সিলেট ছিল দিনভর উত্তাল চালক ও হেলপার আটক

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০১৯, ২২:৪৩

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী ঘোরি মো. ওয়াসিম আফনানকে বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে হত্যার ঘটনায় গতকালও সিলেট ছিল উত্তাল। দিনভর নগরীতে ছিল চাপা উত্তেজনা। শাবি, সিকৃবি ক্যাম্পাসসহ সিলেটের বিভিন্ন স্থানে পৃথক প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সুজন সভাপতিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বিক্ষুব্ধ নাগরিকরা এই ঘটনার সুষ্ঠু ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও রাজপথে ‘বাসের নৈরাজ্য’ বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে শনিবার রাতেই ঘাতক বাসটিকে ওসমানীনগর থেকে, বাসচালক জুয়েল আহমদকে দক্ষিণ সুরমা থেকে এবং হেলপার মাসুক আলীকে সুনামগঞ্জের ছাতক থেকে আটক করে পুলিশ। অন্যদিকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই গতকাল হবিগঞ্জের নবীগঞ্জের গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।

ওয়াসিম হত্যার প্রতিবাদে বেলা ১১টার দিকে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করে নগরীর প্রায় ৩ কি. মিটার দূরে এসে চৌহাট্টায় অবস্থান নেয়। সড়কে নৈরাজ্য বন্ধে বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দিয়ে সড়ক অবরোধ করে রাখে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। পরে বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে শিক্ষার্থীরা তিন দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। তা হচ্ছে: দুর্ঘটনার মামলাকে হত্যা মামলা হিসেবে নিতে হবে, তিনদিনের মধ্যে মামলার বিচার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে এবং তিনদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করা হবে। সিকৃবি শিক্ষার্থীরা পরে চৌহাট্টার সড়ক অবরোধ তুলে নেয়। এই বিক্ষোভ সমাবেশে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও যোগ দেয়। চৌহাট্টায় বিক্ষোভ চলাকালে সিকৃবির চার ছাত্রী অতিরিক্ত গরমে অসুস্থ হয়ে পড়লে  তাদের দ্রুত ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। আন্দোলন চলাকালে গোটা সিলেট নগরীতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। তবে এই যানজটে পথচারীরা বিরক্তি প্রকাশ না করে বাসের ‘নৈরাজ্য’ বন্ধের দাবি জানান।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ওয়াসিম হত্যার জন্য দায়ি বাসচালক ও তার সহকারীকে আইনের আওতায় এনে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফাঁসি কার্যকর, ঘাতক বাসের রুট পারমিট ও লাইসেন্স বাতিলেরও দাবি জানায়।

এদিকে বায়োটেকনোলজি ও জেনেটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ৪র্থ বর্ষের মেধাবী ছাত্র ঘোরী মো:ওয়াসিমের অকাল মৃত্যুতে সিকৃবিতে রবিবার শোক দিবস পালন করা হয়। গতকাল সিকৃবিতে কোনো ক্লাস, পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। এছাড়াও পূর্বনির্ধারিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি নির্ধারণী একাডেমিক কাউন্সিলের সভাও স্থগিত করা হয়। দুপুরে ওয়াসিম আব্বাস-এর স্মরণে শোক সভা, মানববন্ধন ও আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়ার আয়োজন করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ নূর হোসেন মিঞার সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ড. জীতেন্দ্র নাথ অধীকারীর সঞ্চালনায় শোক সভায় বক্তব্য রাখেন ভিসি প্রফেসর ড. মো: মতিয়ার রহমান হাওলাদার, ডিন কাউন্সিলের আহ্বায়ক প্রফেসর ড. মো: আবুল কাশেম, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো: বদরুল ইসলাম শোয়েব, ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা পরিচালক প্রফেসর ড. সৈয়দ সায়েম উদ্দিন আহম্মদ, পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট স্ট্যাডিজ অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মো: নজরুল ইসলাম, অফিসার পরিষদের সভাপতি কৃষিবিদ মো: সাজিদুল ইসলাম, গণতান্ত্রিক শিক্ষক পরিষদের সভাপতি প্রফেসর ড. মিটু চৌধুরী, সাদা দলের সভাপতি প্রফেসর ড. এম. রাশেদ হাসনাত, লেপস এর সভাপতি সরকার মো: ইব্রাহিম খলিল, সহকারী প্রফেসর মো: নাজমুল হোসাইন, কর্মচারী সমিতির সভাপতি শাহ্ আলম সুরুক প্রমুখ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন ও বঙ্গবন্ধু চত্বরের পাশে মানববন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সকল সদস্য অংশগ্রহণ করেন।

এছাড়া এই ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে নবীগঞ্জ উপজেলার জনতার বাজার এলাকায় গতকাল দুপুরে মানববন্ধন ও মহসড়ক অবরোধ করে স্থানীয়রা। এসময় মহসড়কে প্রায় আধা ঘণ্টা যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

এদিকে পুলিশ জানায়, শনিবার রাতেই ঘাতক বাসকে ওসমানীনগর থেকে, বাসচালক জুয়েল আহমদকে দক্ষিণ সুরমা থেকে এবং হেলপার মাসুক আলীকে সুনামগঞ্জের ছাতক থেকে আটক করা হয়। শনিবার রাত দুইটার দিকে ছাতক উপজেলার সিংচাপইড় গ্রামে মাসুকের শ্বশুরবাড়ি থেকে তাকে আটক করা হয়। সে সুনামগঞ্জ পৌর শহরের তেঘরিয়া এলাকার মৃত দৌলত আলীর পুত্র।

দাফন সম্পন্ন

বাসচাপায় নিহত সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (সিকৃবি)-এর শিক্ষার্থী ঘোরি মো. ওয়াসিম আফনানকে জানাজা শেষে বেলা ৩টায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের মাতম চলছে।  ওয়াসিমের চাচা শিহাব উদ্দিন জানান, নবীগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে বাদ জোহর জানাজার নামাজ শেষে তাকে দাফন করা হয়। এর আগে শনিবার রাতে পরিবারের অনুরোধে মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই হস্তান্তর করা হয় বলে জানান কোতোয়ালি থানার ওসি মোহাম্মদ সেলিম মিয়া।

উল্লেখ্য, গত শনিবার সন্ধ্যায় সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের শেরপুর নামক স্থানে বাস চাপায় প্রাণ হারান সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪র্থ বর্ষের ছাত্র ওয়াসিম আফনান। ওয়াসিম হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার দেবপাড়া ইউনিয়নের রুদ্র গ্রামের মো. আবু জাহেদ মাহবুব ও ডা. মীনা পারভিন দম্পতির একমাত্র সন্তান। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও ওয়াসিমের সহপাঠীদের অভিযোগ, সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের মৌলভীবাজার জেলার শেরপুর নামক স্থানে বাস ভাড়া নিয়ে তর্ক-বিতর্কের এক পর্যায়ে ওয়াসিমকে চলন্ত বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে ‘হত্যা’ করে ‘উদার’ পরিবহন নামের বাসের হেলপার।