নামকরণ জটিলতায় থেমে আছে কালিগঙ্গার উপর নির্মিত সেতুটির উদ্বোধন

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০১৬, ১৬:১৭
প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত মানিকগঞ্জ পৌর এলাকায় কালিগঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত সেতুটির কাজ ৪ মাস পূর্বে শেষ হলেও নাম নিয়ে জটিলতার কারণে এর উদ্বোধন হচ্ছে না এখনও। সেতুটি উদ্বোধন না হওয়ায় কয়েক লাখ মানুষের দুর্ভোগের শেষ হচ্ছে না। নৌকায় নদী পার হয়ে তাদের জেলা সদরে যাতায়াত করতে হচ্ছে। অথচ জেলা সদরের সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগের সেতুটিকে মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হলেও কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। 
 
জানা গেছে, সেতুটির নামকরণ নিয়ে চলছে জটিলতা। মানিকগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র রমজান আলী তাঁর নিজের নামে সেতুটির নামকরণের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন। এ নিয়ে সরকারি দলের নেতিবাচক মনোভাবের কারণে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। ইতোপূর্বে সেতুটি খুলে দেয়ার দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশও করেছে কয়েকটি রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংগঠন।
 
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে মানিকগঞ্জ পৌর এলাকার বেউথা এলাকায় কালিগঙ্গা নদীর উপর সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছিল এলাকাবাসী। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বেউথা এলাকায় নদীর উপর সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত ২০১৩ সালের ১০ আগস্ট কালিগঙ্গা নদীর উপর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে অক্টোবর মাসে ২৯৭ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৯ দশমিক ৮ মিটার প্রস্থের সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ৪০ কোটি ৫৪ লাখ ৫৯ হাজার ৩২৩ টাকা ব্যয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ডব্লিউএমসিজি- নাভানা-জেভি সেতুটির নির্মাণ কাজ শুরু করে। এ সময় কাজের উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী এবং বর্তমান এলজিআরডি মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশারফ হোসেন। 
 
গত ২০১৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও যথা সময়ে কাজ শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। যে কারণে একাধিক বার কাজের সময় সীমা বৃদ্ধি করা হয়। সর্বশেষ গত ৩০ জুন শেষ হয়।
 
IMG0
 
নাভানা কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের সেতু নির্মাণের দায়িত্বে থাকা প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো. আলমগীর শেখ বলেন, গত ৩০ জুলাই সেতুটি উদ্বোধনের কথা ছিল। তবে গত ২০ জুলাই এলজিইডি জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী তাঁকে জানান, সেতুটি  এখনই উদ্বোধন হচ্ছে না পরে উদ্বোধনের  তারিখ জানিয়ে দেয়া হবে।
 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেন, গত নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে মেয়র নির্বাচনে রমজান আলীর পরাজয়ের পর হতেই তার নামে আর সেতু হবে না এমনটা আমরা বুঝতে পারি।বর্তমান স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ও মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদ মালেক স্বপন অথবা তার বাবা সাবেক মন্ত্রী, ঢাকার মেয়র মরহুর কর্নেল (অব.) আ. মালেক সাহেবের নামে হবার জন্যে চেষ্টা হয়েছে।
 
আবার অনেকে বলেছেন, শুধু রমজান আলীর নাম বাদ হলেই হয়। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় নামে যেমন বেউথা সেতু বা কালিগঙ্গা সেতু হলেও প্রভাবশালীদের ইজ্জত বাঁচে। অনেকে বলেছেন এটা স্থানীয় নেতাদের আভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফল।
 
সেতুটি করার জন্যে মানিকগঞ্জে তৎকালীন মেয়র, বিশিষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী এমপি মমতাজ বেগমের সাবেক স্বামী, বর্তমান জেলা আওয়ামী লীগের লীগের সহ-সভাপতি মো. রমজান আলী ব্যাপক চেষ্টা করেন এবং তার নামেই সেতুটি হবে বলে সিন্ধান্ত হয়। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর–মানিকগঞ্জ কর্তৃক টানানো সাইনবোর্ডে এখনও লেখা রয়েছে, কাজের নাম-মানিকগঞ্জ সদর উপজেলাধীন কালিগঙ্গা নদীর উপর মেয়র মো. রমজান আলী সেতু নির্মাণ (এপ্রোচ সড়কসহ)।
 
IMG1
 
রমজান আলীর নামে সেতুটির নামকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবের কাছে লিখিত সুপারিশ করা হয়। এতে মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য মমতাজ বেগমসহ জেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা ও জনপ্রতিনিধি এ সুপারিশ করেন। তবে এতে স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেকের সুপারিশ নেই।
 
সাবেক মেয়র রমজান আলী বলেন, সেতুর নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদনে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে ‘মেয়র রমজান আলী সেতু’ নামকরণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আমি হজ থেকে এসে শুনি সেতুটি আমার নামে হচ্ছে না। তিনি দু:খের সঙ্গে বলেন, আমার নামে প্রায় ৮০ টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেতুটি আমার নামে না হলেও আমার কোন আফসোস নাই।আমি চাই দ্রুত সেতুটি চালু করা হোক।
 
পৌরসভার মেয়র গাজী কামরুল হুদা সেলিম  বলেন, জনস্বার্থে আগে সেতুটি উদ্বোধন করা হোক। নামকরণ পরে করা যাবে।
 
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুস সালাম বলেন, কোনো এলাকার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে স্থানীয় সাংসদের ডিও (আধাসরকারি পত্র) লাগে। অন্য নির্বাচনী আসনের কোনো সাংসদের সুপারিশ যুক্তিযুক্ত নয়। তা ছাড়া জেলায় অনেক জ্ঞানী-গুণী, মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁদের নামেও সেতুটির নামকরণ করা যায়। সাবেক মেয়রের নামে নামকরণটা বোধগম্য নয়।
 
স্থানীয়রা জানান, কালিগঙ্গা মানিকগঞ্জ পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডকে বিভক্ত করেছে। এ কারণে ওয়ার্ডের শিক্ষার্থীসহ জনসাধারণকে সারাবছরই অর্থ খরচ করে খেয়া পার হয়ে জেলা সদরে যাতায়াত করতে হয়। এ ছাড়া জেলা সদর উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, ঘিওর উপজেলা পূর্ব-দক্ষিণাঞ্চল ও হরিরামপুর উপজেলার বাসিন্দাদেরও জেলা শহরে আসতে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। সেতুর অভাবে এসব এলাকার মানুষ অতিরিক্ত পথ ঘুরে জেলা সদরে যাতায়াত করে আসছে। তারা আরও বলেন, সরকারি টাকায় সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। তবু চালু হচ্ছে না। টাকা ব্যয় করে নৌকায় যাতায়াত করতে হচ্ছে। আমাদের মালামাল ও রোগীর জন্যে সেতুর উপর দিয়ে যেতে দেয়া হয় না অথচ প্রভাবশালীদের মাটির ট্রাক পাড় করার সময় গেট খুলে দেয়া হয়।
 
এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আ. বারেক হাওলাদার জানান, এখন আর মো. রমজান আলীর নামে সেতু হবে না। সেতু হবে ‘বেউথা নদীর উপর  কালিগঙ্গা সেতু’ নামে। কতদিন পূর্বে কাজ শেষ হয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গত ৩০ জুন। কাজ শেষ হবার পরও সাড়ে ৪ মাস যাবত চলাচলের জন্যে খুলে দেয়া হচ্ছেনা কেনো? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্থানীয় মন্ত্রী অর্থাৎ স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপন মহোদয়ের সিডিউল পাওয়া যায় না তাই উদ্বোধণ করা হয় নাই।মানুষকে কেন অযথা হয়রানি করা হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি  বলেন, কিছু দিন যাবত তো লোকজন পায়ে হেঁটে চলাচল করছেই। মন্ত্রী মহোদয় সময় দিয়েছেন আগামী ১৫ই অক্টোবর উদ্বোধন করা হলেই খুলে দেয়া হবে।
 
স্থানীয় জনগণ জানান, ইতোপূর্বেও কয়েকবার ঘোষণা দিয়েও উদ্বোধন হয়নি তাই সেতু চালু না হওয়া পর্যন্ত অনিশ্চতায় দিন গুনছি। 
 
 
ইত্তেফাক/এসআইএস/এমআই