দর্শনীয় গির্জার ইতিকথা

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০১৯, ২১:০৯

উত্তরের নীলফামারীর সৈয়দপুর শহর একটি বাণিজ্যিক শহর। রংপুর ও দিনাজপুরের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত এই শহরে বাস, ট্রেন ও বিমান যোগাযোগ রয়েছে। ফলে নানা শ্রেণির মানুষ এখানে বসবাস শুরু করেন। দেশের বৃহত্তম সৈয়দপুর রেলওয়ে ১৮৭০ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সেসময় ইংরেজ ও ব্রিটিশদের আনাগোনা বেড়ে যায়। তারা চিত্তবিনোদনের জন্য যেমন তৈরি করেন ক্লাব তেমনি প্রার্থনার জন্য গড়ে তোলেন দর্শনীয় গির্জাও। এরমধ্যে রয়েছে একটি ক্রেইস্টচার্জ ও অপরটি ক্যাথলিক গির্জা। যা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে এর নির্মাণশৈলী দিয়ে।

উত্তরের ব্যবসা-বাণিজ্য কেন্দ্র নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের গোড়াপত্তন হয় ব্রিটিশ কোম্পানি শাসনামলে। আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে স্থাপিত হলে সৈয়দপুরের গুরুত্ব বেড়ে যায় বহুগুণ। সেসময়ে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের সৈয়দপুর ছিল একটি ছোট্ট রেলওয়ে স্টেশন। এই স্টেশনের ঠিক উত্তর পার্শ্বে স্থাপন করা হয় ছোট একটি লোকোশেড। এই লোকোশেডটি ছিল আজকের দেশের বৃহত্তম সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার ভিত্তিভূমি। পরবর্তীতে লোকোশেডটিকে ঘিরেই ১১০ একর জমি নিয়ে গড়ে তোলা হয় বিশাল রেলওয়ে কারখানাটি। এ কারখানাটি স্থাপনে ব্রিটিশরা বিবেচনায় নিয়েছিল এর অবস্থান, জলবায়ু ও পরিবেশগত অবস্থান। এ কারখানায় বাঙালি ও বিহারীর সাথে কাজ করতো বহু ব্রিটিশসহ অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ক্যাথলিক প্রোটেস্টান্ট খ্রিস্টান। এদের বসবাসের জন্য গড়ে তোলা হয় বেশ ক’টি আবাসিক এলাকা। এরমধ্যে সাব-অর্ডিনেট কলোনি, সাহেবপাড়া ও অফিসার্স ক্লাব অন্যতম।

১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে তাদের ধর্মীয় উপাসনার জন্য ব্রিটিশ সরকার সাহেবপাড়ার দু-প্রান্তে দুটি গির্জা নির্মাণ করে। এর একটি ছিল রোমান ক্যাথলিক ও অপরটি প্রোটেস্টান্ট সম্প্রদায়ের। এ গির্জা দুটি উত্তরাঞ্চলের সর্বপ্রথম ও প্রাচীনতম গির্জা। এর নির্মাণশৈলী রোমান ও ইউরোপীয় স্থাপত্য কলায় সমৃদ্ধ। ব্রিটিশ সরকার ১৮৯২ সালে গির্জার পাশেই রেলওয়ের ৩ বিঘা জমির ওপর পুরোহিত ভবন নির্মাণ করে। তখন ফাদার ফ্রান্সিস বোক্কা লিমে যিশু খ্রিস্টের ভক্ত-অনুরাগীদের নিয়ে আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন।

১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর ইংরেজ ও অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা নিজ নিজ দেশে ফিরে গেলেও কিছুসংখ্যক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান থেকে যায়। এছাড়াও অন্যান্য খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোক বলতে ঢাকা, মানিকগঞ্জ, বরিশাল, পাবনা, কুষ্টিয়াসহ প্রভৃতি জেলার অধিবাসী চাকরি করতে এসে এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের আগ পর্যন্ত এখানে খ্রিস্টযোগ সংঘবদ্ধভাবে বাইবেল পাঠ, উপদেশ, প্রার্থনা পরিচালনা করতেন অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা। স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরুর কিছুদিন আগে অনেকে চট্টগ্রাম ও ঢাকা চলে যান। অনেকে আবার দেশ ছেড়েও চলে যান।

স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ১৬ এপ্রিল সৈয়দপুরে নির্বিচারে গণহত্যা শুরু হলে অবাঙালি ও পাকসেনাদের হাতে শহীদ হন বেশ ক’জন খ্রিস্টান। যুদ্ধের সেই ভয়াবহ সঙ্কটকালেও ক্যাথলিক ও প্রোটেইান্ট সম্প্রদায়ের বহু খ্রিস্টভক্ত গির্জা ও সিস্টারদের কনভেস্টে অবরুদ্ধ জীবনযাপন করে। ব্রিটিশ ও অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা চলে যাওয়ার পর সৈয়দপুরে বাঙালি খ্রিস্টভক্ত ও খ্রিস্টানদের বিভিন্ন বিপদে যারা এগিয়ে আসেন তারা হলেন ফাদার কালিন্তস কোডাইয়া, ফাদার পরিবলদি, ফাদার রায়ারবয়েন ও ফাদার প্যাট্রেক গমেজ অন্যতম।

সৈয়দপুরের পুরোনো গির্জা ও পুরোহিত ভবন নির্মাণের পর সিস্টার্স অব চ্যারিটি সম্প্রদায়ের সিস্টাররা এই ধর্মপল্লীতে আসেন। পরে এদের প্রচেষ্টায় সেন্ট জেরোজা নামে একটি স্কুল চালু করা হয়। সেখানে এখনো সুনামের সাথে ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করছে।

ইংরেজ ও অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা নিজ নিজ দেশে ফিরে গেলেও তাদের নির্মিত রোমান ক্যাথলিক ও প্রোটেস্টান্ট গির্জায় প্রতি রবিবার এখনো প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া বড়দিনসহ বিশেষ দিবসে দেশ ও জাতির সমৃদ্ধি কামনা করে প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এসব দেখাশোনার দায়িত্বে রয়েছেন বাঙালি খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোকজন।