গাজী নাসিমুর রেজা
অতি সমপ্রতি লিফট দুর্ঘটনায় ১২ জন গুরুতর আহত এবং একজন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এই ধরনের ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে ঢাকাস্থ জজ কোর্টের মতো জায়গায় কেন লিফট ছিঁড়ে পড়বে? আবার ঢাকাস্থ শান্তিনগরে আধুনিক বহুতল ভবনে লিফটের দরজার ত্রুটির কারণে এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এর জবাবদিহিতা কে করবেন? এই ধরনের ক্রটিজনিত দুর্ঘটনা কোনো নিছক দুর্ঘটনা নয়। এটা হলো দায়িত্বহীনতা। কারণ গাড়ি হলো ‘হরিজেন্টাল ট্রান্সপোর্ট’, আর লিফট হলো ‘ভার্টিকেল ট্রান্সপোর্ট’। কিন্তু কারিগরি প্রযুক্তির দিক দিয়ে ভার্টিকেল ট্রান্সপোর্ট সম্পূর্ণরূপে পৃথক ধরনের প্রযুক্তি। যেমন- যানবাহনের কোনো কিছু অকেজো হলে অর্থাত্ ব্রেক ফেইল করলে নির্ঘাত দুর্ঘটনা ঘটবে। কিন্তু লিফট কারিগরিতে কোনো যন্ত্রাংশ অকার্যকর হলে তাত্ক্ষণিকভাবে লিফট থেমে যাবে। অর্থাত্ কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা নেই।
প্রকৃতপক্ষে লিফট প্রযুক্তি হচ্ছে ফেইল সেফ (Fail Safe Technology) প্রযুক্তি নির্ভর। তারপরও কেন দুর্ঘটনা ঘটছে? আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী যে কোনো লিফটের ন্যূনতম পক্ষে ৬ (ছয়)টি নিরাপত্তামূলক (Safety Device) যন্ত্র থাকা বাধ্যতামূলক। এসব নিরাপত্তামূলক যন্ত্র ছাড়াও লিফট চলাচলে কোনো প্রতিবন্ধকতা হয় না বিধায় ব্যবহারকারী, স্বত্বাধিকারী, রক্ষণাবেক্ষণ কোম্পানিসমূহ নিরাপত্তামূলক যন্ত্রাংশসমূহের কার্যকারিতা নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন না। এমনকি দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, ভবনসমূহের মালিক, ছোট ছোট ডেভেলপার নির্মাণ খরচ হ্রাস করার জন্য সেফটি যন্ত্রাংশ বাদ দেন। অথবা নিম্নমানের অকার্যকর যন্ত্রাংশ স্থাপন করে থাকেন। সাম্প্রতিককালে গড়ে উঠা একশ্রেণির লিফট রক্ষণাবেক্ষণ কোম্পানিসমূহের কাজের ব্যাপারে পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই। তারা অত্যন্ত নিম্নদরে মাসিক/বাত্সরিক চুক্তি দরে লিফট রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকেন। ফলে পর্যায়ক্রমে লিফটের গুণগত মান বহুলাংশে হ্রাস পেতে থাকে যা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এজন্য লিফটসমূহ দায়িত্বশীল নামী-দামি প্রতিষ্ঠান দ্বারা রক্ষণাবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, অতি সম্প্রতি জজ কোর্টে লিফটের রোপ ছিঁড়ে/স্লিপ করে দুর্ঘটনায় ১২ (বার) জন আহত হয়েছেন। এক্ষেত্রে লিফটের নিরাপত্তামূলক কার্যকর যন্ত্রাংশ যেমন, স্পিড গভর্নর, সেফটি গিয়ার, আপার ও লোয়ার ফাইনাল লিমিট, বাফার প্রভৃতি যন্ত্রাংশের যে কোনো একটি কার্যকর থাকলে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকতো না। কিন্তু লিফট পিটে থাকা ‘বাফার’ যা শক অবজারভারের মত কাজ করে থাকে তার যে কোনো একটি কার্যকর থাকলে তাত্ক্ষণিকভাবে মটর ব্রেক কার্যকর হয়ে লিফট থেমে যেত। লিফট ছিঁড়ে দুর্ঘটনা বর্তমান বিশ্বে নেই বললেই চলে। লিফটের দুর্ঘটনা প্রায় ৯৫-৯৮% হয় লিফটের দরজার ক্রটিজনিত কারণে। দরজার সেফটি ডিভাইসসমূহ অর্থাত্ ‘ফুল হাইট ডোর সেন্সর’ (Full Height Door Sensor) এবং ‘ডোর কন্টাক্ট’ (Door contact) যন্ত্রাংশসমূহ কার্যকর না থাকলে, দরজা খোলা অবস্থায় লিফট কেবিন চলাচল করতে পারে। যার কারণে অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। এমনটি শান্তিনগরে বহুতল ভবনে ঘটেছিল বলে প্রতীয়মান হয়। অনেক সময় বলা হয়ে থাকে, অধিক যাত্রী উঠার জন্য লিফট পড়ে গেছে। যা সম্পূর্ণরূপে একটি ভ্রান্ত ধারণা। লিফটের ওয়েট সেন্সর কার্যকর থাকলে অধিক যাত্রী ওঠার সুযোগ নেই। কারণ পূর্ব নির্ধারিত ওজনের অতিরিক্ত হলে লিফটের দরজা বন্ধ হবে না অর্থাত্ লিফট চলাচল করবে না।
লিফটের বিষয়ে পেশাজীবীরা (১) গুণগত মান ৩৫% (২) স্থাপন ৪৫% ও (৩) বিক্রয়োত্তর সেবা ১৫% বিবেচনা করে থাকেন। এক্ষেত্রে গুণগত মান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাধারণ জনগণের পক্ষে গুণগত মান নির্ধারণ করা খুবই কষ্টকর। এক্ষেত্রে তারা সাধারণত ব্র্র্যান্ড নাম, প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, মূল্যের উপর বেশি নির্ভর করে থাকেন। আমরা জানি, স্থানীয় এজেন্ট/স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক লিফটের যন্ত্রাংশ আমদানি করা হয়। পরবর্তীতে স্থানীয় কোম্পানি/প্রতিষ্ঠান দ্বারা যন্ত্রাংশসমূহ পর্যায়ক্রমে সংযোজন করে স্থাপন করতে হয়। এক্ষেত্রে সামান্য ভুল-ক্রটি হলে, এমনকি গাইড রেল (Guide Rail) ৪ ডিগ্রি এর বেশি পার্থক্য হলে অথবা অন্য কোনো ক্রটির জন্য স্থাপিত লিফটটি যথাযথভাবে কাজ করবে না। যার জন্য লিফট স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা, জনবল, যন্ত্রপাতি, দায়িত্ব, কর্তব্য, সুনাম প্রভৃতি বিবেচনায় নিতে হবে। অন্যদিকে অনেক স্থানীয় প্রতিষ্ঠান বিশ্বের নামী-দামি বিখ্যাত ব্র্যান্ডের স্থানীয় এজেন্ট। কিন্তু তারা দক্ষ জনবলের অভাব, খুচরা যন্ত্রাংশের মজুত না থাকা এবং উচ্চমূল্য থাকার কারণে যথাযথ বিক্রয়োত্তর সেবা প্রদান করতে পারে না। ফলে ব্যবহারকারী নানা প্রকার অসুবিধা ভোগ করে থাকেন। বর্তমানে অনেক ভবনে দামি ব্র্যান্ডের লিফট বিক্রয়োত্তর সেবা না পাওয়ায় স্থানীয় বাজারে সহজলভ্য, সহজ কারিগরি সম্পন্ন (Friendly Technology) লিফট দ্বারা প্রতিস্থাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। সর্বোপরি ক্রয়ক্ষমতা, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, স্থানীয় বাজারের সহজলভ্য যন্ত্রাংশ, দেশে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনবল, স্থানীয় স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানের গুণগত মান ও বিশ্বস্ততা, পে ব্যাক (Pay Back) প্রভৃতি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
লিফটের সার্ভিসিং বা রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী দৈনিক, মাসিক, অর্ধবার্ষিক এবং বার্ষিক ভিত্তিতে যন্ত্রপাতি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। এছাড়া লিফট যথাযথভাবে স্থাপন না হলে লিফট চলাচলে বিঘ্ন ঘটবে। সর্বোপরি যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া লিফট পরিচালনা করলে যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থেকেই যায়। এসব ব্যাপারে আমাদের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
n লেখক : তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী,
গণপূর্ত ই/এম সার্কেল, চট্টগ্রাম
E-mail:[email protected]
