গাজীপুরের পাতারটেক ও হাড়িনালে জঙ্গিদের দুই আস্তানা ছিল মূলত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। সারাদেশে কিভাবে টার্গেট কিলিং করা যায়, তার ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো জেএমবির এই দুই আস্তানায়। তারা কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল। আর সাংগঠনিক কার্যক্রমের অর্থ মধ্যপ্রাচ্য থেকে হুন্ডির মাধ্যমে বাংলাদেশে আসতো। আরও বড় হামলার টার্গেট ছিল নিহত জঙ্গিদের। তারা হলি আর্টিজানের মতো আরো একটি বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করছিল বলে জানিয়েছেন একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা।
গত শনিবার গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও আশুলিয়ায় পৃথক চার অভিযানে ১২ সন্দেহভাজন জঙ্গি নিহত হয়। এদের মধ্যে ৯ জনের নাম জানা গেলেও বাকি ৩ জনের পরিচয় পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গাজীপুরের অভিযানে নিহত জঙ্গি তৌহিদুল ইসলাম মারুফ ও রাসেদ মিয়ার রুম থেকে যে অত্যাধুনিক একে-২২ বোরের আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে সেটি চীনের তৈরি। আর ৭.৬৫ পিস্তলটি ভারতের তৈরি। গোয়েন্দাদের ধারণা, অস্ত্রগুলো ভারত হয়ে দেশে আনা হয়েছে। আরও বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিয়ে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে ভারী অস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুদ করছিল তারা। আর উদ্ধার হওয়া ল্যাপটপ থেকে যেসব আলামত পাওয়া গেছে তা খুবই ভয়ংকর।
এদিকে আশুলিয়া থেকে উদ্ধার হওয়া প্রায় ৩০ লাখ টাকা মধ্যপ্রাচ্য থেকে হুন্ডির মাধ্যমে আনা হয় বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পেয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। গত শনিবার আশুলিয়ায় র্যাবের অভিযানের সময় পাঁচ তলা ভবন থেকে লাফিয়ে পরে আহত হন আবদুর রহমান নামের এক জেএমবি সদস্য। পরে তিনি হাসপাতালে মারা যান। ওই বাসা থেকে আটক করা হয় রহমানের স্ত্রী রুবী আক্তারকে। তার কাছ থেকেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দারা।
গাজীপুরে ‘অপারেশন শরতের তুফান’ অভিযানে নিহত নব্য জেএমবির ঢাকা বিভাগীয় কমান্ডার ফরিদুল ইসলাম আকাশসহ ৭ জঙ্গি বড় ধরনের নাশকতার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দারা। দীর্ঘদিন ধরে তারা ওই এলাকায় থেকে পূজামন্ডপগুলো রেকি করছিল। পূজামন্ডপে হামলা চালিয়ে তারা আবারও আলোচনায় আসার চেষ্টা করছিল।
গোয়েন্দা সূত্র আরও জানায়, নিহত জঙ্গিরা তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানোর জন্য বাসাভাড়া নিয়ে ৩/৪ জন করে থাকতো। এমন আরও বেশ কয়েকজনের তালিকাও পেয়েছে গোয়েন্দারা। জঙ্গিদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা ছিল ভয়ংকর। গাজীপুরসহ আশপাশের জেলাগুলোতে জঙ্গিরা ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনা করেছে। রাজধানী ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকার মার্কেট বা ধর্মীয় উত্সবই তাদের পরবর্তী টার্গেট।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম শাখার উপ-কমিশনার (ডিসি) মাসুদুর রহমান বলেন, জঙ্গি-সন্ত্রাসী নির্মূলে পুলিশ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। গাজীপুরের পাতারটেকে পুলিশের সফল অভিযানের ফলে জঙ্গিদের বড় ধরনের নাশকতা থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে। জঙ্গি দমনে এ ধরণের অভিযান অব্যাহতভাবে চলবে।
৭ জঙ্গি নিহতের ঘটনায় মামলা:গাজীপুর প্রতিনিধি মুজিবুর রহমান জানান, শনিবার শহরের নোয়াগাঁও পাতারটেক এলাকায় পুলিশের অভিযানে নব্য জিএমবি’র ঢাকা বিভাগের কমান্ডার আকাশসহ ৭ জঙ্গি নিহতের ঘটনায় রাতেই জয়দেবপুর থানায় সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা হয়েছে। জয়দেবপুর থানার ওসি খন্দকার রেজাউল হাসান রেজা বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলায় নিহত ৭ জঙ্গিকে আসামি করা করা হয়। তবে শহরের হাড়িনালের লেবুবাগান এলাকায় র্যাবের অভিযানে ২ জন নিহত ও পাঁচ লাখ টাকা উদ্ধারের ঘটনায় রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত জয়দেবপুর থানায় কোন মামলা হয়নি। নিহত ৯ জঙ্গির মধ্যে ৩ জনের পরিচয় রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই দুটি অভিযানে নিহতদের মধ্যে ফরিদুল ইসলাম আকাশ, তৌহিদুল ইসলাম মারুফ, রাসেদ মিয়া, ইব্রাহীম, সানাউল্লাহ ওরফে সানোয়ার ও মেকানিকের পরিচয় জানা গেছে। এদের মধ্যে ইব্রাহীম গত ৮ আগষ্ট পুরান ঢাকার মোগলটুলি এলাকা থেকে নিখোঁজ হন। পরদিন তার বাবা আজিমউদ্দিন এ ব্যাপারে বংশাল থানায় একটি জিডি করেন।
এদিকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ মর্গে গতকাল ৯ নিহত জঙ্গির ময়নাতদন্ত হয়েছে। পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানান, রবিবার বিকাল পর্যন্ত তাদের খোঁজ নিতে হাসপাতাল এলাকায় কেউ আসেন নি।
নিহত তৌহিদুল ডুয়েটের ছাত্র নয় : হাড়িনাল এলাকায় র্যাবের অভিযানে নিহত তৌহিদুল ইসলাম গাজীপুর ডুয়েটের শিক্ষার্থী নয় বলে দাবি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গতকাল ডুয়েটের গবেষণা ও সম্প্রসারণ দপ্তরের সহকারী পরিচালক মোছা. কামরুন নাহার বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানান। তিনি জানান, ডুয়েটের একাডেমিক শাখা থেকে বর্তমান সব ছাত্রের নথি ঘেঁটে তৌহিদুল ইসলাম নামে যে সাতজন ছাত্র পাওয়া গেছে তাদের কারো বাড়িই নরসিংদীতে নয়। এমনকি পত্রিকায় প্রকাশিত ছবির সাথেও তাদের কারো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি।
বাড়ি দুটি ঘিরে উত্সুক মানুষ ভিড়: গাজীপুর শহরের হাড়িনালের লেবুবাগান এলাকা এবং পাশের নোয়াগাঁও পাতারটেক এলাকায় কথিত দুটি জঙ্গি আস্তানায় র্যাব ও পুলিশের পৃথক অভিযানে ৯ জন নিহতের ঘটনায় ওই দুটি বাড়ি ঘিরে এলাকার উত্সুক মানুষ ভিড় করছে। গতকাল সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শত শত নারী-পুরুষ সেখানে ছুটে আসে। সকালে হাড়িনাল লেবুবাগান এলাকায় আতাউর রহমানে বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় বাড়ির প্রধান ফটকে তালা লাগানো হয়েছে। ভিতরে কোন লোকজন নেই। তবে একতলা ওই ভবনের অপর ভাড়াটিয়ারা কোথায় আছে তাদের খবর আশপাশের কেউ জানাতে পারেনি।
নোয়াগাঁও পাতারটেক এলাকায় প্রবাসী সোলায়মান সরকারের বাড়িতে যেখানে ৭ জঙ্গি নিহত হয় সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, দোতলা বাড়ির নীচতলায় ক্রাইম সিনের হলুদ ট্যাপ দিয়ে কলাপসিবল গেট সিলগালা করে রাখা হয়েছে। সিঁড়ির কাছে বিভিন্ন স্থানে রক্তের ছাপ লেগে আছে। বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষ ভবনটিকে দেখার জন্য ভিড় করছে।
ওই ভবনের নীচতলার ভাড়াটিয়া আসমা বেগম জানান, দুই মাস আগে চারজন ১৮ থেকে ২৫ বয়সের ছেলে বাসাটি ভাড়া নেয়। তারা কখনোই ছাদে ওঠেনি। তাদের কাপড়-চোপরও ছাদে শুকাতে দিত না। তাদের জুতাগুলোও ঘরের ভিতরে রাখতো। চারটি ছেলে কখনোই একত্রে বের হতো না। একজন করে বের হতো। তারা কোথায় যাওয়া আসা করতো তা কেউ জানে না। মাঝে মধ্যে তাদের বয়সি দুই তিনজন ছেলে স্কুলের ব্যাগ পিঠে করে নিয়ে আসতো, আবার চলে যেত। তারা কখনোই কারো সঙ্গে কথা বলতো না। তারা দেখতে অত্যন্ত সুদর্শন ছিল । তিনি জানান, শনিবারের অভিযানে পর থেকে তিনি বাড়ির বাইরে অবস্থান করছেন। পুলিশ বাসার গেট সিল করে দেওয়ায় তারা বাসায় প্রবেশ করতে পারছেন না।
টাঙ্গাইলে নিহত দুই জনের পরিচয় মিলেছে: টাঙ্গাইল প্রতিনিধি খান মোহাম্মদ খালেদ জানান, র্যাবের অভিযানে নিহত দুই জঙ্গির লাশের ময়নাতদন্ত গতকাল রবিবার টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজে সম্পন্ন হয়েছে। লাশের কোন দাবিবার না আসায় লাশ দুটি হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। র্যাব-১২ এর কর্মকর্তা মহিউদ্দিন ফারুকী নিহত দুই জঙ্গির পরিচয় নিশ্চিত করেছেন। নিহতরা হলেন, আতিকুর রহমান ও সাগর হোসেন। দুজনেরই বয়স ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। আতিকুরের বাবার নাম লতিফুর রহমান। তার বাড়ি রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার নিমপাড়া গ্রামে এবং সাগর হোসেন একই উপজেলার ইউসুফপুরের জুনায়েদ হোসেনের ছেলে। টাঙ্গাইল সদর মডেল থানার ওসি নাজমুল হক ভূইঞা জানান, এ ব্যাপারে থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
রাজশাহীতে মিলছে না ওই দুই জঙ্গির বাড়ি: এদিকে রাজশাহী থেকে স্টাফ রিপোর্টার আনিসুজ্জামান জানান, রাজশাহীতে মিলছে না টাঙ্গাইলে র্যাবের অভিযানে নিহত জঙ্গি আতিকুর ও সাগরের বাড়ির সন্ধান। তাদের দুজনের বাড়ি রাজশাহীর চারঘাট উপজেলায়, র্যাব-১২ এর পক্ষ থেকে এমন তথ্য জানানো হলেও এখানে তাদের ঠিকানা পাওয়া যাচ্ছে না।
এ ব্যাপারে চারঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিবারণ চন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘ওই দুই যুবকের ব্যাপারে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কিংবা র্যাবের পক্ষ থেকে তাদের কোনো তথ্য দেয়া হয়নি। তবে তিনি এলাকায় খোঁজখবর নিয়েছেন। কিন্তু তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি।’
রাজশাহীর র্যাব, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও ওই দুই জঙ্গিকে শনাক্ত করতে পারেননি। গতকাল দুপুরে চারঘাটের ইউসুফপুর ও নিমপাড়া গ্রামে সরেজমিনে গিয়েও এ দুটি পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
নিমপাড়া গ্রামের বাসিন্দারা জানান, এই গ্রামে আতিকুর নামে দুই যুবক আছেন। তবে তারা বাড়িতেই রয়েছেন। এ দুজন ছাড়া অন্য কোনো আতিকুরকে তারা চেনেন না। আতিকুরের বাবা-মায়ের যে নাম বলা হচ্ছে, এ নামেও কাউকে খুঁজে পাচ্ছেন না তারা।
র্যাব-৫ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মাহবুবুল আলম বলেন, পুলিশের পাশাপাশি তারাও চারঘাটে নিহত দুই জঙ্গি সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছেন। কিন্তু এখনও তাদের কোনো হদিস মেলেনি।
