সবুজ ছায়ায় ঘেরা ক্যাম্পাসে দলভুক্ত ছাত্রীরা দুর্বা ঘাসের ওপর বসা। কেউ বই-পত্রিকা পড়ছে, কেউ খেলা করছে, কেউবা মজার গল্পে মেতে উঠেছেন। কলেজের হোস্টেলে থাকা ছাত্রীদের সকাল-বিকালের এ চিত্র প্রতিদিনের। এছাড়া কলেজ চলাকালীন হাজারো বই সমৃদ্ধ লাইব্রেরিতে বই পড়া, বিজ্ঞানাগারে বিজ্ঞান বিষয়ক চর্চা করা, কম্পিউটার ল্যাবে কম্পিউটার শিক্ষাসহ নানা বিষয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি ও উচ্চ শিক্ষায় ছাত্রীদের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে নাটোরের গুরুদাসপুর রোজী মোজাম্মেল মহিলা কলেজটিতে। অথচ একদশক আগেও চলনবিল বেষ্টিত এই উপজেলায় নারীর উচ্চ শিক্ষার কোনো সুযোগ ছিল না। সে সময় অবহেলিত চলনবিলবাসীর মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার সুযোগই ছিলো কম। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার চিন্তা ছিলো শুধুই স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়ে রোজী মোজাম্মেল মহিলা অনার্স কলেজ নারীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিয়েছে। সর্বশেষ কলেজটিতে ডিগ্রি পাস কোর্সের পাশাপাশি পাঁচটি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু করা হয়েছে।
কলেজটিতে বর্তমানে ৮৫০জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। চলনবিলের সিংড়ার বিলদহর, চামটা, নুরপুর, তাড়াশের কুন্দইল, ধামাইচ, নাদোসৈয়দপুর, বারুহাস, বড়াইগ্রামের চামটা, লক্ষ্মীকোল, মারিয়াসহ আশেপাশের তিন জেলার ছাত্রীরা এখানে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। বর্তমানে নারী শিক্ষা প্রসারে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠার ২২ বছরেও জাতীয়করণ করা হয়নি উপজেলা সদরের একমাত্র মহিলা অনার্স কলেজটিকে।
জানা যায়, ১৯৯৪ সালে চলনবিলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর নারীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করতে সাবেক সংসদ সদস্য এম. মোজাম্মেল হক তার স্ত্রীর নামে কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ মো. ইব্রাহিম হোসেন জানান, শুরুতে নানা প্রতিবন্ধকতায় কলেজটির অগ্রযাত্রা ব্যাহত হয়। ১৯৯৮ সালে বর্তমান সংসদ সদস্য অধ্যাপক আবদুল কুদ্দুস প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত করেন। তাছাড়া ডিগ্রিসহ অনার্স কোর্সের যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, আসবাবপত্র, সীমানা প্রাচীর বেষ্টিত তৃতীয়তলার একটি দৃষ্টিনন্দন ভবন নির্মিত হয়েছে। এছাড়া ভেতরে রয়েছে একাধিক ভবনে সুবিশাল শ্রেণিকক্ষসমূহ। ছাত্রীদের আবাসিক সুবিধার জন্য রয়েছে দ্বিতল ভবন দু’টি ও একটি টিনশেড ভবন। সেখানে নামমাত্র টাকায় ছাত্রীরা সুবিধাভোগ করছে। যুগপত্ শিক্ষার কথা বিবেচনা করে গড়ে তোলা হয়েছে কম্পিউটার ল্যাব, বিজ্ঞানাগার এবং ১১ হাজারের অধিক বইসমৃদ্ধ লাইব্রেরি। অধ্যক্ষ আরো জানান, মহিলা কলেজটি প্রতিষ্ঠার পর চলনবিল এলাকার প্রায় সকল অভিভাবক তাদের মেয়েদের এখন উচ্চশিক্ষার জন্য এখানে পাঠাচ্ছেন। বাড়ছে নারী শিক্ষার হার।
সময়ের প্রয়োজনে মহিলা কলেজটিতে ডিগ্রি পাসকোর্স ও বর্তমানে পাঁচটি বিষয়ে (বাংলা, সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল ও পরিবেশ) অনার্স কোর্স চালু রয়েছে। ওই কোর্সসমূহে ৫০০ জন ছাত্রী পড়ালেখা করছে। দূরের ছাত্রীরা আবাসিক সুবিধা ভোগ করছে। তিনটি দ্বিতল ভবনের আবাসিক হোস্টেলে ৩০০ ছাত্রী থাকার সুযোগ রয়েছে।
পরিচালনা কমিটির সভাপতি আবুল কাশেম বলেন, কাঠামোগত দীনতা থাকার পরেও কলেজটি ভালো ফলাফলের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে। উপজেলা পর্যায়ে তথা চলনবিলের অবহেলিত জনগোষ্ঠীর নারী উচ্চশিক্ষার একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলেও এটি এখনও জাতীয়করণ করা হয়নি। এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ কলেজটি জাতীয়করণের দাবি তুলেছেন।
ইত্তেফাক/এএন
