়—মসজিদটির নাম খানিকটা বিদঘুটে শোনালেও মসজিদটি দেখতে অত্যন্ত চমত্কার! ধারণা করা হয় ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে কোনো এক রাজবিবি এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। যে কারণে এটি ‘রাজবিবি মসজিদ’ নামেও পরিচিত। তবে স্থানীয় কয়েকজনের কাছে ‘চামচিকা’ নামকরণের ব্যাখ্যা জানতে চেয়ে হতাশ হতে হলো। কেউই সেভাবে উত্তর দিতে পারলেন না। তবে কারো কারো ভাষ্যমতে, আগে এই মসজিদটি ছিল চামচিকাদের অভয়ারণ্য। সেখান থেকেই স্থানীয়দের মুখে মুখে এটি প্রচলিত হয় চামচিকা মসজিদ নামে।

তবে ইতিহাস দেখলে খোঁজ মেলে নামকরণের পেছনের আরেকটি ব্যাখ্যা। মসজিদটি দেখতে অনেকটা মালদহের চামকাটি মসজিদের মতোই। সেখান থেকেই এই মসজিদের নামকরণ করা হয়েছিল চামকাটি মসজিদ, যা পরবর্তীতে পরিবর্তিত হয়ে রূপ নেয় চামচিকা মসজিদে। যারা এরইমধ্যে নামকরণের গোলকধাঁধায় পড়ে গিয়েছেন তাদের উদ্দেশ্যে জানিয়ে রাখি মসজিদটির আরেকটি সুন্দর নাম আছে। তা হলো খনিয়াদিঘী মসজিদ।

আমাদের পরবর্তী গন্তব্যস্থল তোহাখানা। এটিও শিবগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত প্রাচীন বাংলার একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। চামচিকা মসজিদ থেকে মাহেন্দ্র করে তোহাখানায় যেতে সময় লাগলো ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মতো। তোহাখানা মূলত তিনতলা বিশিষ্ট একটি রাজপ্রাসাদ। তোহাখানা একটি ফার্সি শব্দ, যার আভিধানিক অর্থ ঠাণ্ডা প্রাসাদ। ইতিহাস থেকে জানা যায়, মুঘল সম্রাট শাহজাহানের পু্ত্র শাহ সুজা বাংলার সুবেদার থাকাকালে তার মুরশিদ হযরত শাহ সৈয়দ নেয়ামতউল্লাহর প্রতি ভক্তি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে নির্মাণ করেছিলেন এই তাপনিয়ন্ত্রিত ইমারত। তোহাখানা কমপ্লেক্সের ভেতরে বেশকিছু সমাধি লক্ষ্য করা যায়, যাদের পরিচয় এখনো ইতিহাস সঠিকভাবে দিতে পারেনি। তবে ধারণা করা হয় এরা সকলেই শাহ সৈয়দ নেয়ামতউল্লাহর সহচর ছিলেন।

তীব্র রোদের কারণে একটু পরপরই ক্লান্তি এসে ভিড় করছিল দেহে। তাই খানিকটা বিশ্রাম নেওয়ার জন্য সবাই তোহাখানাসংলগ্ন দিঘীর পাড়ে গিয়ে বসলাম। খানিকক্ষণ পর দেখি কোথা থেকে তিনটি শিশু এসে দিঘীর পাড়ে দাঁড়ালো। তারা উচ্ছ্বসিত, কিন্তু খানিকটা সন্দিহান চোখে অপলক তাকিয়ে আছে দিঘীর পানির দিকে। একজনের পড়নে তার দেহের সমান লুঙ্গি। লুঙ্গির গিট্টু বাঁধতে না পারায় সে কোনোমতে দুই হাত দিয়ে লুঙ্গির দুই প্রান্ত ধরে আছে। বাকি দু’জন দিঘীর পাড় থেকে একটি দড়ির ন্যায় বস্তু টান দিতেই দিঘীর পানি থেকে একটি মাছ ছটফট করতে করতে পাড়ে এসে পড়ল। তাদের আনন্দ দেখে কে! তোহাখানা কমপ্লেকাস ঘুরে আমরা সকলেই হাজির হলাম শিবগঞ্জ বাজারে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাম, অথচ বিখ্যাত আদি চমচম না খেয়ে ফিরবো, তা কী হয়? আকারভেদে এখানে দু-রকমের চমচম পাওয়া যায়, ছোট ও বড়। তবে স্বাদে কোনো ভিন্নতা নেই। টেবিলে চমচম দিতে দিতে ওয়েটার জানালেন, বড় আকারের ৬টি চমচমের ওজন হয় ১ কেজি। অর্থাত্ একেকটির ওজন প্রায় ১৬৬ গ্রাম।

চমচমের সঙ্গে আরো দুই প্রকারের মিষ্টি পাওয়া যায়, লালমোন ও দম। তিনরকমের মিষ্টির স্বাদ মুখে লাগিয়ে আমরা রওনা হলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের উদ্দেশ্যে। এবার ফেরার পালা। আবার রুটিনের শেকড়ে জীবনকে বেঁধে ফেলার পালা। তবে তার আগে পুরো একটি বিকেল আমাদের জন্য অবসর। সূর্যের তেজ ততক্ষণে অনেকটাই কমে গেছে। মাহেন্দ্রতে বসেই আমরা গান ধরলাম। কখনো বা আধুনিক, কখনো বা ভাটিয়ালি গানের সুরে সুরে আমরা এগুতে থাকলাম আমাদের চিরচেনা যান্ত্রিকজীবনের দিকে। তবে স্থানীয় এক বন্ধু নিয়ে গেল তার বাসায়। সেখানে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ হাতে জম্পেশ একটি আড্ডা হলো বন্ধুর পরিবারের সঙ্গে। আমাদের আড্ডা যখন শেষ হলো তখন সূর্য তার সমস্ত রঙ আকাশে ছড়িয়ে দিয়ে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত। তাই আমরা আর বেশি দেরি না করে বন্ধুর বাসা থেকে সোজা চলে এলাম বিশ্বরোড মোড়ে। খানিকক্ষণ পর একটি রাজশাহীগামী বাস এসে দাঁড়ালো। আমরা সবাই শেষবারের মতো পুরো শহরটা দেখে নিয়ে বাসে উঠলাম।

ধীরে ধীরে বাসের গতি বাড়তে লাগলো। আমরা এগুতে থাকলাম আমাদের রুটিনে বাঁধা চিরচেনা জীবনের পথে।

 

ছবি : লেখক