মিয়ানমারের মন্ডু টাউনশিপের আশেপাশে প্রতিষ্ঠিত প্রায় ৩০টিরও অধিক কারখানায় উৎপাদিত ইয়াবার সিংহভাগ চালান জেলেদের মাধ্যমে সীমান্তের নাফনদী পার হয়ে এদেশে ঢুকছে। সম্প্রতি জেলা আইনশৃঙ্খলা ও চোরাচালান কমিটির সভায় এ ঘটনাকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপ থেকে উখিয়ার বালুখালী পর্যন্ত সীমান্তের নাফনদীর ৬০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে রাতের বেলায় মাছ ধরার উপর বিধি নিষেধ আরোপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রাতের বেলায় ফিশিং বোট চলাচল করতে না পারলে ইয়াবা, চোরাচালান ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ অনেকটা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
টেকনাফ বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, গত সেপ্টেম্বর মাসে ২ বর্ডার গার্ড বিজিবি সদস্যরা নাফ নদীর ৬০ কিলোমিটার এলাকায় বিভিন্ন স্থানে পৃথক অভিযান চালিয়ে ৮ কোটি ৩৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা মূল্যের ২ লাখ ৬৯ হাজার ২৬ পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে। গত ২ অক্টোবর নাফ নদী পার হয়ে আসা হ্নীলা মৌলভী বাজার থেকে উদ্ধার করা হয়েছে আরও ৩০ হাজার পিস ইয়াবা। আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভায় বক্তাদের বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে ইয়াবা, চোরাচালান ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ।
বক্তাদের অভিমত সীমান্তের নাফনদীতে মাছ ধরার নাম ভাঙ্গিয়ে ফিশিংবোট গুলো অবাধে বিচরণ করতে পারছে। এসব ফিশিং বোটগুলোর মাছ ধরার জালের ভেতর করে ইয়াবা চালান নিয়ে আসছে। মাঝে মধ্যে ইয়াবার চালান আটক করা সম্ভব হলেও ইয়াবা সিন্ডিকেটদের শনাক্ত বা আটক করতে না পারায় মূল হোতারা ধরাছোয়াঁর বাইরে থেকে যাচ্ছে। ফলে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে ইয়াবা পাচারকারী সিন্ডিকেট।
গত ৫ অক্টোবর নাফনদী পার হয়ে হ্নীলা মগপাড়াস্থ পানের বরজে মজুদরাখা ৫০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করেছে লেদা বিওপি’র বিজিবি সদস্যরা। একই দিনে দমদমিয়া বিজিবি যাত্রীবাহি গাড়ীতে তল্লাশি চালিয়ে ২২ হাজার ইয়াবাসহ উখিয়ার বালুখালী গ্রামের মৃত কাদের হোসেনের ছেলে মনজুর আলম (২৮) ও পল্লনপাড়া গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে জসিম উদ্দিনকে (২০) আটক করে। একই দিন র্যাব-০৭ এর সহকারী পরিচালক লে. কর্নেল মিফতাহ উদ্দিনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামের পতেঙ্গার অদূরে অভিযান চালিয়ে ২০ কোটি টাকা মূল্যের ৫ লাখ পিস ইয়াবাসহ ৭ জন পাচারকারীকে আটক করেছে।
র্যাব-০৭ এর মিডিয়া উইংয়ের চন্দন দেবনাথ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এসময় একটি ফিশিং ট্রলার আটক করা হয়েছে। আটক পাচারকারীরা র্যাবকে জানিয়েছেন, তারা সীমান্তের নাফনদী পার হয়ে সাগর পথে চট্টগ্রাম যাচ্ছিল।
পালংখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফজল কাদের ভুট্টো জানান, পালংখালী, থাইংখালী ও বালুখালী সীমান্ত সংলগ্ন নাফনদী পার হয়ে প্রতিনিয়ত লাখ লাখ পিস ইয়াবা পাচার হয়ে আসছে। সম্প্রতি বালুখালী ইয়াবা সিন্ডিকেটের গডফাদার নবনির্বাচিত ইউপি সদস্য ঢাকা ট্যারোরিজম পুলিশের হাতে ৫০ হাজার ইয়াবাসহ হাতে নাতে ধরা পড়ে কারাবাস করলেও ইয়াবা পাচার থামেনি। সে জেলখানা থেকে মোবাইল ফোনে ইয়াবা পাচার নিয়ন্ত্রণ করছে বলে একাধিক প্রমাণ তার হাতে রয়েছে মর্মে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।
টেকনাফ বিজিবি’র অধিনায়ক লে. কর্নেল আবুজার আল জাহিদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, নাফনদীতে উভয় দেশের জেলেরা তাদের জলসীমায় মাছ ধরার নামে ইয়াবার চালান হাত বদল করছে। পরে এদেশি জেলেদের মাধ্যমে জালের ভেতর অভিনব কায়দায় লুকিয়ে রেখে ইয়াবা নিয়ে আসছে।
তিনি বলেন, দিনের বেলায় মাছ ধরার ওপর বিধি নিষেধ আরোপিত করা হলে চোরাচালান, ইয়াবাপাচার ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ অনেকটা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি সাগরে আমিষ জাতীয় খাদ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।
ইয়াবা খেতে না পেরে আত্মহত্যা
ইয়াবা পাচার, পাইকারী ও খুচরা বিক্রি বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ইয়াবা সেবনকারীর সংখ্যা বেড়েছে উদ্বেগজনকভাবে। গত শনিবার ৮ অক্টোবর রাত ১০ টার দিকে ইয়াবা সেবনের জন্য মায়ের কাছে টাকা চাইলে মা ইয়াবা সেবন করবে জেনে টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। এ অবস্থায় বালুখালী পানবাজার গ্রামের মৃত আব্দুস ছালামের ছেলে নুরুল আমিন (২০) নিজের শয়নকক্ষে ঢুকে দরজা বন্ধ করে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে। উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ জানান, এ ব্যাপারে একটি অপমৃত্যু মামলা রুজু করা হয়েছে।
ইত্তেফাক/এমআই
