কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার দুর্গম দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে সেপ্টেম্বরের বিভিন্ন দিনে ১০ বাল্য বিয়ের ঘটনা ঘটেছে।
জানা গেছে, সেপ্টেম্বর মাসে অভিভাবকদের চাপে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য হয়েছে উপজেলার দাঁতভাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির আফরোজা খাতুন, ঝগড়ার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির রেখা পারভীন, দাঁতভাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী আখলিমা খাতুন ও ৯ম শ্রেণির সিমু আক্তার, দাঁতভাঙ্গা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির রূপালি খাতুন এবং বড়াইকান্দি দাখিল মাদরাসার ৪র্থ শ্রেণির সুমি আক্তার। আমবাড়ি গ্রামের ইসর আলীর মেয়ে মৌসুমি খাতুন (৫ম শ্রেণি), দাঁতভাঙ্গা গ্রামের উকিল মিয়ার মেয়ে বিথি খাতুন (৭ম শ্রেণি), রফিয়াল হকের মেয়ে লিপি আক্তার (৬ষ্ঠ শ্রেণি), সেকান্দার আলীর মেয়ে শিউলি খাতুন (৩য় শ্রেণি)।
এর আগের মাস আগস্টে বাল্য বিয়ের শিকার হয়েছে ১৩ জন। এরা হলো, ঝগড়ার চরের গ্রামে সোবহানের মেয়েরোকসানা খাতুন (৭ম শ্রেণি), পাপু মিয়ার কন্যা পারভীন খাতুন (৭ম শ্রেণি), ফজলুল হকের মেয়ে ফারজানা খাতুন (৮ম শ্রেণি), উজান ঝগড়ার চরের আখতার হোসেনের মেয়ে আল্পনা খাতুন (৬ষ্ঠ শ্রেণি), বড়াইকান্দি গ্রামের ময়নাল হকের কন্যা আখি তারা (৫ম শ্রেণি) ও হরিণ ধরা গ্রামের আফজাল হোসেনের কন্যা আরফিনা খাতুন (৬ষ্ঠ শ্রেণি) চরধনতলা গ্রামের আব্দুস সালামের ৭ম শ্রেণিতে পড়ুয়া সাবানা খাতুন, একই গ্রামের জমিয়াল হকের মেয়ে জবা খাতুন (৫ম শ্রেণি), শামসুল হকের কন্যা শাম সুয়ারা (৩য় শ্রেণি), আমবাড়ি গ্রামের ইস্রারাফিল হকের কন্যা ইসমেতারা খাতুন (১০ম শ্রেণি), সাহার আলীর মেয়ে শারমিন আক্তার (৬ষ্ঠ শ্রেণি), পালের চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির জেসমিন আক্তার।
রৌমারীর দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে সরেজমিনে অনুসন্ধান চালিয়ে বাল্য বিয়ের ওই তথ্য পাওয়া গেছে। পালের চরের দিনমজুর জেলাল উদ্দিনের ৫ম শ্রেণির মেয়ে জেসমিন আক্তারকে বিয়ে দেয়া হয়েছে রেজিস্ট্রি ছাড়াই।
জেলাল উদ্দিন বলেন, ‘মাইয়া মানুষকে বেশি পড়ানো ঠিক না। ভালা সমন্ধ পাইছি, পোলা(ছেলে) ভালা ও তার পরিবারও ভালা। এই জন্য বিয়া দিছি।’
সরকারি নিয়ম অনুসারে বিয়ে রেজিস্ট্রি করেননি কেন-জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে বলেন, ‘আপনারা এগুলান নাড়াচাড়া কইরা আমগর সর্ম্পকটা নষ্ট কইরেন না।’
একই ধরণের কথা বলেন হরিণধরা গ্রামের আব্দুল আজিজ, কাউয়ার চরের জিয়াউর রহমান ও দাঁতভাঙ্গা গ্রামের ফকির উদ্দিন।
ঝগড়ার চরের ৪র্থ শ্রেণির ছাত্রী সুমি আক্তারকে বিয়ে দেয়া প্রসঙ্গে দিনমজুর ছক্কু মিয়া বলেন, ‘কমক্লাশে পড়লে কি অবো তার বয়স ১৪/১৫ অইছে। একবার স্কুলে গেছিল আবার মাদরাসায় ভর্তি অইছে। বড় অইয়া মাদরাসায় ভর্তি অইছে। তাছাড়া ছেলে ভালা পাইছে, মানুষও ভালা।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমগর মতো গরীব মানুষ অত আইনটাইন বুঝি না। জন্ম নিবন্ধনেও মাইয়ার বিয়ের বয়স অইছে বিয়া দিছি।’
একই ইউনিয়নের সীমান্ত ঘেঁষা ধর্মপুর গ্রামের ৬ষ্ঠ শ্রেণিরআখরিনা খাতুনকে বিয়ে দেয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাবা মজিবুর রহমান বলেন, ‘মাইয়াগরে বেশি বড় অইলে বিয়া দিতে এক গাদি ট্যাহা নাগবো। তহন ট্যাহা পামু কই। ছেলে পক্ষ কোনো যৌতুক ছাড়াই মাইয়াক টাইনা নিছে।’
দাঁতভাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বদিউজ্জামান বলেন, ‘কিছু টাকা বেশি দিলেই কাজিরা বাল্য বিয়ে রেজিস্ট্রি করেন। এছাড়া চেয়ারম্যান-মেম্বাররাও জন্ম নিবন্ধনে মেয়ের বয়স বাড়ানোর পেছনে ভূমিকা রাখেন।’
দাঁতভাঙ্গা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদ থেকে যে জন্ম নিবন্ধন দেয়া হয় তাতে মেয়ের বয়স বেশি দেখানো হয়। অনেক সময় জন্ম নিবন্ধন জাল করে কাজিকে দেখানো হয়। এমনও ঘটেছে বয়স কম থাকায় কাজি বিয়ে রেজিস্ট্রি করতে না চাইলে অভিভাবকরা রেজিস্ট্রি ছাড়াই বিয়ে দেয় মেয়েকে।’
দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান শামসুল ইসলাম বাল্য বিয়ের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘আমি তো ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জন্ম সনদে বয়স বাড়িয়ে দেই না। তারা কিভাবে বিয়ে রেজিস্ট্রি করে তা তারাই ভালো বলতে পারবেন।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন তালুকদার বলেন, ‘দুই মাসে ২৩টি বাল্য বিয়ের তথ্যটি আমার জানা নেই। তবে বাল্য বিয়ের খবর পেলেই আমি দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। কয়েকদিন আগে কালু শেখ নামের একজনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে তিনদিনের সাজা দেয়া হয়েছে। তিনি জালিয়াতি করে জন্ম সনদ আর কোর্টের এফিডেভিটপত্র তৈরি করে দিতেন।’
ইত্তেফাক/এএসএমইউ
