সার্ক অকার্যকর, এগিয়ে নিতে হবে বিমসটেককে

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০১৬, ১৭:৩৭
সার্ক অকার্যকর হওয়ার পথে, অপর আঞ্চলিক ফোরাম বিমসটেক এর সম্ভাবনা উজ্জ্বল, তাই সম্প্রসারিত করতে হবে বিমসটেক। আর এর মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে অনেকটাই একঘরে হয়ে পড়বে পাকিস্তান। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে দিল্লি সফররত বাংলাদেশি সাংবাদিক প্রতিনিধি দলকে মঙ্গলবার এ কথা জানিয়েছেন ভারতীয় কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
 
ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, অভিন্ন প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরও উচ্চতায় এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি স্বচ্ছন্দ হয়। এ কারণেই গত সাত-আট বছরে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যেকার দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধান হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে আঞ্চলিক জোটগত কূটনীতিতেও দক্ষিণ এশিয়ায় নেতৃত্ব দেবে ভারত ও বাংলাদেশ।
 
সার্কের বদলে বিমসটেক : পাকিস্তানের সঙ্গে সার্কভুক্ত একাধিক দেশের সম্পর্কের তিক্ততায় এবারের সার্ক শীর্ষ সম্মেলন স্থগিত হওয়ার পর সার্কের আর কার্যকারিতা থাকছে না, এ ব্যাপারে একরকম নিশ্চিত ভারতীয় কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। এ কারণে সার্কের বিকল্প কি হবে তা নিয়ে জোর জল্পনা-কল্পনাও শুরু হয়ে গেছে। আর সার্কের বিকল্প হিসেবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকনমিক কো-অপারেশন বা বিমসটেক। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা এবং থাইল্যান্ডের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য গঠিত বিমসটেকের সদস্য এখন মিয়ানমার, নেপাল ও ভুটানও। এখন মালদ্বীপ ও আফগানিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারলেই সার্কের কার্যকর বিকল্প হয়ে যায় বিমসটেক, যেখানে পাকিস্তানকে সহজেই বাইরে রাখা যায়।
 
ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার এবং বর্তমানে ভারতের শীর্ষস্থানীয় নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন বা ওআরএফ এর সম্মানিত ফেলো পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী দিল্লিতে ওআরএফ এর প্রধান কার্যালয়ে মতবিনিময়কালে বলেন, প্রায় ত্রিশ বছরের ইতিহাসে সার্ককে এগিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে কাজ করেছে পাকিস্তান। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো যখন অর্থনীতি ও উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চেয়েছে পাকিস্তান তখনই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সার্ক রেল যোগাযোগ চুক্তি, আফগানিস্তানে পণ্য পরিবহনে ট্রানজিট সুবিধা প্রদান, বাণিজ্য সহযোগিতা বৃদ্ধি, সন্ত্রাসবাদ দমন কোনো ক্ষেত্রেই অগ্রগতি হয়নি শুধুমাত্র পাকিস্তানের নেতিবাচক মনোভাবের কারণে। এটা দক্ষিণ এশিয়া শুধু নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও সবাই বার বার দেখেছে। বিশেষ করে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত পাকিস্তানে গণতন্ত্র এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অনুপস্থিতি বরাবরই আঞ্চলিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্থির সিদ্ধান্ত নিতে পাকিস্তানকে পিছিয়ে রেখেছে। একটি দেশের একগুঁয়েমির কারণে সার্ক এত বছরেও অকার্যকরই থেকেছে। কিন্তু এখন সময়ের দাবি হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় এগিয়ে নেওয়া। এক্ষেত্রে একটি জোট অকার্যকর হলে অন্য জোট গঠনের কথা ভাবতেই হবে। সেই জোটটি এখনই প্রস্তুত রয়েছে। সেটা হচ্ছে বিমসটেক।
 
তিনি বলেন, মালদ্বীপ এবং আফগানিস্তানকে বিমসটেকে সম্পৃক্ত করার সুযোগ রয়েছে। প্রথমে পর্যবেক্ষক হিসেবে নেওয়া যায়। পরে তারা সদস্য হতে পারে। এ দু’টি দেশ অন্তর্ভুক্ত হলে পাকিস্তান বাদে সার্কের অন্য সব সদস্য রাষ্ট্রই বিমসটেকে চলে আসে। এর ফলে সার্কের বিকল্প হিসেবে অর্থনীতি, বাণিজ্য, উন্নয়ন, নিরাপত্তা সব ক্ষেত্রেই কার্যকর জোট হিসেবে দাঁড়াতে পারে বিমসটেক।
 
তিনি আরও বলেন, ভারত ও বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ তেল আমদানি করে থাকে। এ অঞ্চলের মধ্যে অভিন্ন পাইপলাইন তৈরির মাধ্যমে ‘পাইপলাইন’ কূটনীতি জ্বালানি সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। এরই মধ্যে ভারতের নুমনিগড় থেকে বাংলাদেশের পার্বতীপুর পর্যন্ত নতুন পাইপ লাইন স্থাপনের পরিকল্পনাও হয়েছে। সমুদ্র সম্পদকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার নতুন অর্থনৈতিক বলয়ও গড়ে  তোলা সম্ভব।   
 
ওআরএফ এর ভাইস প্রেসিডেন্ট নন্দন উন্নিকৃষ্ণান বলেন, শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, সারা বিশ্বেই সন্ত্রাসের কারণে পাকিস্তানের নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে। পাকিস্তান যতই বলুক তারা সন্ত্রাসবাদ সমর্থন করে না, কিন্তু সেটা কারও কাছে বিশ্বাসযোগ্য নয়। পাকিস্তানের সন্ত্রাসে পৃষ্ঠপোষকতার ব্যাপারটা সবার কাছেই পরিষ্কার। এ কারণে আরব রাষ্ট্রগুলোও এখন পাকিস্তানকে আস্থায় রাখতে পারছে না। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে সন্ত্রাসবাদ দমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও উগ্রপন্থা মোকাবিলা জরুরি ইস্যু। আর পাকিস্তানকে সঙ্গে নিয়ে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা কোনো বিবেচনায় সম্ভব নয়। বরং পাকিস্তান সঙ্গে থাকলে সন্ত্রাসের ঝুঁকিটাই বাড়বে। এ অবস্থায় পাকিস্তানকে আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক অনেক জোট থেকে বাইরে রাখার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
 
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে যা ভাবছে ভারত: দিল্লিতে সাউথ ব্লকের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে সাংবাদিক প্রতিনিধি দলের খোলামেলা আলাপ ও মতবিনিময় হয়। ভারতীয় কর্মকর্তাদের মত হচ্ছে, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশের সঙ্গে উন্নয়ন ও অগ্রগতির সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া স্বচ্ছন্দ হয়। কারণ আওয়ামী লীগের প্রগতিশীল রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির প্রগতিশীল দর্শনের মিল রয়েছে। যে কারণে দ্বি-পাক্ষিক যে কোনো আলোচনায় ঐকমত্যে পৌঁছা সম্ভব হয়। তারা বলেন, বাংলাদেশে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, ভারত তার সঙ্গেই দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে একইভাবে কাজ করেছে, করবেও। কিন্তু সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত আছে এবং চিন্তায় প্রতিক্রিয়াশীল এমন কোনো পক্ষের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের মোর্চার মাধ্যমে সরকার গঠন হলে অগ্রগতির পথে দ্বি-পাক্ষিক আলোচনা এগিয়ে নেওয়া স্বাভাবিকভাবেই বাধাগ্রস্ত হয়। আওয়ামী লীগ সরকারে এ ধরনের কোনো প্রতিক্রিয়াশীল পক্ষ যুক্ত না থাকায় গত সাত-আট বছরে সত্যিকার অর্থেই অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং উন্নয়ন সম্পর্ক যেমন মসৃণভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে, তেমনি দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা সমস্যারও ঐতিহাসিক সমাধান হয়েছে। তারা আরও বলেন, সামনের দিনগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ায় আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে আঞ্চলিক সম্পর্কেও নতুন অধ্যায়েও নেতৃত্ব দেবে বাংলাদেশ ও ভারত।
 
 গণমাধ্যমের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে জানানোর ফাঁকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে এক লাইনেই জবাব দিলেন ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিকাশ স্বরূপ। তিনি বলেন, আপনারা দেখেছেন স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশ সফর করেছেন। বাংলাদেশের সম্মানিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও গোয়ায় অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়ে আগামী সপ্তাহেই ভারতে আসছেন। এসব কিছুই তো দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ভেতরে বন্ধুত্ব ও সুসম্পর্কের চিত্র তুলে ধরে।
 
 

ইত্তেফাক/এএন