জনসংখ্যা ও যানজটের জাঁতাকলে বাংলাদেশ

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০১৯, ২১:৩৩

হিমেল আহমেদ

যানজট বাংলাদেশের প্রধান একটি সমস্যায় পরিণত হয়েছে যা বলার অপেক্ষায় নেই। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, টাংগাইল, বগুড়াসহ দেশের প্রায় জনবহুল শহরে যানজট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। যানজটের কারণে নষ্ট হচ্ছে সময়। কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় লাগছে দ্বিগুণ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে সবাইকে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা। যাকে একসময় মসজিদের আর মসলিন কাপড়ের শহর বলা হতো। সেই ঢাকা আজ যানজটের ঢাকা। বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র, রাজধানী, বৃহত্তম মহানগরী এই ঢাকা শহর।  যা আজ বিশ্বের কাছে তার জৌলুস আর সম্মান হারাচ্ছে। এটা কিন্তু মোটেও সুখবর নয় আমাদের জন্য। যত দিন যাচ্ছে ততই রাজধানী ঢাকার অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বসবাসের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। সম্প্রতি সারাবিশ্বে যানজটের শহরের মধ্যে প্রথম স্থান দখল করেছে আমাদের ঢাকা। বহুজাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘নামবিও’র প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ট্রাফিক ইনডেক্স-২০১৯-তে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, মানুষ সময় বাঁচাতে গণপরিবহন বাদ দিয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করছে। এতে করে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা বেড়ে গেছে। বর্তমান যান্ত্রিক জীবনে সময়ের মূল্য অনেক বেশি। মানুষ তার গন্তব্যে পৌঁছানোর লক্ষ্যে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে যাচ্ছে। রাজধানী ঢাকায়; যেখানে জীবনযাত্রা এতটাই ব্যস্ত হয়ে গিয়েছে যে মানুষের কাছে জীবনটা একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান একটি সমস্যা হলো জনসংখ্যা। ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। বাংলাদেশের আয়তন অনুযায়ী জনসংখ্যা অধিক। বহুদিন ধরে প্রায় সব সমস্যা আর সংকটের উপসর্গ হিসেবে এই অধিক জনসংখ্যা বিবেচিত হচ্ছে। যেটার আশু সমাধানও পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ভালো খবর হলো ২০১৩ সাল থেকে একই হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। অর্থাত্ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৩৭ শতাংশেই স্থির রয়েছে। সরকার দেশের জন্মনিয়ন্ত্রণ ও জনসংখ্যা হ্রাসে কাজ করে যাচ্ছে তবুও যেন মূল্যবোধ ও সচেতনতার অভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পুরোপুরিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ফলে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে দেশের সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে ক্রমাগত দেশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। বর্তমানে এই অধিক জনসংখ্যাই দেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই যানজট নিরসনের উদ্যোগ নেওয়ার আগে জনসংখ্যা আয়ত্তের মধ্যে রাখার পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টের তথ্য অনুযায়ী ঢাকার জনসংখ্যা বর্তমানে এক কোটি ৭০ লাখ, যা ২০৩০ সালের মধ্যে পৌঁছে যাবে দুই কোটি ৭৪ লাখে। বাংলাদেশের সবচাইতে জনবহুল নগরী রাজধানী ঢাকা। উইকিপিডিয়া বলছে বিশ্বের বৃহত্তম নবম শহর আমাদের ঢাকা। আয়তন ও সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী ঢাকায় সর্বাধিক ৩০ লাখ লোক সুষ্ঠুভাবে বসবাস করতে পারে, কিন্তু  সেখানে স্থায়ীভাবে বাস করছে প্রায় এক কোটি ৭০ লাখ মানুষ। বিভিন্ন কাজে প্রতিদিনই লাখ লাখ মানুষ ঢাকায় আসছে, অনেকেই স্থায়ী বসবাস করছে। ফলস্বরূপ ক্রমান্বয়ে ঢাকা ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। অতিরিক্ত লোক সমাগমের কারণে বসতি নির্মাণের জন্য খাল, বিল, পুকুর, নদী ভরাট করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কেটে ফেলা হচ্ছে বনাঞ্চল। কর্মসংস্থানের কারণে নির্মাণ করা হচ্ছে নতুন নতুন কল-কারখানা। ক্রমাগত নাভিশ্বাস হয়ে উঠছে প্রাকৃতিক পরিবেশ। এখন প্রশ্ন হলো, কেন এত লোক ঢাকায় আসে? কেন জীবিকা নির্বাহের জন্য মানুষ ঢাকাকেই পছন্দের তালিকায় প্রথম রাখে? কেননা ঢাকা অন্য সব শহরের তুলনায় উন্নত বেশি। ঢাকাতেই রয়েছে দেশের সব বড় বড় প্রতিষ্ঠান। আছে স্কুল, কলেজ, ক্লিনিক, হাসপাতাল। তাই মানুষ উন্নত সেবা পেতে ঢাকাতেই ভিড় করে। ঢাকার আদলে দেশের অন্যান্য শহরকে গড়ে তুলতে হবে। ঢাকাকেন্দ্রিক মানুষদের নিজ শহরমুখি করাটা খুবই জরুরি। এতে করে ঢাকার উপর অতিরিক্ত চাপ কমবে বলে আমি আশা করি। বাংলাদেশে যাত্রী অনুযায়ী পাবলিক যানবাহনের সংখ্যা কম। যানবাহন বাড়লে যানজটও বাড়বে। তাই ব্যস্ততম সকল সড়ক প্রশস্ত করা জরুরি। ক্রমে বাংলাদেশ উন্নত হচ্ছে। বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়। মানুষ তাই ব্যক্তিগত পরিবহনে ঝুঁকছে। দেশের বিভিন্ন সড়ক প্রসারিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুই লাইন থেকে চার লাইন সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। এটা নিঃসন্দেহে সরকারের ভালো উদ্যোগ দেশের যানজট নিরসনে। রাস্তা যত প্রশস্ত হবে যানজট ততই কম হবে। প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে ঢাকাকে নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা হাতে নেওয়ার কথা বলেছেন। যা সত্যিই আনন্দের। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ  ও যানজট নিরসনে সরকার আরো উদ্যোগী হোক এই প্রত্যাশা সকলের।

n লেখক:শিক্ষার্থী, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া